আগুনে পুড়িয়ে মারা বা মারার পর পোড়ানোর ব্যাপারে ইসলাম কি বলে?

মূলপাতা > আগুনে পুড়িয়ে মারা বা মারার পর পোড়ানোর ব্যাপারে ইসলাম কি বলে?
[সম্পূর্ণ আলোচনা না পড়ে কোন মন্তব্য না করলে ভাল হয়]
লালমনিরহাটে এক ব্যক্তিকে কুরআন অবমাননার কারণে মারার পর আগুনে পোড়ানো হয়েছে। ঘটনা কি ঘটেছিল , তা হলুদ মিডিয়ার কথার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দেওয়া বা নেওয়া যাবেনা। আগুনের পুড়ানোর ঘটনা যেহেতু সত্য, সেজন্য এ ব্যাপারে ইসলামের বিধানটা কি সেটাই স্পষ্ট করে জানার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
[একটি মূলনীতি মনে রাখা দরকারঃ সাহাবাদের মধ্যে কোন বিষয়ে এখতেলাফ হলে দেখতে হয় সে ব্যাপারে রাসুলের থেকে স্পষ্ট কোন হাদিস বা আমল আছে কিনা? এবং অধিকাংশ সাহাবাদের মাসলাক কোনটি? সেটা ভালো করে দেখা ও বুঝার দরকার। কেননা, সাহাবাগন অনেক ক্ষেত্রে এজতেহাদ করে থাকেন। তাঁদের এজতেহাদ ভুলও হয় আবার সঠিকও হয়। ]
এ মাসালা বুঝার জন্য চারটি পর্যায়ে আলোচনা বুঝতে হবে
  • ১ আগুনের পোড়ানোর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের বাণী কি?
  • ২ মুরতাদ, সমকামী ও কিসাস স্বরূপ আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে সাহাবাদের আমল কেমন ছিল?
  • ৩ মুরতাদদেরকে হত্যা করার পর আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি?
  • ৪ চার মাজহাবের ইমামদের এব্যাপারে বক্তব্য কি?

১ আগুনের পোড়ানোর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের বাণী কি?

عن أبي هريرة رضي الله عنه أنه قال: «بعثنا رسول الله صلى الله عليه وسلم في بعث فقال إن وجدتم فلانا وفلانا فأحرقوهما بالنار، ثم قال رسول الله صلى الله عليه وسلم حين أردنا الخروج: إني أمرتكم أن تحرقوا فلانا وفلانا وإن النار لا يعذب بها إلا الله؛ فإن وجدتموهما فاقتلوهما»
অর্থঃ আবু হুরায়রা (রাদি) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে কোন এক অভিযানে প্রেরণ করেন এবং বলেন, “তোমরা যদি অমুক ও অমুক ব্যক্তিকে পাও, তবে তাঁদের উভয়কে আগুনে জ্বালিয়ে দিবে”। তারপর আমরা যখন বের হতে চাইলাম , তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কিন্তু আগুন দ্বারা শাস্তি দেওয়া আল্লাহ্‌ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারও জন্য সমীচীন নয়। কাজেই তোমরা যদি তাঁদের উভয়কে পেয়ে যাও, তবেঁ তাদেরকে হত্যা কর।
[বুখারিঃ ২৮০৭ নং হাদিস, পরিচ্ছেদঃ আল্লাহ্‌ তা’আলার শাস্তি দ্বারা কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না।]
আরাকটি হাদিস
عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه قال: “كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفَرٍ، فَانْطَلَقَ لِحَاجَتِهِ فَرَأَيْنَا حُمَرَةً مَعَهَا فَرْخَانِ فَأَخَذْنَا فَرْخَيْهَا، فَجَاءَتِ الْحُمَرَةُ فَجَعَلَتْ تَفْرِشُ، فَجَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «مَنْ فَجَعَ هَذِهِ بِوَلَدِهَا؟ رُدُّوا وَلَدَهَا إِلَيْهَا». وَرَأَى قَرْيَةَ نَمْلٍ قَدْ حَرَّقْنَاهَا فَقَالَ: «مَنْ حَرَّقَ هَذِهِ؟» قُلْنَا: نَحْنُ. قَالَ: «إِنَّهُ لَا يَنْبَغِي أَنْ يُعَذِّبَ بِالنَّارِ إِلَّا رَبُّ النَّارِ
অর্থঃ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদি) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক সফরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলাম। তিনি তাঁর প্রয়োজনে কোথাও গেলেন। আমরা দু’টি বাচ্চাসহ একটি (চড়ুই জাতীয়) পাখি দেখতে পেলাম। আমরা তাঁর বাচ্চা দুটোকে ধরে নিলাম। মা পাখিটা সাথে সাথে আসলো এবং পাখা ঝাঁপটিয়ে বাচ্চার জন্য অস্থিরতা প্রকাশ করতে লাগলো । রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরে এসে বললেন, এর বাচ্চা নিয়ে এসে কে একে অস্থিরতায় ফেললো? বাচ্চাগুলো এদের মায়ের কাছে ফেরত দাও। তিনি আমাদের পুড়িয়ে দেয়া একটা পিঁপড়ার ঢিবি দেখতে পেয়ে বললেন, কে এগুলি জ্বালিয়ে দিলো? আমরা বললাম, আমরা। তিনি বললেন, আগুনের প্রভু ছাড়া আগুন দিয়ে কোন কিছুকে শাস্তি দেয়ার কারো অধিকার নেই।
[আবু দাউদঃ ২৬৭৫ নং হাদিস, পরিচ্ছেদঃ শত্রুকে আগুনে পোড়ানো সংগত নয়]
এসকল হাদিস থেকে বুঝে আসে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম আগুনে পুড়িয়ে মানুষ বা প্রানী মারতে নিষেধ করেছে। সুতরাং এমন কর্ম থেকে বেঁচে থাকা অবশ্যই উচিত।

২ মুরতাদ, সমকামী ও কিসাস স্বরূপ আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে রাসুল ও সাহাবাদের আমল কেমন ছিল?

এ ব্যাপারে কিছু রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাদের কিছু আমল পাওয়া যায়। সেগুলো সনদগত মান ও হাদিসের ব্যাখ্যা আমরা দেখে আসি
১ নং হাদিস
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : ” قَدِمَ أُنَاسٌ مِنْ عُكْلٍ أَوْ عُرَيْنَةَ ، فَاجْتَوَوْا المَدِينَةَ ، فَأَمَرَهُمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِلِقَاحٍ ، وَأَنْ يَشْرَبُوا مِنْ أَبْوَالِهَا وَأَلْبَانِهَا ، فَانْطَلَقُوا ، فَلَمَّا صَحُّوا ، قَتَلُوا رَاعِيَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، وَاسْتَاقُوا النَّعَمَ ، فَجَاءَ الخَبَرُ فِي أَوَّلِ النَّهَارِ ، فَبَعَثَ فِي آثَارِهِمْ ، فَلَمَّا ارْتَفَعَ النَّهَارُ جِيءَ بِهِمْ ، فَأَمَرَ فَقَطَعَ أَيْدِيَهُمْ وَأَرْجُلَهُمْ ، وَسُمِّرَتْ أَعْيُنُهُمْ ، وَأُلْقُوا فِي الحَرَّةِ ، يَسْتَسْقُونَ فَلاَ يُسْقَوْنَ
