আল-কুরআনের দর্পণে ইহুদি জাতি : পর্ব -০১

কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের বিভিন্ন হটকারিতাপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। সেগুলো আমাদের জানতে হবে এজন্য-যাতে করে আমরা সেগুলো বর্জন করতে পারি। কারণ তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে শুধুমাত্র তাদের পণ্য বর্জনের মাধ্যমে সাহায্য পাওয়া যাবে না; সাথে সাথে তাদের বৈশিষ্ট্যও নিজেদের ভেতর থেকে বের করতে হবে এবং সেই সাথে সাথে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার যেসকল শর্ত রয়েছে সে শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।
ইহুদিদের কর্ম ও আচরণ :
  • ০১. আল্লাহ তাআলা ও আখেরাত দিবস-কে অবিশ্বাস করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
قَاتِلُوا الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ لَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَ لَا یُحَرِّمُوۡنَ مَا حَرَّمَ اللّٰہُ وَ رَسُوۡلُہٗ وَ لَا یَدِیۡنُوۡنَ دِیۡنَ الۡحَقِّ مِنَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ حَتّٰی یُعۡطُوا الۡجِزۡیَۃَ عَنۡ ‌یَّدٍ وَّ ہُمۡ صٰغِرُوۡنَ ﴿٪۲۹﴾
তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সে সব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তার রাসুল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিয্য়া দেয়। [০১]
ইহুদি ও খ্রিস্টানরা আল্লাহ তাআলা এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখত, তা সত্ত্বেও তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা আল্লাহ তাআলা এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে না। এ থেকে এটা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার প্রতি সেভাবে ঈমান না আনবে যেভাবে আল্লাহ তাআলা রাসুলগণের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়।
অধিকাংশ আলিম এ আয়াতের ভিত্তিতে বলেছেন, জিযিয়া কেবল আহলে কিতাবের থেকে নেয়া হবে। কেননা তাদের ছাড়া অন্যের কাছ থেকে জিযিয়া নেয়ার কথা বলা হয়নি। অন্যরা হয় ইসলাম গ্রহণ করবে নতুবা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। [০২]
  • ০২. তাওরাত-কে অস্বীকার করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
وَ کَیۡفَ یُحَکِّمُوۡنَکَ وَ عِنۡدَہُمُ التَّوۡرٰىۃُ فِیۡہَا حُکۡمُ اللّٰہِ ثُمَّ یَتَوَلَّوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ ؕ وَ مَاۤ اُولٰٓئِکَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ ﴿٪۴۳﴾
আর কীভাবে তারা তোমাকে ফয়সালাকারী বানায়? অথচ তাদের কাছে রয়েছে তাওরাত, যাতে আছে আল্লাহর বিধান, তা সত্ত্বেও তারা এরপর মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তারা মুমিনও নয়। [০৩]
  • ০৩. আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে উপহাস করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
لَقَدۡ سَمِعَ اللّٰہُ قَوۡلَ الَّذِیۡنَ قَالُوۡۤا اِنَّ اللّٰہَ فَقِیۡرٌ وَّ نَحۡنُ اَغۡنِیَآءُ ۘ
আল্লাহ শুনেছেন তাদের কথা যারা বলে, আল্লাহ অবশ্যই অভাবগ্রস্ত এবং আমরা অভাবমুক্ত। [০৪]
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে আরো বলেন,
وَقَالَتِ الْيَهُوْدُ يَدُ اللّٰهِ مَغْلُوْلَةٌ غُلَّتْ اَیْدِیْھِمْ وَلُعِنُوْا بِمَا قَالُوْا بَلْ یَدٰھُ مَبْسُوْطَتٰنِ یُنْفِقُ کَیْفَ یَشَا۬ئُ
ইহুদিরা বলে, আল্লাহর হাত রুদ্ধ, তারাই রুদ্ধহস্ত এবং তারা যা বলে তজ্জন্য তারা অভিশপ্ত, বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত; যেভাবে ইচ্ছা তিনি দান করেন। [০৫]
