আকীদাহ বিষয়ে হাদিস কি দলীল নয়?

সাহাবা, তাবিয়িন ও তাবে-তাবিয়িন-এর কাছে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস হলো ‘কবুল’ (গ্রহণ করা) ও ‘তাসলিম’ (আত্মসমর্পণ করা) —এর ক্ষেত্র। এক্ষেত্রে তারা ‘মুতাওয়াতির’‘খবরুল আহাদ’ এবং ‘আকিদাহগত’‘আহকামগত’ বিষয়ের মাঝে পার্থক্য করতেন না। তারা বিশুদ্ধ হাদিসের উপর আমল করতেন চাই তার বর্ণনাকারীগন সংখ্যায় কম হোক বা বেশি। হাদিস গ্রহণ ও তার ওপর আমলের ক্ষেত্রে তারা বিশুদ্ধতা ব্যতীত অন্য কোন বিষয়কে শর্ত করতেন না। খায়রুল কুরুনে হাদিসের সাথে আচরণ ও কর্মনীতি এমনই ছিলো। তাদের কারো থেকেই আপনি এর ব্যতিক্রমী আচরণ ও চিন্তাচেতনা খুঁজে পাবেন না।

অতঃপর যখন আকিদাহর ক্ষেত্রে বিদআত প্রকাশ পেল, কিছু কিছু মানুষ দর্শন ও ইলমুল কালামের দ্বারা প্রভাবিত হলো, তখন তারা যুক্তি এবং আকলকে অহি তথা আল্লাহ তাআলার কালাম ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীর ওপর প্রাধান্য দিলো। তারা বলল, আমরা দুই অহিকে যথাযথ মান দিতে চাই এবং আল্লাহর শানে উপযুক্ত নয়—এমন সব কিছু থেকে আল্লাহ তায়ালাকে মুক্ত রাখতে চাই।

কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো কুরআন-সুন্নাহ। কারণ দ্বীনের নামে তাদের নবোদ্ভাবিত চিন্তাচেতনার অসারতা প্রমাণে কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্য সুস্পষ্ট। ফলে তারা কুরআনে ‘নস’ (মূল বক্তব্য)—এর ব্যাখ্যা করে তার বাহ্যিক অর্থকে পরিবর্তন করে ফেলে। এরপর তারা হাদিসের দিকে দৃষ্টি দিল এবং আকিদাহ’র ক্ষেত্রে ‘খবরুল আহাদ’ হাদিসকে দলিল হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানালো। এব্যাপারে তারা (কু)যুক্তি দেখালো যে, ‘হাদিসুল আহাদ’ বা ‘খবরুল আহাদ’ দ্বারা কোনো বিষয়ের ‘যন’ (অনুমান) করা যায়; ‘ইয়াকিন’ (সুনিশ্চিত বা নিশ্চয়তা) লাভ করা যায় না।

কুরআন-সুন্নাহ’য় আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণের গুরুত্ব ও তার অবাধ্যতার ব্যাপারে সতর্কবাণী ব্যাপকভাবে বিবৃত হয়েছে, যেগুলো আকিদাহ ও আহকাম— উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রশ্ন এসেই যায়—

তারা এই কুরআন-সুন্নাহ’র ‘নস’ (মূল বক্তব্য)—এর ব্যাপকতা থেকে হাদিসকে পৃথককরণের সুযোগ পেল কিভাবে?!

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالا مُبِينًا

আর আল্লাহ ও তার রাসুল কোন বিষয়ে ফয়সালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ ও তার রাসুলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্ৰষ্ট হলো। [০১]

আয়াতে উল্লেখিত أمراً (আমরান) তথা ‘কোন বিষয়’ কথাটি ব্যাপক, যা আকিদাহ ও আহকাম— উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

আল্লামাহ ইবনু কাসির রাহি. বলেন,

فَهَذِهِ الْآيَةُ عَامَّةٌ فِي جَمِيعِ الْأُمُورِ، وَذَلِكَ أَنَّهُ إِذَا حَكَمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ بِشَيْءٍ، فَلَيْسَ لِأَحَدٍ مُخَالَفَتُهُ وَلَا اخْتِيَارَ لِأَحَدٍ هَاهُنَا، وَلَا رَأْيَ وَلَا قَوْلَ.