“আনাস(রাদি) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ উরায়না গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের জন্য)মদীনায় এলে তারা পীড়িত হয়ে পড়ল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের (সদকার) উটের কাছে যাবার এবং ওর পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেল। তারপর তারা সুস্থ হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাখালকে হত্যা করে ফেলল এবং উটগুলি হাঁকিয়ে নিয়ে গেল। এখবর দিনের প্রথম ভাগেই এসে পৌঁছল। তিনি তাঁদের পেছনে লোক পাঠালেন। বেলা বেড়ে উঠলে তাঁদেরকে (গ্রেফতার করে) আনা হল। তারপর তাঁর আদেশে তাঁদের হাত পা কেটে দেওয়া হল। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাঁদের চোখ ফুঁড়ে দেওয়া হল এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাঁদের নিক্ষেপ করা হল। তারা পানি চাইছিল , কিন্তু দেওয়া হয়নি। ”
[বুখারিঃ ২৩৩ , মুসলিমঃ ১৬৭১]
হাদিসের মান ঃ সহীহ।
ব্যাখ্যাঃ সহীহ মুসলিমের আরেকটু অংশ সামনে রাখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে, হাদিসে এসেছে,
إِنَّمَا سَمَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْيُنَ أُولَئِكَ ، لِأَنَّهُمْ سَمَلُوا أَعْيُنَ الرِّعَاءِ “
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে) তাঁদের চোখ ফুঁড়ে দিয়েছিলেন । কেননা, তারা রাখালদের চোখ ফুঁড়ে দিয়েছিলেন ” [সহীহ মুসলিমঃ ১৬৭১ নং হাদিস ]
আসলে এ ঘটনা ছিল কিসাসের বদলে। যেহেতু তারা রাখালদের এভাবে হত্যা করেছিল তাই তাঁদেরকেও এমনভাবে হত্যা করা হয়। [ফাতহুল বারীঃ ১/৩৪১ , যাদুল মা’দঃ ৩/২৫৫ ]
তবেঁ পরবর্তীতে হুদুদের আয়াত নাযিল করার দ্বারা আগুনের পুড়িয়ে মারার বা উত্তপ্ত আগুন দ্বারা কাউকে শাস্তি দেওয়ার বিধান মানসুখ হয়ে যায়।
[তাফসীরে ইবনে জারিরঃ ৮/৩৬৯, ইহকামুল আহকামঃ ৪৩৯, ফাতহুল বারীঃ ১/ ৩৪১]
আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী (রাহি) বলেছেন,
يدل عليه – أي النسخ- ما رواه البخاري في الجهاد من حديث أبي هريرة في النهى عن التعذيب بالنار بعد الإذن فيه ، وقصة العرنيين قبل إسلام أبي هريرة وقد حضر الإذن ثم النهي وروى قتادة عن بن سيرين أن قصتهم كانت قبل أن تنزل الحدود
“ইমাম বুখারি জিহাদের অধ্যায়ে আবু হুরায়রাহ (রাদি) কর্তৃক বর্ণিত আগুনে পুড়িয়ে মারা নিষেধ হবার ব্যাপারে যে হাদিস বর্ণনা করেছেন তা -আগে এ ব্যাপারে অনুমতি থাকার পর- পরে (আগুনে পুড়ানোর হুকুমটিকে রহিত করে দিয়েছে বলে)প্রমাণ করে। উরায়নার ঘটনাটি আবু হুরায়রাহ (রাদি)- এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বের ঘটনা। অনুমতি ছিল, অতপর নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে। কাতাদাহ ইবনে সিরিন থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁদের ঘটনা হদের হুকুম (সূরা মায়েদার আয়াত) নাযিলের পূর্বের ঘটনা।”
[ফাতহুল বারীঃ ১/৩৪১]
যদিও হদ হিসাবে এমন বিধান দেওয়া যেতে পারে বলেন অনেকে এখতেলাফ করেছেন।