  • ০৪. প্রতিশ্রুত নবীকে অস্বীকার করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
وَ لَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۸۹﴾
আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এল, অথচ তারা পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লানত। [০৬]
ইতিহাস আমাদেরকে কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যখন ইহুদি ও আরবের মুশরিকদের মধ্যে যুদ্ধ বাধত তখন ইহুদিরা কাফিরদেরকে বলত, অতি সত্বরই একজন বড় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার সত্য কিতাব নিয়ে আবির্ভুত হবেন। আমরা তার অনুসারী হয়ে তোমাদেরকে এমনভাবে হত্যা করব যে, তোমাদের নাম-নিশানা দুনিয়ার বুক থেকে মুছে যাবে। তারা আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করত, হে আল্লাহ! আপনি অতি সত্বরই ঐ নাবীকে পাঠিয়ে দিন যার গুণাবলী আমরা তাওরাতে পাচ্ছি, যাতে আমরা তার ওপর ঈমান এনে তার সঙ্গ লাভ করত আমাদের বাহু মজবুত করতে পারি। আপনার শত্রদের প্রতিশোধ নিতে পারি। তারা কাফিরদেরকে বলত যে, ঐ নাবীর আগমনের সময় খুবই নিকটবর্তী হয়েছে।
অতঃপর যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হলেন, তখন তারা তার মধ্যে সমস্ত নিদর্শন দেখতে পেল, তাকে চিনতে পারল এবং মনে মনে বিশ্বাস করল। কিন্তু তিনি তাদের বংশদ্ভূত ছিলেন না বিধায় তারা হিংসার বশবর্তী হয়ে তার নবুওয়াতকে অস্বীকার করে বসল। তখন তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার অভিশাপ নেমে আসল। বরং মদীনার লোকেরা যারা তাদের (ইহুদিদের) মুখেই এ কথা শুনে আসছিল তারা ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয় এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গী হয়ে ইহুদিদের ওপর বিজয় লাভ করে।
একদা মুয়ায বিন জাবাল রাদি. বাসার বিন বারা রাদি. এবং দাউদ বিন সালমা রাদি. মদীনার ঐ ইহুদিদেরকে বলেই ফেললেন, তোমরাই তো আমাদের সামনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াতের আলোচনা করতে, তার যে গুণাবলী তোমরা বর্ণনা করতে তা সবই তার মধ্যে রয়েছে। এমনকি তোমরা তাকে কেন্দ্র করে আমাদেরকে কত কথা শোনাতে আর এখন তোমরাই তার প্রতি ঈমান আনছ না কেন? তার সঙ্গী হচ্ছ না কেন? সালাম বিন মিশকিম উত্তর দেয়, আমরা তার কথা বলতাম না।
আসলে এ আয়াতের মধ্যে তারই বর্ণনা রয়েছে, যাকে তারা প্রথম হতেই মানত, যার অপেক্ষায় অপেক্ষমানও ছিল, কিন্তু তার আগমনের পর হিংসা ও অহঙ্কারবশত এবং শাসন ক্ষমতা হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যা কিছু নাযিল করেছেন তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে বসে। ফলশ্রতিতে তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার ক্রোধ এবং অপমানজনক শাস্তি অবধারিত হলো।
  • ০৫. সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ ও সত্যকে গোপন করা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
وَ اٰمِنُوۡا بِمَاۤ اَنۡزَلۡتُ مُصَدِّقًا لِّمَا مَعَکُمۡ وَ لَا تَکُوۡنُوۡۤا اَوَّلَ کَافِرٍۭ بِہٖ ۪ وَ لَا تَشۡتَرُوۡا بِاٰیٰتِیۡ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۫ وَّ اِیَّایَ فَاتَّقُوۡنِ ﴿۴۱﴾ وَ لَا تَلۡبِسُوا الۡحَقَّ بِالۡبَاطِلِ وَ تَکۡتُمُوا الۡحَقَّ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۴۲﴾