সুতরাং এ আয়াতটি হুকুমের দিক দিয়ে সকল বিষয়কে অন্তর্ভুক্তকারী। আর সেটা হলো, আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিবেন তখন না কেউ সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারে, আর না কারোর সেটা মানা বা না–মানার বা যুক্তিতর্কের কোন অধিকার থাকতে পারে। [০২]

{وَما كانَ لِمُؤمِنٍ وَلا مُؤمِنَةٍ} أي وما صح لرجل مؤمن ولا امرأة مؤمنة {إِذا قَضَى اللَّهُ وَرَسولُهُ} أي رسول الله {أمْرًا} من الأمور {أَن يَكونَ لَهُمُ الخِيَرَةُ مِن أَمرِهِم} أن يختاروا من أمرهم

কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য অর্থাৎ মুমিন ব্যক্তি- চাই সে পুরুষ হোক বা নারী, আল্লাহ ও তার রাসুল যেকোনো বিষয়ে কোনো ফয়সালা বা সিদ্ধান্ত দিলে তার জন্য সঠিক নয় যে, সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার থাকবে অর্থাৎ তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বর্জনের ক্ষেত্রে তার স্বাধীনতা থাকবে—এটা সঠিক নয়। [০৩]

আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَلا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

কিন্তু না, আপনার রবের শপথ তারা মুমিন হবে না যতক্ষন পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়। [০৪]

এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ-নিষেধ নির্দ্বিধায় মেনে নেয়া শুধু আচার অনুষ্ঠান, আহকাম কিংবা অধিকারের সাথেই সম্পৃক্ত নয়; বরং আকিদাহ এবং অপরাপর বৈষয়িক বিষয়র ক্ষেত্রেও ব্যাপক। অতএব, কোন সময় কোন বিষয়ে পারস্পারিক মতবিরোধ দেখা দিলে বিবাদ পরিহার করে উভয় পক্ষকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এবং তার অবর্তমানে তার প্রবর্তিত শারিআতের আশ্রয়ে গিয়ে মীমাংসা তালাশ করা প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরয।

সেইসাথে যে কাজ বা বিষয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক কথা, কাজ বা মৌন-সমর্থনের মাধ্যমে প্রমাণিত, তা সম্পাদন করতে গিয়ে বা মেনে নিতে মনে কোন রকম সংকীর্ণতা অনুভব করাও ইমানের দূর্বলতার লক্ষণ।

আয়াতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহত্ত্ব ও সুউচ্চ মর্যাদার বিষয় প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে কুরআনের অসংখ্য আয়াতের দ্বারা প্রমাণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের অপরিহার্যতার বিষয়টি সবিস্তারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা শপথ করে বলেছেন যে, কোন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন কিংবা মুসলিম হতে পারে না যতক্ষণ না সে ধীরস্থির মস্তিস্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এভাবে স্বীকার করে নেবে যাতে রাসূলের কোন সিদ্ধান্তেই মনে কোন রকম সংকীর্ণতা না থাকে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসুল হিসেবে গোটা উম্মতের শাসক এবং যে কোন বিবাদের মীমাংসার যিম্মাদার। তার শাসন ও সিদ্ধান্ত অপর কাউকে বিচারক সাব্যস্ত করার উপর নির্ভরশীল নয়। তিনি শুধুমাত্র একজন শাসকই নন, বরং তিনি একজন নিষ্পাপ রাসুল, রাহমাতুল্লিল আলামীন এবং উম্মতের জন্য একান্ত দয়ালু ব্যক্তিত্ব। কাজেই শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, যখনই কোন বিষয়ে, কোন সমস্যার ব্যাপারে মতবিরোধ দেখা দেয়, তখনই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিচারক সাব্যস্ত করে তার মীমাংসা করিয়ে নেয়া উচিত এবং অতঃপর তার মীমাংসাকে স্বীকার করে নিয়ে সেমতে কাজ করা উভয় পক্ষের উপর ফরয।