[শরহে মুসলিমঃ ৭/৪১২]
নোটঃ এ হাদিস দ্বারা বুঝে আসে যে, পুড়িয়ে মারার হুকুম দেওয়া বিধিসম্মত নয়। (তবে হদের ব্যাপারে কিছু হাদিস থাকায় এখতেলাফ হয়েছে)
২ নং হাদিস
عَنْ عِكْرِمَةَ : ” أَنَّ عَلِيًّا رضى الله عنه حَرَّقَ قَوْمًا ، فَبَلَغَ ابْنَ عَبَّاسٍ فَقَالَ : لَوْ كُنْتُ أَنَا لَمْ أُحَرِّقْهُمْ ، لأَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : لاَ تُعَذِّبُوا بِعَذَابِ اللَّهِ ، وَلَقَتَلْتُهُمْ كَمَا قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم : مَنْ بَدَّلَ دِينَهُ فَاقْتُلُوهُ
“ইকরিমা (রাদি) থেকে বর্ণিত, আলী (রাদি) এক সম্প্রদায়কে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এ সংবাদ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদি)-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, যদি আমি হতাম, তবে আমি তাঁদেরকে জ্বালিয়ে ফেলতাম না। কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আল্লাহ নির্ধারিত শাস্তি দ্বারা কাউকে শাস্তি দিবে না। বরং আমি তাঁদেরকে হত্যা করতাম। যেমন নবী সাল্লাল্লাহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন , যে ব্যক্তি তাঁর দীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করে ফেল। ”
[বুখারিঃ ২৮০৮ নং হাদিস]
হাদিসের মানঃ সহীহ
ব্যাখ্যাঃ এ হাদিস থেকে বুঝে আসে ইবনে আব্বাস (রাদি)-এর কাছে যখন এ কথা পৌঁছে তিনি এমন কাজ না করার আশা পোষণ করেছিলেন। এবং সাথে সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস বর্ণনা করেছিলেন। এমনকি মুসতাদরাকে হাকেমে পাওয়া যায় যে, যখন ইবনে আব্বাস (রাদি)-এর এ কথা আলী (রাদি)-এর কাছে পৌঁছে তখন তিনি বলেছিলেন,
فبلغ ذلك عليًّا رضي الله عنه فقال ويح ابن عباس
[মুস্তাদরকে হাকেমঃ ৩/৬২০ ]
واستعجاب علي من كلام ابن عباس : يدل على أنه لم يكن قد بلغه النسخ ، وحيث بلغه قال به ، ولولا ذلك لأنكر على ابن عباس قوله
“আলী (রাদি) ইবনে আব্বাস(রাদি)-এর এ কথা বিস্ময় প্রকাশ করেন। এ কথা প্রমাণ করে যে তাঁর কাছে বিধানটি রহিত হবার হুকুম পৌঁছেনি। যখন তাঁর কাছে পৌঁছে তখন তিনি এমন বলেন। যদি এমন না হত , তবে আলী(রাদি) ইবনে আব্বাস (রাদি)-এর কথাকে প্রত্যাখ্যান করত। “
[আল ই’তিবার ফি নাসেখ ওয়া মানসুখঃ ১৯৪ পৃঃ ]
এ কথার ব্যাখ্যায় ইবনে হাজর আসকালানী (রাহি) বলেছেন,
وفي رواية ابن علية : “فبلغ عليا فقال ويح أم ابن عباس” كذا عند أبي داود وعند الدارقطني بحذف “أُم” وهو محتمل أنه لم يرض بما اعترض به ورأى أن النهي للتنزيه وهذا بناء على تفسير ويح بأنها كلمة رحمة فتوجع له لكونه حمل النهي على ظاهره فاعتقد مطلقا فأنكر ويحتمل أن يكون قالها رضا بما قال وأنه حفظ ما نسيه بناء على أحد ما قيل في تفسير ويح أنها تقال بمعنى المدح والتعجب كما حكاه في النهاية..
