প্রথম পর্বের পর থেকে…
প্রথম পর্ব পড়া না থাকলে এই লিঙ্ক থেকে পড়ুনঃ আল-কুরআনের দর্পণে ইহুদি জাতি : পর্ব -০১
ইহুদিদের কর্ম ও আচরণ :
  • ৭. অসৎ কাজের নিষেধ পরিত্যাগ করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
کَانُوۡا لَا یَتَنَاہَوۡنَ عَنۡ مُّنۡکَرٍ فَعَلُوۡہُ ؕ لَبِئۡسَ مَا کَانُوۡا یَفۡعَلُوۡنَ
তারা যেসব গর্হিত কাজ করত তা হতে তারা একে অন্যকে বারণ করত না। তারা যা করত তা কতই না নিকৃষ্ট! [০১]
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের আগের আয়াতে বলেন,
لُعِنَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡۢ بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ عَلٰی لِسَانِ دَاوٗدَ وَ عِیۡسَی ابۡنِ مَرۡیَمَ ؕ ذٰلِکَ بِمَا عَصَوۡا وَّ کَانُوۡا یَعۡتَدُوۡنَ.
ইসরাঈল-বংশধরদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা দাউদ ও মারইয়াম-পুত্র ‘ঈসার মুখে অভিশপ্ত হয়েছিল। তা এ জন্যে যে, তারা অবাধ্যতা করেছিল আর তারা সীমালংঘন করত। [০২]
ইমাম ইবনু কাসির রহি. বলেন,
يُخْبِرُ تَعَالَى أَنَّهُ لَعَنَ الْكَافِرِينَ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ دَهْرٍ طَوِيلٍ، فِيمَا أَنْزَلَ عَلَى دَاوُدَ نَبِيِّهِ، عَلَيْهِ السَّلَامُ، وَعَلَى لِسَانِ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ، بِسَبَبِ عِصْيَانِهِمْ لِلَّهِ وَاعْتِدَائِهِمْ عَلَى خَلْقِهِ.
قَالَ العَوْفِيّ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: لُعِنُوا فِي التَّوْرَاةِ و[فِي] الْإِنْجِيلِ وَفِي الزَّبُورِ، وَفِي الْفُرْقَانِ.
বানী ইসরাঈলের কাফিররা প্রাচীন অভিশপ্ত।দাউদ ও ঈসা আলাইহিমাস সালাম-এর যুগে তারা অভিশপ্তরূপে সাব্যস্ত হয়েছিল। কেননা, তারা ছিল আল্লাহর অবাধ্য এবং তারা আল্লাহর সৃষ্টজীবের প্রতি অত্যাচারী ছিল। আল-আওফি বলেন, ইবনে আব্বাস রাদি. বলেন, তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর, কুরআন প্রভৃতি সমস্ত কিতাবই তাদের উপর লানত বর্ষণ করে আসছে। [০৩]
তাফসিরে তাবারিতে ইবনে আব্বাস রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বনী ইসরাঈলরা ইঞ্জলে ঈসা আলাইহিস সালামের মুখে লানত প্রাপ্ত হয়েছিল। আর যাবুরে দাউদ আলাইহিস সালামের মুখে লানত প্রাপ্ত হয়েছিল। [০৪]
তারা নিজেদের যুগেও একে অপরকে খারাপ কাজ করতে দেখেছে, কিন্তু নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। হারাম কাজগুলো তাদের মধ্যে খোলাখুলিভাবে চলতো এবং কেউ কাউকেও নিষেধ করতো না। এ ছিল তাদের জঘন্য কাজ।আর এটিই লানতের অতিরিক্ত কারণ। তারা একে অপরকে মন্দ কর্ম হতে বাধা প্রদান করত না, যা স্বস্থানে একটা বড় অপরাধ। কোন কোন মুফাসসির (মন্দ কর্মে) বাধা প্রদান না করাকেই অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘন হিসাবে গণ্য করেছেন, যা তাদের অভিশপ্ত হওয়ার কারণ। যাই হোক, উভয় অবস্থাতেই মন্দ কাজ দেখে সেই মন্দ থেকে বাধা প্রদান না করা মহা অপরাধ এবং আল্লাহর গযব বা ক্রোধ ও অভিশাপের কারণ। (অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।) আর হাদিসেও এ ধরনের অপরাধের বড় কঠিন শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এক হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنَّ أَوَّلَ مَا دَخَلَ النَّقْصُ عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَ الرَّجُلُ يَلْقَى الرَّجُلَ فَيَقُولُ : يَا هَذَا، اتَّقِ اللَّهَ وَدَعْ مَا تَصْنَعُ ؛ فَإِنَّهُ لَا يَحِلُّ لَكَ. ثُمَّ يَلْقَاهُ مِنَ الْغَدِ فَلَا يَمْنَعُهُ ذَلِكَ أَنْ يَكُونَ أَكِيلَهُ وَشَرِيبَهُ وَقَعِيدَهُ، فَلَمَّا فَعَلُوا ذَلِكَ ضَرَبَ اللَّهُ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ بِبَعْضٍ. ثُمَّ قَالَ : { لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ } إِلَى قَوْلِهِ : { فَاسِقُونَ }. ثُمَّ قَالَ : كَلَّا وَاللَّهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ، وَلَتَأْخُذُنَّ عَلَى يَدَيِ الظَّالِمِ، وَلَتَأْطُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ أَطْرًا، وَلَتَقْصُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ قَصْرًا.