মনে রাখতে হবে যে, কুরআনের বাণী ও রাসুলের হাদিসসমূহের উপর আমল করা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের সাথেই সীমিত নয়; বরং তার তিরোধানের পরও তার শারিআতের মীমাংসাই হল তার মীমাংসা। কাজেই এ নির্দেশটি কিয়ামত পর্যন্ত তেমনিভাবেই বলবৎ থাকবে, যেমন ছিল তার যুগে। তেমনি তার পরে তার প্রবর্তিত শারিআতের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। এটা প্রকৃতপক্ষে তারই অনুসরণ। সুতরাং আকিদাহর ক্ষেত্রে ‘খাবরুল আহাদ’ গ্রহণযোগ্য নয়— এমন একথা বলা প্রকৃতপক্ষে তার সিদ্ধান্তের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করারই নামান্তর।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহি. বলেন,

فَكُلُّ مَنْ خَرَجَ عَنْ سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَشَرِيعَتِهِ فَقَدْ أَقْسَمَ اللَّهُ بِنَفْسِهِ الْمُقَدَّسَةِ أَنَّهُ لَا يُؤْمِنُ حَتَّى يَرْضَى بِحُكْمِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جَمِيعِ مَا يَشْجُرُ بَيْنَهُمْ مِنْ أُمُورِ الدِّينِ وَالدُّنْيَا وَحَتَّى لَا يَبْقَى فِي قُلُوبِهِمْ حَرَجٌ مِنْ حُكْمِهِ . وَدَلَائِلُ الْقُرْآنِ عَلَى هَذَا الْأَصْلِ كَثِيرَةٌ

যে ব্যক্তিই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ এবং তার (আনীত) শারিয়াহ থেকে বেরিয়ে যাবে, আল্লাহ তার পবিত্র সত্ত্বার কসমপূর্বক জানিয়ে দিচ্ছেন যে, সে ততক্ষণ পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না দীনি এবং দুনিয়াবি সমস্ত বিবাদমান ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট না হবে এবং এ ব্যাপারে অন্তরে কোনো সংকীর্ণতা না রাখবে। এই মূলনীতিটির ব্যাপারে কুরআনে বহু দলিল-আদিল্লাহ রয়েছে। [০৫]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يَكُونَ هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْتُ بِهِ

যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ! তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন হতে পারে না যে পর্যন্ত না তার প্রবৃত্তি আমি যা নিয়ে আগমন করেছি তার অনুগত হয়। [০৬]

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ হাদিসে উল্লেখিত لِمَا جِئْتُ بِهِ (আমি যা নিয়ে আগমন করেছি) কথাটি ব্যাপক অর্থবোধক, যা আকিদা ও আহকাম— উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। দুয়ের মাঝে পার্থক্য করে এমন উদ্ভট দাবি করার কোন অবকাশ নেই যে, আকিদাহর ক্ষেত্রে হাদিস গ্রহণযোগ্য নয়। যদি কেউ এমনটা করে বা বলে সে অবশ্যই সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত হলো।

কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالا مُبِينًا

আর যে আল্লাহ ও তার রাসুলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্ৰষ্ট হলো। [০৭]

সিরাতে মুস্তাকিমের উপর অটল অবিচল থাকতে হলে অবশ্যই তাকে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবাধ্যতার পরিহার করতে হবে; চাই সেটা আহকাম ও বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে হোক বা আকিদাহ ও বিশ্বসগত বিষয়ের ক্ষেত্রে হোক।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

কাজেই যারা তার আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদের উপর আপতিত হবে অথবা আপতিত হবে তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। [০৮]

অর্থাৎ যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পথের বিরোধিতা করে, তার প্রবর্তিত শারিআত ও আইন অনুসারে জীবন পরিচালনা করে না, তার সুন্নাতের বিরোধিতা করে, তারা যেন তাদের অন্তরে কুফরি, নিফাকি, বিদআত ইত্যাদির ব্যাপারে সতর্ক হয় অথবা তারা তাতে নিপতিত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হয়। আরো যেন এব্যাপারে যে, তাদের উপর কঠোর শাস্তি আসবে। দুনিয়া-আখিরাত— উভয়ক্ষেত্রে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ

যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করবে যা আমার প্রদর্শিত পথের উপর নয়, তা তার উপরই ফিরিয়ে দেয়া হবে, গ্ৰহণযোগ্য হবে না। [০৯]