“ইবনে আলীইয়-এর বর্ণনায় আছে যে, যখন এ খবর আলী (রাদি)-এর কাছে পৌছাল তিনি বললেন, ‘ওয়হু উম্মু ইবনে আব্বাস’ আবু দাউদ ও দারাকুতনীতে “উম্ম” শব্দ ছাড়া এসেছে। এতে সম্ভবনা আছে যে, ইবনে আব্বাস(রাদি) যে আপত্তি করেছেন তা তিনি পছন্দ করেনি। এবং তিনি মনে করেছেন যে, এই নিষেধ মাকরুহে তানজিহ বা অনুত্তম পর্যায়ের। —। এ সম্ভবনাও আছে যে, ইবনে আব্বাস(রাদি) যা বলেছেন তিনি তা পসন্দ করেছেন বলে এমন বলেছেন। এবং তিনি তাঁর ভুলে যাওয়া বিষয়টি আবার স্মরণ করে নিয়েছেন। ——- ।”
[ফাতহুল বারীঃ ১২/২৭২]
একটি গুরুত্বপূর্ণ কথাঃ
অনেকে এই হাদিস পেশ করে বলতে চায় , আগুন দ্বারা শাস্তি দেওয়া মাকরুহে তানজিহ বা অনুত্তম কাজ। যেমন ফাতহুল বারীর একটি ইবারত দিয়ে অনেকে প্রমান করার চেষ্টা করেছেন।
যেমন
 وَقَالَ الْمُهَلَّبُ لَيْسَ هَذَا النَّهْيُ عَلَى التَّحْرِيمِ بَلْ عَلَى سَبِيلِ التَّوَاضُعِ وَيَدُلُّ عَلَى جَوَازِ التَّحْرِيقِ فِعْلُ الصَّحَابَةِ وَقَدْ سَمَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَعْيُنَ الْعُرَنِيِّينَ بِالْحَدِيدِ الْمَحْمِيِّ وَقَدْ حَرَقَ أَبُو بَكْرٍ الْبُغَاةَ بِالنَّارِ بِحَضْرَةِ الصَّحَابَةِ وَحَرَقَ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ بِالنَّارِ نَاسًا مِنْ أَهْلِ الرِّدَّةِ وَأَكْثَرُ عُلَمَاءِ الْمَدِينَةِ يُجِيزُونَ تَحْرِيقَ الْحُصُونِ والمراكب على أَهلهَا قَالَه الثَّوْريّ وَالْأَوْزَاعِيّ
“মুহাল্লাব বলেছেন, এখানে নিষেধ দ্বারা মাকরুহে তাহরিম উদ্দেশ্য নয়। বরং নম্রতাস্বরূপ বলা হয়েছে।———। ” [ফাতহুল বারীঃ ৬/১৫০]
অথচ ইবনে হাজর (রাহি) ফাতহুল বারীর পরের কথা দেখুন,
وَقَالَ بن الْمُنِيرِ وَغَيْرُهُ لَا حُجَّةَ فِيمَا ذُكِرَ لِلْجَوَازِ لِأَنَّ قِصَّةَ الْعُرَنِيِّينَ كَانَتْ قِصَاصًا أَوْ مَنْسُوخَةً كَمَا تَقَدَّمَ وَتَجْوِيزُ الصَّحَابِيِّ مُعَارَضٌ بِمَنْعِ صَحَابِيٍّ آخر وقصة الْحُصُون والمراكب مُقَيّدَة بالضرورةالى ذَلِكَ إِذَا تَعَيَّنَ طَرِيقًا لِلظَّفَرِ بِالْعَدُوِّ وَمِنْهُمْ مَنْ قَيَّدَهُ بِأَنْ لَا يَكُونَ مَعَهُمْ نِسَاءٌ وَلَا صِبْيَانٌ كَمَا تَقَدَّمَ وَأَمَّا حَدِيثُ الْبَابِ فَظَاهِرُ النَّهْيِ فِيهِ التَّحْرِيمُ وَهُوَ نَسْخٌ لِأَمْرِهِ الْمُتَقَدِّمِ سَوَاءٌ كَانَ بِوَحْيٍ إِلَيْهِ أَوْ بِاجْتِهَادٍ
”ইবনে মুনীর ও অন্যরা বলেছেন, জায়েজ যে কথা বলা হয়েছে তাতে কোন প্রমাণ নেই। কেননা, উয়াইনা ঘটনা হয়ত কেসাসের সাথে সম্পর্কিত অথবা মানসুখ বা রহিত হয়ে গিয়েছে, যেমন পূর্বে গিয়েছে। আর সাহাবীদের জায়েজ বলাটা অন্য সাহাবিদের নিষেধের সাথে বিরোধী। ————–। পরিচ্ছেদের হাদিস [ একেবারে প্রথম রাসুলুল্লাহ-এর বাণী হিসাবে যে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে সেটি] নিষেধের হুকুমটি মাকরুহে তাহরীমি বুঝায়।————–। “
[ফাতহুল বারীঃ ৬.১৫০]
৩ নং হাদিস