‘বনী ইসরাঈলের মধ্যে সর্বপ্রথম ত্রুটি ঢুকেছে এভাবে যে, তাদের কেউ অপরজনের সাক্ষাতে বলতো, এই যে! তুমি আল্লাহকে ভয় করো এবং যা অপকর্ম করছো, তা পরিত্যাগ করো। কেননা এগুলো করা তোমার জন্য বৈধ নয়। পরের দিন আবার তার সঙ্গে সাক্ষাত হলে তার অপকর্ম তার সঙ্গে একত্রে পানাহার ও মেলামেশা করতে তাকে বিরত রাখতো না। যখন তাদের অবস্থা এরুপ হলো, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে পরস্পরের সাথে একাকার করে দিলেন। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন, “বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা দাউদ ও মারইয়াম পুত্র ঈসা কর্তৃক অভিশপ্ত হয়েছিল…. ফাসিকুন” পর্যন্ত (সুরাহ আল-মাইদাহ, আয়াত ৭৮-৮১)। পুনরায় তিনি বলেন, কখনো নয়, আল্লাহর কসম! তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দিবে এবং মন্দ কাজে বাধা দিবে এবং অবশ্যই অত্যাচারির দুই হাত ধরে তাকে সৎপথে ফিরে আসতে ও সত্যের উপর অবিচল থাকতে বাধ্য করবে। [০৫]
হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ لَيُوشِكَنَّ اللَّهُ أَنْ يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عِقَابًا مِنْهُ ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلاَ يُسْتَجَابُ لَكُمْ.
সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয়ই তোমরা সৎকাজের জন্য আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করবে। তা না হলে আল্লাহ তাআলা শীঘ্রঈ তোমাদের উপর তাঁর শাস্তি অবতীর্ণ করবেন। তোমরা তখন তার নিকট দুআ করলেও তিনি তোমাদের সেই দুআ গ্রহন করবেন না। [০৬]
আয়িশাহ রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি,
مُرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ قَبْلَ أَنْ تَدْعُوا فَلاَ يُسْتَجَابَ لَكُمْ .‏
তোমরা সৎকাজের আদেশ দিবে এবং মন্দ কাজে বাধা দিবে এমন সময় আসার পূর্বে যখন তোমরা দুআ করবে কিন্তু তা কবুল হবে না। [০৭]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُعَذِّبُ الْعَامَّةَ بِعَمَلِ الْخَاصَّةِ حَتَّى يَرَوُا الْمُنْكَرَ بَيْنَ ظَهْرَانَيْهِمْ، وَهُمْ قَادِرُونَ عَلَى أَنْ يُنْكِرُوهُ فَلَا يُنْكِرُوهُ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَذَّبَ اللَّهُ الْخَاصَّةَ وَالْعَامَّةَ.
বিশিষ্ট লোকদের পাপের কারণে আল্লাহ সাধারণ লোকদেরকে শান্তি দেন না, কিন্তু ঐ সময় দিয়ে থাকেন যখন তাদের মধ্যে কু-কাজ ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা তাদেরকে বাধা প্রদান করে না। ঐ সময় আল্লাহ বিশিষ্ট ও সাধারণ সমস্ত লোককেই স্বীয় শাস্তি দ্বারা ঘিরে নেন। [০৮]
  • ৮. কাফির-মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
تَرٰی کَثِیۡرًا مِّنۡہُمۡ یَتَوَلَّوۡنَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ؕ لَبِئۡسَ مَا قَدَّمَتۡ لَہُمۡ اَنۡفُسُہُمۡ اَنۡ سَخِطَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ وَ فِی الۡعَذَابِ ہُمۡ خٰلِدُوۡنَ. وَ لَوۡ کَانُوۡا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ النَّبِیِّ وَ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡہِ مَا اتَّخَذُوۡہُمۡ اَوۡلِیَآءَ وَ لٰکِنَّ کَثِیۡرًا مِّنۡہُمۡ فٰسِقُوۡنَ.