আকিদাহগত বিষয়ে খবরুল আহাদ হাদিসকে দলিল হিসেবে না-মানা— দ্বীনের নামে নবসৃষ্ট এমন এক পথ, যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত পথের বিপরীত। তা বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত হিসেবে তাদের উপরই ফিরিয়ে দেয়া হবে, কোনভাবেই তা মুমিনদের কাছে গ্ৰহণযোগ্য হবে না। কারণ তা সবিলুল মুমিন নয়।

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِنَّمَا مَثَلِي وَمَثَلُ النَّاسِ كَمَثَلِ رَجُلٍ اسْتَوْقَدَ نَارًا، فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ جَعَلَ الْفَرَاشُ وَهَذِهِ الدَّوَابُّ الَّتِي تَقَعُ فِي النَّارِ يَقَعْنَ فِيهَا، فَجَعَلَ يَنْزِعُهُنَّ وَيَغْلِبْنَهُ فَيَقْتَحِمْنَ فِيهَا، فَأَنَا آخُذُ بِحُجَزِكُمْ عَنِ النَّارِ، وَهُمْ يَقْتَحِمُونَ فِيهَا. هَذِهِ رِوَايَةُ الْبُخَارِيِّ وَلِمُسْلِمٍ نَحْوَهَا وَقَالَ فِي آخرهَا: فَذَلِكَ مَثَلِي وَمَثَلُكُمْ أَنَا آخِذٌ بِحُجَزِكُمْ عَنِ النَّارِ: هَلُمَّ عَنِ النَّارِ هَلُمَّ عَنِ النَّارِ فَتَغْلِبُونِي تَقَحَّمُونَ فِيهَا

আমার এবং অপরাপর মানুষদের মধ্যকার দৃষ্টান্ত হলো এমন এক ব্যক্তির মতো , যে আগুন জ্বালালো, তারপর সে আলোয় যখন চতুর্দিক আলোকিত হলো, তখন দেখা গেল যে, পোকামাকড় এবং ঐসমস্ত প্ৰাণী যা আগুনে পড়ে, সেগুলো আগুনে পড়তে লাগলো। তখন সে সেগুলোকে আগুন থেকে ফিরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সেগুলো তাকে পরাজয় করে আগুনে পতিত হল। (তদ্রূপ হে মানবজাতি!) আমিও তোমাদের কোমর ধরে আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি; কিন্তু তোমরা তাতেই পতিত হচ্ছ। ইমাম বুখারী এরূপ বর্ণনা করেছেন।

ইমাম মুসলিমও সামান্য শাব্দিক পরিবর্তনের সাথে এ পর্যন্ত একই রূপ বর্ণনা করেছেন। তবে শেষের দিকে কিছু বাড়িয়ে এরূপ বলেছেন, অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এটাই হলো আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত। আমি কোমর ধরে তোমাদেরকে আগুন থেকে (বাঁচানোর জন্য) টানছি ও বলছি, এসো আমার দিকে, আগুন থেকে দূরে থাক; এসো আমার দিকে, আগুন থেকে দূরে থাক। কিন্তু তোমরা আমাকে পরাস্ত করে আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ছ। [১০]

আর একথা বলাই বাহুল্য যে, আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার যেসকল শিক্ষার মাধ্যমে আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন তার ভিতরে অন্যতম হলো তাওহিদ ও আকিদাহর শিক্ষা। সুতরাং ‘আকিদাহর ক্ষেত্রে হাদিস মানা মানা যাবে না’ এ কথা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না এবং কোন মুমিনের বক্তব্যও এমন হতে পারে না। বরং এটা আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশের বিরুদ্ধাচারণ, জাতিকে কঠিন ভাবে নিষেধ করা হয়েছে আর উল্লেক্ষিত হাদিসে যার পরিণতি জাহান্নাম বলা হয়েছে। মুহাদ্দিসিনে কিরাম উল্লেক্ষিত হাদিস থেকে আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধাচরণের বিষয়টিকে ব্যাপকার্থে দেখেছেন।