عروة قال : “كَانَتْ فِي بَنِي سُلَيْمٍ رِدَّةٌ، فَبَعَثَ إِلَيْهِمْ أَبُو بَكْرٍ خَالِدَ بْنَ الْوَلِيدِ، فَجَمَعَ مِنْهُمْ أُنَاسًا فِي حَظِيرَةٍ حَرَّقَهَا عَلَيْهِمْ بِالنَّارِ، فَبَلَغَ ذَلِكَ عُمَرُ، فَأَتَى أَبَا بَكْرٍ، فَقَالَ: انْزِعْ رَجُلًا يُعَذَّبُ بِعَذَابِ اللَّهِ، فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: وَاللَّهِ لَا أَشِيمُ سَيْفًا سَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عَدُوِّهِ حَتَّى يَكُونَ اللَّهُ هُوَ يَشِيمُهُ، وَأَمَرَهُ فَمَضَى مِنْ وَجْهِهِ ذَلِكَ إِلَى مُسَيْلِمَةَ
“উরওয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনী সুলাইম গোত্রের মাঝে রিদ্দাত বা ইসলামের ত্যাগের ঘটনা দেখা দিল। আবু বকর (রাদি) তাঁদের কাছে খালিদ বিন ওয়ালিদ(রাদি)-কে পাঠালেন। তিনি তাঁদেরকে সংরক্ষিত প্রাঙ্গণে জমা করলেন। তাঁদেরকে আগুন ধরিয়ে দিলেন। এ খবর যখন উমার (রাদি)-এর কাছে পৌছালো তিনি আবু বকর (রাদি)-এর কাছে আগমন করলেন। এবং বললেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর আজাব দ্বারা আজাব প্রাদান করে তাকে আপনি পদচ্যুত করুন’।———।”
[মুসান্নাফে আবী শাইবাহঃ ৩৩৭২৫, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাকঃ ৯৪১২]
ব্যাখ্যাঃ এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, খালিদ(রাদি) বনী সুলাইম গোত্রের লোকদের আগুনে পুড়িয়ে মারলে উমর (রাদি) সাহাবাদের সমানে কত শক্ত প্রতিবাদ করেন। অথচ কোন সাহাবা উমর(রাদি)-এর প্রতিবাদের উপর আপত্তি করেনি। সুতরাং এ কাজটি যদি উত্তম ও বিধিসম্মত হত , তবে তিনি এত কঠোর হতেন না, অথবা অন্য সাহাবাগন নীরবে তাঁর প্রতিবাদ মেনে নিতেন না।
৪ নং হাদিস- সমকামীদেরকে পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে
قال : هذا ذنب لم تعص به أمة من الأمم إلا أمة واحدة ، صنع اللّه بها ما قد علمتم ، نرى أن نحرقه بالنار ، فاجتمع أصحاب رسول اللّه -صلى الله عليه وسلم- على أن يحرقه بالنار ، فكتب أبو بكر إلى خالد بن الوليد يأمره أن يحرقه بالنار
“আলী (রাদি) বললেন, এমন গুনাহ (সমকামিতা) গত উম্মতের মধ্যে কেবল এক উম্মতই করেছিল। আল্লাহ্‌ তাঁদের সাথে কি করেছেন, আপনারা তা জানেন। আমরা মনে করি, তাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হোক। রাসুলুল্লাহের সাহাবাগন এ ব্যাপারে একমত হলেন যে, তাঁদেরকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে হবে। অতপর আবু বকর (রাদি) খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাদি) কাছে চিঠির মারেফতে তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া আদেশ দেন। ”
[যাম্মুল মালাহীমঃ ১০০ পৃঃ , শুয়াবুল ইমানঃ ৭/২৮১, সুনানে কুবরা ঃ ৮/২৩২]
আসারের মানঃ ইবনে হাজার আসকালানী (রাহি) বলেছেন, আসারটি খুব দুর্বল। অন্যান্য মুহাদ্দিসগণও দুর্বল বলেছেন।
[দিরায়াহঃ ২/১০৩, সুনানে কুবরাঃ ৮/২৩২, মুহাল্লাঃ ১১/৩৮৩]

৩ মুরতাদ্দেরকে হত্যা করার পর আগুনে পুড়িয়ে মারার ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি?