আর তোমাদের সাথে যা আছে তার সত্যায়নকারীস্বরূপ আমি যা নাযিল করেছি তার প্রতি তোমরা ঈমান আন এবং তোমরা তার প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। আর তোমরা আমার আয়াতসমূহ সামান্যমূল্যে বিক্রি করো না এবং কেবল আমাকেই ভয় কর। আর তোমরা হককে বাতিলের সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে হককে গোপন করো না। [০৭]
ইবনু আব্বাস রাদি. বলেন, হে আহলে কিতাবগণ, তোমরা তাঁর প্রতি প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। কারণ তোমাদের নিকট এমন জ্ঞান আছে যা অন্যদের নিকট নেই।
আবুল আলিয়া রহি. বলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তোমরা প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। এরূপ বলেছেন হাসান বসরী, সুদ্দী, রাবী বিন আনাস।
ইবনু জারীর রহি. বলেন, আমার কাছে গ্রহণযোগ্য কথা হল, তোমরা কুরআনের প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না। -তাফসীর ইবনে কাসীর
আহলে কিতাবদেরকে এ কথা বলার কারণ হল, তাদেরকে আসমানী কিতাব দেয়া হয়েছে, তাদের কাছে মুহাম্মাদ ও কুরআনের ব্যাপারে জ্ঞান ছিল, তাই তারাই যদি প্রথম অস্বীকারকারী হয় তাহলে যাদের কিতাব দেয়া হয়নি তারা কখনোই ঈমান আনবে না।
(وَلَا تَشْتَرُوْا بِاٰیٰتِیْ ثَمَنًا قَلِیْلًا)
‘আর আমার আয়াতসমূহের পরিবর্তে সামান্য মূল্য গ্রহণ কর না’এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম সুদ্দী বলেন: এর ভাবার্থ হল, আল্লাহ তাআলার আয়াতের বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করা।
বিশিষ্ট তাবেয়ী রাবী বিন আনাস এবং আবুল আলিয়া বলেন, আল্লাহ তাআলার আয়াতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ কর না।
সঠিক কথা হল বানী ইসরাঈলরা যেন আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁর রাসুলের সত্যতার স্বীকার পরিত্যাগ না করে। যদিও এর বিনিময়ে সারা দুনিয়াও তারা পেয়ে যায়। আখিরাতের তুলনায় তা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। স্বয়ং এটা তাদের কিতাবে বিদ্যমান রয়েছে।
আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَي بِهِ وَجْهُ اللّٰهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلاَّ لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
যে বিদ্যা দ্বারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভ করা যায় তা যদি কেউ দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে তবে সে কিয়ামাতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না। [০৮]
এর অর্থ এমন নয় যে, কুরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে বিনিময় গ্রহণ করা বৈধ নয়। বরং শিক্ষা গ্রহণ করবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তবে তা শিক্ষা দিয়ে বিনিময় নিতে পারবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীগণের একটি দল একটি কুয়ার পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। কূপের পাশে অবস্থানকারীদের মধ্যে ছিল সাপে কাটা এক ব্যক্তি কিংবা তিনি বলেছেন, দংশিত এক ব্যক্তি। তখন কূপের কাছে বসবাসকারীদের একজন এসে তাদের বলল, আপনাদের মধ্যে কি কোন ঝাড়-ফুঁককারী আছেন? কূপ এলাকায় একজন সাপ বা বিচ্ছু দংশিত লোক আছে। তখন সাহাবীদের মধ্যে একজন সেখানে গেলেন। এরপর কিছু বকরী দানের বিনিময়ে তিনি সূরা ফাতিহা পড়লেন। ফলে লোকটির রোগ সেরে গেল। এরপর তিনি ছাগলগুলো নিয়ে সাথীদের নিকট আসলেন, কিন্তু তারা কাজটি পছন্দ করলেন না। তারা বললেন, আপনি আল্লাহর কিতাবের উপর পারিশ্রমিক নিয়েছেন। অবশেষে তারা মদীনায় পৌঁছে বলল, হে আল্লাহর রসূল! তিনি আল্লাহর কিতাবের উপর পারিশ্রমিক গ্রহণ করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللهِ.