ইমাম নাবাবি রাহি. বলেন,

وَمَقْصُودُ الْحَدِيثِ أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَبَّهَ تَسَاقُطَ الْجَاهِلِينَ وَالْمُخَالِفِينَ بِمَعَاصِيهِمْ وَشَهَوَاتِهِمْ في نارالآخرة وَحِرْصِهِمْ عَلَى الْوُقُوعِ فِي ذَلِكَ مَعَ مَنْعِهِ إِيَّاهُمْ وَقَبْضِهِ عَلَى مَوَاضِعِ الْمَنْعِ مِنْهُمْ بِتَسَاقُطِ الْفَرَاشِ فِي نَارِ الدُّنْيَا لِهَوَاهُ وَضَعْفِ تَمْيِيزِهِ وَكِلَاهُمَا حَرِيصٌ عَلَى هَلَاكِ نَفْسِهِ سَاعٍ فِي ذَلِكَ لِجَهْلِهِ

হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহিলদের ও কুরআন সুন্নাহর বিরুদ্ধাচরণকারী লোকদের পাপ ও প্রবৃত্তির কারণে জাহান্নামে যাওয়া এবং তাদেরকে কথা দ্বারা নিষেধ করা সত্ত্বেও সে কাজে লিপ্ত হওয়ার প্রবল ইচ্ছা ও প্রচেষ্টাকে তুলনা করেছেন পতঙ্গসমূহের প্রবৃত্তির এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার অক্ষমতার কারণে দুনিয়ার আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সঙ্গে। কারণ হলো, উভয়দল নিজেদেরকে ধ্বংস করতে বেশ আগ্রহী, আর এটা হয় তাদের অজ্ঞতার কারণে। [১১]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا

আর রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন, তা হতে বিরত থাক। [১২]

শাইখ আব্দুর রহমান ইবনু নাসির আস-সাদি রাহি. বলেন,

وهذا شامل لأصول الدين وفروعه ظاهره وباطنه، وأن ما جاء به الرسول يتعين على العباد الأخذ به واتباعه، ولا تحل مخالفته، وأن نص الرسول على حكم الشيء كنص الله تعالى؛ لا رخصة لأحد ولا عذر له في تركه، ولا يجوز تقديم قول أحد على قوله.

উল্লেখিত আয়াতাংশ দ্বীনের মূলনীতি ও শাখাগত বিষয়কে এবং তার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করার সাথেসাথে এবিষয়ের ক্ষেত্রেও দলিল যে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা-কিছু নিয়ে এসেছেন তা মেনে নেওয়া ও তার অনুসরণ করা বান্দাদের ওপর ফরয এবং তার বিরোধিতা করা জাইয নয়। উল্লেখিত আয়াতাংশ থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, কোন বিষয়ের ফয়সালায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা আল্লাহ তাআলার কথার মত; যা পরিত্যাগ করার ব্যাপারে কারো কোন সুযোগ নেই এবং কোনো ওযর-আপত্তিও চলবে না। অন্য কারোর কথাকে তার কথার ওপর প্রাধান্য দেওয়া জাইয নেই। [১৩]

চলবে…

 

পাদটীকাঃ

[০১]—সুরাহ আল-আহযাব, আয়াত ৩৬
[০২]—তাফসিরে ইবনু কাসির ৬/৪২৩
[০৩]—মাদারিকুত তানযিল ওয়া আসরারুত তাবিল, ৩/৩১
[০৪] —সুরাহ আন-নিসা, আয়াত ৬৫
[০৫]—মাজমুয়ুল ফাতাওয়া, ২৮/৪৭১
[০৬]—
[০৭]—সুরাহ আল-আহযাব, আয়াত ৩৬
[০৮]—সুরাহ আন-নুর, আয়াত ৬৩
[০৯]—সহিহুল বুখারি, হাদিস নং ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭১৮
[১০]—সহিহুল বুখারি, হাদিস নং ৬৪৮৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৮৪; সুনান আত-তিরমিযি, হাদিস নং ২৮৭৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৭৩২১, সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস নং ৬৪০৮
[১১]—আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম ইবনিল হজ্জাজ ১৫/৫০, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত।
[১২]—সুরাহ আল-হাশর, আয়াত ৭
[১৩]—তাইসিরুল কারিমির রহমান ফি তাফসিরি কালামিল মান্নান, পৃষ্ঠা : ৮৫০, প্রকাশনী : মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ।

Join the Conversation
By - আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইমাম ও খতিব, বায়তুল ফালাহ্ জামে মসজিদ, শের-এ বাংলা রোড, খুলনা।