তাদের অনেককে তুমি অবিশ্বাসীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবে। তাদের কৃতকর্ম কত নিকৃষ্ট, যে কারণে আল্লাহ তাদের উপর ক্রোধান্বিত হয়েছেন! আর তারা চিরকাল শাস্তিভোগ করবে। আর তারা আল্লাহ ও নবীর প্রতি এবং তার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তাতে ঈমান আনলে কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না, কিন্তু তাদের অনেকেই ফাসিক। [০৯]
কাফিরদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখার ফল এই যে, আল্লাহ তাদের উপর অসন্তুষ্ট ও ক্রোধান্বিত হয়েছেন। আর এই অসন্তুষ্টির পরিণাম হচ্ছে, জাহান্নামের চিরস্থায়ী শাস্তি। আসলে যার মধ্যে প্রকৃতার্থে ঈমান আছে, সে কষ্মিনকালেও কাফেরদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করবে না।
  • ৯. চুক্তি ভঙ্গ করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
اَوَ کُلَّمَا عٰہَدُوۡا عَہۡدًا نَّبَذَہٗ فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ ؕ بَلۡ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ
এটা কি নয় যে, তারা যখনই কোন অঙ্গীকার করেছে তখনই তাদের কোন এক দল তা ছুঁড়ে ফেলেছে ? বরং তাদের অধিকাংশই ঈমান আনে না। [১০]
অত্র আয়াতে ইয়াহুদিদের একটি চিরাচরিত স্বভাবের কথা বলা হচ্ছে। তা হল, যখনই তারা কোন বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় তখন তা ভঙ্গ করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই এ সকল ইয়াহুদিদের সাথে অঙ্গীকার করতেন তখন তারা তা ভঙ্গ করার পাঁয়তারা করত।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
اِنَّ شَرَّ الدَّوَا۬بِّ عِنْدَ اللہِ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا فَھُمْ لَا یُؤْمِنُوْ. اَلَّذِیْنَ عٰھَدْتَّ مِنْھُمْ ثُمَّ یَنْقُضُوْنَ عَھْدَھُمْ فِیْ کُلِّ مَرَّةٍ وَّھُمْ لَا یَتَّقُوْنَ.
আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট জীব তারাই যারা কুফরী করে এবং ঈমান আনে না। তাদের মধ্যে তুমি যাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ, তারা প্রত্যেকবার তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে এবং তারা সাবধান হয় না। [১১]
তারা হল প্রকৃতপক্ষেই খিয়ানতকারী।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا تَزَالُ تَطَّلِعُ عَلٰي خَائِنَةٍ مِّنْهُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ.
সর্বদা তুমি তাদের অল্পসংখ্যক ব্যতীত সকলকেই বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখতে পাবে। [১২]
আর এজন্যই ইয়াহুদিদের সাথে কোন প্রকার চুক্তি বা সন্ধিতে আবদ্ধ হওয়া যাবে না। কারণ তারা অঙ্গীকার ভঙ্গকারী জাতি।
এর মূল কারণ হল, তারা ঈমানদার নয় বরং মুনাফিক। যদি ঈমান আনত তাহলে তাদের মত হত যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللّٰهَ عَلَيْهِ
মুমিনদের মধ্যে কতক লোক এমনও আছে যারা আল্লাহ্র সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে। [১৩]
  • ১০. অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ হরণ করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
وَّ اَخۡذِہِمُ الرِّبٰوا وَ قَدۡ نُہُوۡا عَنۡہُ وَ اَکۡلِہِمۡ اَمۡوَالَ النَّاسِ بِالۡبَاطِلِ ؕ وَ اَعۡتَدۡنَا لِلۡکٰفِرِیۡنَ مِنۡہُمۡ عَذَابًا اَلِیۡمًا
আর তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল এবং অবৈধভাবে মানুষের সম্পদ খাওয়ার কারণে। আর আমি তাদের মধ্য থেকে কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব। [১৪]
উপরে উল্লেখিত আয়াতে প্রসঙ্গ জানতে হলে সুরাহ আল-মাইদাহ-এর ১৬০ আয়াত পড়তে হবে। সেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَبِظُلۡمٍ مِّنَ الَّذِیۡنَ ہَادُوۡا حَرَّمۡنَا عَلَیۡہِمۡ طَیِّبٰتٍ اُحِلَّتۡ لَہُمۡ وَ بِصَدِّہِمۡ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ کَثِیۡرًا.