যে সকল জিনিসের উপর তোমরা বিনিময় গ্রহণ করে থাক, তন্মধ্যে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার সবচেয়ে বেশি হক রয়েছে আল্লাহর কিতাবের। [০৯]
অন্য হাদীসে আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক মহিলা সাহাবীর সাথে অপর সাহাবীকে বিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে বলেছেন, তোমার সাথে এই নারীর বিয়ে দিলাম এ মোহরের বিনিময়ে যে, তোমার যতটুকু কুরআন মাজীদ মুখস্ত আছে তা তুমি তাকে মুখস্ত করিয়ে দেবে।
অতএব ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষার পিছনে সময় ব্যয়ের বিনিময় নেয়া বৈধ। শিক্ষক যেন সচ্ছলভাবে জীবন যাপন করতে পারে এবং স্বীয় প্রয়োজনাদি পূরণ করতে পারে এজন্য বায়তুল মাল হতে গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ। যদি বায়তুল মাল হতে কিছুই পাওয়া না যায় এবং বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার কারণে অন্য কাজ করার সুযোগ না পান তবে তার জন্য বেতন নির্ধারণ করাও বৈধ।
ইমাম মালিক, শাফিঈ, আহমাদ বিন হাম্বাল ও জমহুর উলামার এটাই মতামত। -তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়াতের তাফসীর
আল্লাহ তাআলা ইহুদিদেরকে নিষেধ করে বলছেন,
لَا تَلۡبِسُوا الۡحَقَّ بِالۡبَاطِلِ وَ تَکۡتُمُوا الۡحَقَّ وَ اَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ
তোমরা সত্যকে বাতিলের সাথে মিশ্রণ কর না এবং সত্য গোপন কর না।
আল্লাহ তাআলা সত্যকে বাতিলের সাথে মিশ্রণ ও সত্য গোপন উভয়কে নিষেধ করেছেন। কারণ তাদের কাছে এটাই কামনা।
প্রকৃতপক্ষে যারা এ সত্যকে বাতিলের সাথে মিশ্রণ ও গোপন করবে না তারাই নাবী-রাসুলদের ওয়ারিশ ও উম্মাতের পথপ্রদর্শক। পক্ষান্তরে এর বিপরীত যারা করে তারাই হল জাহান্নামের দিকে আহ্বানকারী। [১০]
  • ০৬. নিফাক- প্রকটতা :
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে বলেন,
وَ اِذَا لَقُوا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قَالُوۡۤا اٰمَنَّا ۚۖ وَ اِذَا خَلَا بَعۡضُہُمۡ اِلٰی بَعۡضٍ قَالُوۡۤا اَتُحَدِّثُوۡنَہُمۡ بِمَا فَتَحَ اللّٰہُ عَلَیۡکُمۡ لِیُحَآجُّوۡکُمۡ بِہٖ عِنۡدَ رَبِّکُمۡ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ﴿۷۶﴾
আর যখন তারা মুমিনদের সাথে সাক্ষাৎ করে তখন বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’। আর যখন একে অপরের সাথে একান্তে মিলিত হয় তখন বলে, ‘তোমরা কি তাদের সাথে সে কথা আলোচনা কর, যা আল্লাহ তোমাদের উপর উম্মুক্ত করেছেন, যাতে তারা এর মাধ্যমে তোমাদের রবের নিকট তোমাদের বিরুদ্ধে দলীল পেশ করবে? তবে কি তোমরা বুঝ না? [১১]
আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের একটি ঘৃণিত আচরণের কথা বলেছেন। তা হল, যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা ঈমানের কথা বলে আবার যখন ইহুদি-মুনাফিকদের সাথে মিলিত হয় তখন তা অস্বীকার করে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সতর্ক করে বলে দিচ্ছেন, তারা যতই টালবাহানা করুক তারা জানে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানেন। বস্তুত সত্য জানার পরেও তা অস্বীকার করা খুবই নিন্দনীয়। আর যাদের ওপর আল্লাহ তাআলার গযব পতিত হয়েছে, তাদের কাছ থেকে ঈমানের আশা না করাই উচিত।
আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদ আরও বলেন,