“قدمَ على أبي مُوسَى مُعَاذُ بْنُ جَبَلٍ بِاليَمَنِ فإذا رجلٌ عندَهُ قال ما هذا قال رجلٌ كان يَهودِيًّا فَأسلمَ ثُمَّ تَهَوَّدَ و نحنُ نُرِيدُهُ على الإسلامِ مُنْذُ قال أَحْسَبُهُ شَهْرَيْنِ فقال واللهِ لا أَقْعُدُ حتى تَضْرِبُوا عُنُقَهُ فَضُرِبَتْ عُنُقُهُ فقال قَضَى اللهُ ورسولُهُ أنَّ مَنْ رجعَ عن دَيْنِهِ فَاقْتُلوهُ أوْ قال مَنْ بَدَّلَ دَيْنَهُ فَاقْتُلوهُ

অর্থঃ ইয়ামেনে আবু মূসা (রাদি)-এর কাছে মুয়াজ বিন জাবাল (রাদি) আসলেন। দেখলেন তাঁর কাছে এক ব্যক্তি। বললেন, এ কে?! তিনি উত্তর দিলেন, এ ব্যক্তি ইয়াহুদী ছিল । ইসলাম গ্রহণ করেন অতপর আবার ইয়াহুদী হয়ে গিয়েছে। তিনি যখন বললেন, তাকে যখন দুই মাস যাবত বন্ধী করেছি তখন থেকে আমরা তাঁর ইসলামে ফিরে আসার আশা করছি। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! তোমরা যতক্ষণ না তাঁর গর্দান উড়াও আমি ততক্ষণ বসবনা। তাঁর গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হল। তিনি বললেন, আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুল ফয়সালা করেছেন যে, যে দীন থেকে সরে যাবে তাকে হত্যা করা হবে।
ফাতহুল বারীতে আরেকটু ইবারত এসেছে যে,
فَأُتِيَ بِحَطَبٍ فَأَلْهَبَ فِيهِ النَّارَ فَكَتَّفَهُ وَطَرَحَهُ فِيهَا
“অতপর কাঠ আনা হল এবং তাতে আগুন জালানো হলো। তাঁর দু’ হাত বাধা হল ও তাকে তাতে ফেলে দেওয়া হল।”
[ইরওয়াউ গলীলঃ৮/১২৫ ,ফাতহুল বারীঃ ১২/২৭৪]
আসারের মানঃ সহীহ।
ব্যাখ্যাঃ এর ব্যাখ্যা আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানি(রাহি) বলেছেন,
وَيُؤْخَذُ مِنْهُ أَنَّ مُعَاذًا وَأَبَا مُوسَى كَانَا يَرَيَانِ جَوَازَ التَّعْذِيبِ بِالنَّارِ
إِحْرَاقِ الْمَيِّتِ بِالنَّارِ مُبَالَغَةً فِي إِهَانَتِهِ وَتَرْهِيبًا عَنِ الِاقْتِدَاءِ بِهِ
“এ আসার থেকে (এ ফায়েদা) গ্রহণ করা হয়েছে যে, ,মুয়াজ (রাদি) ও আবু মূসা (রাদি) আগুন দ্বারা শাস্তি দেওয়া এবং অধিক লাঞ্চিত করা ও তাঁদের অনুরসরণ করতে মানুষকে নিরুৎসাহিত করার জন্য মৃতকে আগুনে পোড়ানকে জায়েজ মনে করতেন।
[ফাতহুল বারীঃ ১২/২৭৪-২৭৫]
নোটঃ এজন্য আলেমগণ মুরতাদদেরকে কতল করার পরও ক্ষেত্রবিশেষ ভীতিপ্রদর্শনের জন্য তাঁদের মৃতদেহ আগুনে পোড়ান জায়েজ বলেছেন।
৪ চার মাজহাবের ইমামদের এব্যাপারে বক্তব্য কি?