বহু পবিত্র জিনিস যা ইহুদীদের জন্য বৈধ ছিল, তা আমি তাদের জন্য অবৈধ করেছি তাদের জুলুম-সীমালংঘনের কারণে এবং আল্লাহর পথে অনেককে বাধা দেবার কারণে।
এরপরে আল্লাহ তাআলা ১৬১ আয়াতে বলেন, (আরও যে অপরাধের কারণে তাদের জন্য বৈধ জিনিসকে অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়েছে) আর তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল এবং অবৈধভাবে মানুষের সম্পদ খাওয়ার কারণে। আর এর বিস্তারিত বিবরণ সুরাহ আল-আনআম, আয়াত ১৪৬-এ আছে।
  • ১১. যুদ্ধক্ষেত্রে কাপুরুষতা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
لَنۡ یَّضُرُّوۡکُمۡ اِلَّاۤ اَذًی ؕ وَ اِنۡ یُّقَاتِلُوۡکُمۡ یُوَلُّوۡکُمُ الۡاَدۡبَارَ ۟ ثُمَّ لَا یُنۡصَرُوۡنَ. ضُرِبَتۡ عَلَیۡہِمُ الذِّلَّۃُ اَیۡنَ مَا ثُقِفُوۡۤا اِلَّا بِحَبۡلٍ مِّنَ اللّٰہِ وَ حَبۡلٍ مِّنَ النَّاسِ وَ بَآءُوۡ بِغَضَبٍ مِّنَ اللّٰہِ وَ ضُرِبَتۡ عَلَیۡہِمُ الۡمَسۡکَنَۃُ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ بِاٰیٰتِ اللّٰہِ وَ یَقۡتُلُوۡنَ الۡاَنۡۢبِیَآءَ بِغَیۡرِ حَقٍّ ؕ ذٰلِکَ بِمَا عَصَوۡا وَّ کَانُوۡا یَعۡتَدُوۡنَ.
সামান্য কষ্ট দেয়া ছাড়া তারা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর যদি তারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তবে তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে; তারপর তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও মানুষের প্রতিশ্রুতির বাইরে যেখানেই তাদেরকে পাওয়া গেছে সেখানেই তারা লাঞ্ছিত হয়েছে। আর তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হয়েছে এবং তাদের উপর দারিদ্র নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এটা এ জন্যে যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহের সাথে কুফরী করত এবং অন্যায়ভাবে নবীগণকে হত্যা করত; তা এজন্য যে, তারা অবাধ্য হয়েছিল এবং সীমালংঘন করত। [১৫]
আয়াতে ‘‘কষ্ট দেওয়া’’ বলতে মৌখিকভাবে মিথ্যা অপবাদ রটানো উদ্দেশ্য। এর দ্বারা সাময়িকভাবে অবশ্যই কষ্ট হয়। তবে যুদ্ধের ময়দানে তোমাদেরকে পরাজিত করতে পারবে না। হলও তা-ই। মদীনা থেকেও ইয়াহুদীদেরকে বের হতে হল। অতঃপর মুসলিমরা খায়বার বিজয় করলে সেখান থেকেও বের হল। অনুরূপ শাম (সিরিয়া) অঞ্চলে খ্রিস্টানদেরকে মুসলিমদের হাতে পরাজিত হতে হয়। ক্রুসেড যুদ্ধে খ্রিস্টানরা এর প্রতিশোধ গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চালায় এবং বায়তুল মুক্বাদ্দাস দখল করে নেয়। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আয়্যূবী রহি. ৯০ বছর পর পুনরায় তা ফিরিয়ে আনেন। বর্তমানে মুসলিমদের ঈমানী দুর্বলতার ফল স্বরূপ এবং ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের মিলিত চক্রান্ত ও প্রচেষ্টায় বায়তুল মুক্বাদ্দাস আবারও মুসলিমদের হাতছাড়া হয়েছে। তবে অতি সত্বর এমন সময় আসবে যে, অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে, বিশেষ করে ঈসা আলাইহিস সাসাম-এর অবতরণের পর খ্রিস্টবাদের পরিসমাপ্তি ঘটবে এবং সহীহ হাদীসসমূহের বর্ণনা অনুযায়ী ইসলামের বিজয় সুনিশ্চিত হবে। -ইবনে কাসীর, (সামান্য পরিবর্তনের সাথে) উল্লেখিত আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য।
  • ১২. দুনিয়াপ্রীতি :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
وَ لَتَجِدَنَّہُمۡ اَحۡرَصَ النَّاسِ عَلٰی حَیٰوۃٍ ۚۛ وَ مِنَ الَّذِیۡنَ اَشۡرَکُوۡا ۚۛ یَوَدُّ اَحَدُہُمۡ لَوۡ یُعَمَّرُ اَلۡفَ سَنَۃٍ ۚ وَ مَا ہُوَ بِمُزَحۡزِحِہٖ مِنَ الۡعَذَابِ اَنۡ یُّعَمَّرَ ؕ وَ اللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ.