وَ قَالَتۡ طَّآئِفَۃٌ مِّنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ اٰمِنُوۡا بِالَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ عَلَی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَجۡہَ النَّہَارِ وَ اکۡفُرُوۡۤا اٰخِرَہٗ لَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ ﴿ۚۖ۷۲﴾
আর কিতাবীদের একদল বলে, মুমিনদের উপর যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা তার প্রতি দিনের প্রথমভাগে ঈমান আন, আর শেষ ভাগে তা কুফরী কর; যাতে তারা ফিরে আসে। [১২]
ইহুদিরা সর্বক্ষণ কামনা করত মুসলিমগণ পথভ্রষ্ট হয়ে যাক, তারা চায় মুসলিমরা আবার কাফির হয়ে যাক। তাদের এ নিকৃষ্ট কামনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অপকৌশল করত। তাদের সাথীদের বলতো দিনের প্রথমভাগে মুসলিমদের প্রতি যে কিতাব নাযিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান আন, আর বিকাল বেলা কুফরী কর। ফলে সাধারণ মুর্খ মানুষেরা মনে করবে মুহাম্মাদের দ্বীন ত্রুটিপূর্ণ, তাই এরা ঈমান আনার পর আবার ফিরে এসেছে।
তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী সকালে ঈমান এনে মুসলিমদের সাথে জামাআতে সালাত আদায় করত আবার বিকালে সব ত্যাগ করে নিজ ধর্মে ফিরে যেত। ইয়াহূদীরা আজও মুসলিমদেরকে নিধন ও ধর্ম ত্যাগ করার জন্য সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সুতরাং আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকা উচিত কোন ক্রমেই যেন তাদের ষড়যন্ত্রের জালে নিজেরা আবদ্ধ না হই।
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَتَّخِذُوۡا بِطَانَۃً مِّنۡ دُوۡنِکُمۡ لَا یَاۡلُوۡنَکُمۡ خَبَالًا ؕ وَدُّوۡا مَا عَنِتُّمۡ ۚ قَدۡ بَدَتِ الۡبَغۡضَآءُ مِنۡ اَفۡوَاہِہِمۡ ۚۖ وَ مَا تُخۡفِیۡ صُدُوۡرُہُمۡ اَکۡبَرُ ؕ قَدۡ بَیَّنَّا لَکُمُ الۡاٰیٰتِ اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ ﴿۱۱۸﴾ ہٰۤاَنۡتُمۡ اُولَآءِ تُحِبُّوۡنَہُمۡ وَ لَا یُحِبُّوۡنَکُمۡ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡکِتٰبِ کُلِّہٖ ۚ وَ اِذَا لَقُوۡکُمۡ قَالُوۡۤا اٰمَنَّا ۚ٭ۖ وَ اِذَا خَلَوۡا عَضُّوۡا عَلَیۡکُمُ الۡاَنَامِلَ مِنَ الۡغَیۡظِ ؕ قُلۡ مُوۡتُوۡا بِغَیۡظِکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ ﴿۱۱۹﴾ اِنۡ تَمۡسَسۡکُمۡ حَسَنَۃٌ تَسُؤۡہُمۡ ۫ وَ اِنۡ تُصِبۡکُمۡ سَیِّئَۃٌ یَّفۡرَحُوۡا بِہَا ؕ وَ اِنۡ تَصۡبِرُوۡا وَ تَتَّقُوۡا لَا یَضُرُّکُمۡ کَیۡدُہُمۡ شَیۡـًٔا ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِمَا یَعۡمَلُوۡنَ مُحِیۡطٌ ﴿۱۲۰﴾
হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের সর্বনাশ করতে ত্রুটি করবে না। তারা তোমাদের মারাত্মক ক্ষতি কামনা করে। তাদের মুখ থেকে তো শত্রুতা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে। আর তাদের অন্তরসমূহ যা গোপন করে তা অধিক ভয়াবহ। অবশ্যই আমি তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্ট বর্ণনা করেছি। যদি তোমরা উপলব্ধি করতে। শোন, তোমরাই তো তাদেরকে ভালবাস এবং তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না। অথচ তোমরা সব কিতাবের প্রতি ঈমান রাখ। আর যখন তারা তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’। আর যখন তারা একান্তে মিলিত হয়, তোমাদের উপর রাগে আঙ্গুল কামড়ায়। বল, তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে মর! নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত। যদি তোমাদেরকে কোন কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন তাদের কষ্ট হয়। আর যদি তোমাদেরকে মন্দ স্পর্শ করে, তখন তারা তাতে খুশি হয়। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছু ক্ষতি করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে, তা পরিবেষ্টনকারী। [১৩]
উল্লেখিত আয়াতসমূহের ব্যাপারে কিছু আলোচনা :
মুমিনগণ কেবল মুমিনদেরকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, অন্য কাউকে না। এ সম্পর্কে সুরাহ বাকারাতে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আল্লাহ তাআলা আরো কঠোরভাবে ধমক দিয়ে কাফির-মুশরিকসহ অন্যান্যদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করছেন। যদিও আয়াতে মুনাফিকদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, তবে মুনাফিকসহ সকল কাফির এতে শামিল; কারণ তারা তোমাদের ভাল চায় না, সুযোগ পেলেই তোমাদের ক্ষতি করবে। মুখে বাহ্যিকভাবে খুব সুসম্পর্কের কথা বলবে, এমনকি অনেক কিছু আদান-প্রদান করবে। মাঝে মাঝে বিদ্বেষমূলক কথা বের হয়ে যাবে। কিন্তু অন্তরে যে বিদ্বেষ গোপন করে আছে তা আরো ভয়ংকর। আমরা মুসলিমরা তাদের প্রতি ভালবাসা দেখালে কি হবে, তারা মূলত আমাদের ভালবাসে না, তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ক্ষণিকের সম্পর্ক রাখে; কিন্তু সুযোগ পেলেই তাদের আসল চেহারা প্রকাশ পেয়ে যাবে। সুতরাং তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই। যদি মুসলিমরা তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে কখনো পূর্ণ ঈমানের ওপর টিকে থাকতে পারবে না এবং দুনিয়াতে তাদের ওপর বিজয়ী হতে পারবে না। আরবিতে একটি প্রবাদ রয়েছে যার অর্থ হলো: কোন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না; বরং ব্যক্তির বন্ধু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর। কারণ ব্যক্তি তার বন্ধুর অনুসরণ করে চলে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, একজন ব্যক্তি তার বন্ধুর ধর্ম অনুরসণ করে থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ রাখে সে কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে। [১৪]
সুতরাং রাষ্ট্র প্রধানদেরও লক্ষ রাখা দরকার কাদের সাথে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক করছেন। ‘বিতানাহ’এমন অন্তরঙ্গ বন্ধু, যার নিকট গোপন তথ্য বলা হয়। তোমরা মুনাফিকদের বাহ্যিক সালাত এবং ঈমানের ধোঁকায় তাদের বন্ধু বানিয়ে নাও। জেনে রেখ! তারা তোমাদেরকে ভালবাসে না। এরপর আল্লাহ তাআলা কাফির-মুনাফিকদের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রতা পোষণ করার কথা তুলে ধরছেন। যদি মুসলিমদের কোন বিজয়, গনীমত ও সাহায্য আসে তা হলে তারা ব্যথিত হয়। পক্ষান্তরে মুসমিদের পরাজয় হলে অথবা জানমালের কোন ক্ষতি হলে তারা খুব খুশি হয়। তাই আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। কাফির-মুশরিকদের সাথে সম্পর্ক রাখাই আমাদের অধঃপতনের অন্যতম কারণ।
Join the Conversation
By - আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইমাম ও খতিব, বায়তুল ফালাহ্ জামে মসজিদ, শের-এ বাংলা রোড, খুলনা।