হানাফি আলেমগণের বক্তব্য
আল্লামা শামীর বক্তব্য হল
لكن جواز التحريق والتغريق مقيد كما في شرح السير بما إذا لم يتمكنوا من الظفر بهم بدون ذلك ، بلا مشقة عظيمة فإن تمكنوا بدونها فلا يجوز).
“তবে আগুনে পুড়িয়ে মারা ও পানিতে ডুবিয়ে মারা শরহে সিয়ারের ভাষ্য মতে বৈধ আছে যখন তারা শত্রু উপর এভাবে বড় ধরনের কষ্ট ছাড়া বিজয় লাভ করতে না পারে। তবে যদি এ ছাড়া(আগুনে পোড়ান) বিজয় বা কর্তৃত্ব লাভ করতে পারে , তবে জায়েজ নেই। ”
[ফাতাওয়ে শামীঃ ১৫/ ৪৩৬]
আরো দেখুন,[তাবয়ীনুল হাকায়েকঃ ৬/৩২, ইনায়াঃ১৫/১৫৭ , মাজমাউল আনহারঃ ৪/৩১৩]
শাফেয়ি আলেমদের বক্তব্যঃ
فان قيل : لو لم يجز التحريق لماهم به –أي النبي صلى الله عليه وسلم-، قلنا: لعله هم به بالاجتهاد ثم نزل وحي بالمنع منه أو تغير الاجتهاد
“যদি বলা হয়, আগুন দিয়ে পোড়ানো যদি জায়েজ না হত, তবেঁ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এমন ইচ্ছা করলেন? আমরা বলি, সম্ভবত তিনি ইজতিহাদ করে এমন সংকল্প করেছিলেন অতপর ওহির মাধ্যে এমন করতে নিষেধ করা হয় অথবা এজতেহাদ পরিবর্তন হয়ে যায়।”
[শরহে মাজমু’ ঃ ৪/১৯২]
আরো দেখুনঃ [শরহে মুসলিমঃ ৭/৪১২, সুনানে কুবরাঃ ৯/৭২]
হাম্বালী আলেমদের বক্তব্যঃ
وإن حرقه فقال بعض أصحابنا لا يُحرّق لأن التحريق محرم لحق الله تعالى لقول النبي صلى الله عليه و سلم : “لا يعذب بالنار إلا رب النار
“যদিও আগুনে পোড়ানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের কতিপয় সাথীরা বলেছেন যে, আগুনে পোড়ানো হবে না। কেননা, আগুনে পোড়ানো আল্লাহর হক হবার কারণে হারাম। যেমনটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আগুন দ্বারা আজাব কেবল আগুনের মালিকই দিয়ে থাকে।”
[মুগনীঃ ৯/৩৯১]
মালেকী মাজহাবের বক্তব্য হলঃ
وقال أصبغ : “لا يقاد بالسم ولا بالنار
“আসবাগ বলেছেন, বিষ বা আগুন দ্বারা কাউকে হত্যা করা হবে না”
[বয়ান ও তাহসিলঃ ১৫/৪৬১]