আর তুমি তাদেরকে পাবে জীবনের প্রতি সর্বাধিক লোভী মানুষরূপে। এমনকি তাদের থেকেও যারা শিরক করেছে। তাদের একজন কামনা করে, যদি হাজার বছর তাকে জীবন দেয়া হত! অথচ দীর্ঘজীবী হলেই তা তাকে আযাব থেকে নিষ্কৃতি দিতে পারবে না। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। [১৬]
  • ১৩. আল্লাহর কিতাবের বিকৃতি :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
اَفَتَطۡمَعُوۡنَ اَنۡ یُّؤۡمِنُوۡا لَکُمۡ وَ قَدۡ کَانَ فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ یَسۡمَعُوۡنَ کَلٰمَ اللّٰہِ ثُمَّ یُحَرِّفُوۡنَہٗ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا عَقَلُوۡہُ وَ ہُمۡ یَعۡلَمُوۡنَ.
তোমরা কি এই আশা করছ যে, তারা তোমাদের প্রতি ঈমান আনবে? অথচ তাদের একটি দল ছিল যারা আল্লাহর বাণী শুনত অতঃপর তা বুঝে নেয়ার পর তা তারা বিকৃত করত জেনে বুঝে। [১৭]
এছাড়াও এ বিষয়ে আরো অনেক আয়াত রয়েছে।
ইহুদিদের চরিত্র :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। নাজি সৈন্যদের হাতে কিছু রুশ সৈন্য বন্দি হলো তাদের মধ্যে একজন হলো বরিস। বন্দি থাকাকালে সে প্রতি দিনের দিনলিপি লিখতো। এক দিনের দিনলিপিতে সে লিখেছে :
আজ আমাদের বন্দিজীবনের ২০তম দিন পার হলো। আজ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। আমাদের বন্দিশিবিরটা অস্ট্রিয়ার সীমান্তে অবস্থিত। এটা একটা গ্যাস চেম্বার। প্রতিদিন এখানে অনেক ইহুদিকে ধরে আনা হয়। এভাবে আস্তে আস্তে পুরো বন্দিশিবিরটা ইহুদিতে ভরে গেল। কারা কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিলো, কিছু বন্দি কমিয়ে ফেলবে। আমরা যারা রুশ বন্দি, তাদেরকে একটা জায়গায় জড়ো করা হলো। কিছুক্ষণ পর সেখানে অনেক ইহুদিকে নিয়ে আসা হলে। উভয় দলকে একটা গর্ত খুঁড়তে বলা হলো। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করে গর্ত খোঁড়া হলো। কাজ শেষ হলে আমরা যারা রুশ ছিলাম তাদেরকে বলা হলো- তোমরা গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে এসো। আমরা বেরিয়ে এলাম। আমাদেরকে বলা হলো : এবার তোমরা গর্তে মাটি ফেলো। গর্তের ভিতরের ইহুদিদেরকে জীবন্ত পুঁতে ফেলো। আমরা এই অমানবিক কাজ করতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলাম। জার্মান সেনা অফিসার রেগে গেলেন। আমাদেরকেই এবার গর্তে নামতে বললেন। ইহুদি বন্দীদেরকে গর্ত থেকে বের হয়ে আসতে বললেন। তাদেরকে আদেশ দিলেন : তোমরা এই রুশ সৈন্যদের উপর বেলচা দিয়ে মাটি ফেলো। তাদেরকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম : ইহুদির বাচ্চাগুলো নির্বিকার চিত্তে আমাদের উপর মাটি ফেলতে উদ্যত হলো। বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না। তাদের চেহারায় কোনো রকমের অনুশোচনাও দেখা গেল না। তখন জার্মান অফিসার বললেন : এই তোমরা থামো। মাটি ফেলতে হবে না। অফিসার আমাদেরকে উপরে উঠে আসতে হুকুম দিলেন আর বললেন : দেখলে তো! এরাই হল ইহুদির জাত। এদের স্বভাবই এমন। এজন্য ফুয়েরার এডলফ হিটলার এদেরকে নির্মূল করতে চাইছেন। [১৮]
Join the Conversation
By - আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইমাম ও খতিব, বায়তুল ফালাহ্ জামে মসজিদ, শের-এ বাংলা রোড, খুলনা।