ইমানি আত্মমর্যাদাবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা

আজ ❝ধর্মনিরপেক্ষ❞ শিক্ষার প্রভাবে ইমানি আত্মমর্যাদাবোধ আমাদের থেকে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের মত বিলুপ্তপ্রায় অবস্থা। অথচ ইমানি আত্মমর্যাদাবোধ ইমানেরই গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা।
ইমাম বায়হাকি রাহি. তার শুআবুল ইমানে ইমানের যে সাতাত্তরটি শাখা সংকলন করেছেন, তার অন্যতম একটি হচ্ছে— الغيرة وترك المذاء — এর সাধারণ অর্থ হচ্ছে; আত্মমর্যাদাবোধ থাকা ও নির্জীব না হওয়া। দ্বীন, ইমান ও আকিদাহর ক্ষেত্রে আত্মমর্যাদাবোধ ইমানেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে কোন না কোন বিশ্বাস ও আদর্শ লালন করে; সেসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আত্মমর্যাদাবোধ থাকবে এটাই আদর্শ ও বিশ্বাসের স্বাভাবিক দাবি।

কথার খাতিরে যদি আপনি কোন ইমানদার ব্যক্তিকে বলেন; ❝মনে করো তুমি একজন কাফির❞। এই যে উদারহণ স্বরূপ কাফিরের দিকে তাকে সম্মন্ধ করলেন; এটি একজন মুমিন কখনই মেনে নিতে পারবে না। অথচ আপনি জানেন এবং সেও জানে এতে তার ইমানের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হচ্ছেনা। কিন্তু একজন মুমিন উদাহরণত নিজেকে কাফির ভাবতেও কষ্ট পায়। এই কষ্টের কোন প্রতিক নেই। বাহ্যত কোন ক্ষতিও নেই। তারপরও আত্মপরিচয়ের জায়গা থেকে আত্মমর্যাদাবোধ থাকা এটাই ইমানি গায়রত, যা ইমানের পরিচয়জ্ঞাপক।

এর আরেকটি দিক হচ্ছে; নির্বিকার না থাকা। ধরুন কেউ আপনার সামনেই আপনার স্ত্রীকে বললো; ❝ভাবি! আপনার ঠোঁটগুলো অনেক সুন্দর, ঠিক দেখতে জনৈক হলিউড নায়িকার ঠোঁটের মতো।❞ প্রশ্ন হচ্ছে, এ কথা শুনার পর আপনি কী করবেন? আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবেন যে, আল্লাহ আপনাকে হলিউডের নায়িকার ঠোঁটের মতো ঠোঁট সমৃদ্ধ একজন স্ত্রী দান করেছেন। সুতরাং বলবেন- আলহামদুলিল্লাহ!। আসলেই বিষয়টা কী ঠিক এরকম? নাকি আপনি ঐ ব্যক্তির উপর ক্ষোভ প্রকাশ করবেন ও ক্ষিপ্ত হবেন। নিশ্চিত ক্ষিপ্ত হবেন। আচ্ছা ঐ ব্যক্তির কথায় বাহ্যত আপনার কী ক্ষতি হয়েছে? কিছুই হয়নি। তারপরও এখানে ভিন্ন একটা চেতনা আপনার মাঝে কাজ করেছে। এই চেতনাই ইমানি গায়রত বা আত্মমর্যাদাবোধ। যার এই আত্মমর্যাদাবোধ নেই তার ইমানের একটি গরুত্বপূর্ণ শাখাই নেই।

ইমাম বুখারি রাহি. সহিহুল বুখারিতে ❝কিতাবুন নিকাহ❞ নামে একটি অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন; তার অধীনে ❝বাবুল গায়রাহ❞ নামে একটা পরিচ্ছেদ এনেছেন। সেখানে একটা হাদিস এনেছেন যে,

একবার সাআদ বিন উবাদা রাদি. সাহাবিদের বললেন; আমি যদি কাউকে আমার স্ত্রীর সাথে দেখি; আমার ইচ্ছে হয় তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দেই। সাহাবিগণ তার এই আত্মমর্যাদাবোধ দেখে অবাক হলেন এবং এ খবর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছালেন। কিন্তু দেখা গেলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের অবাক হওয়ার উপর অবাক হলেন; প্রশ্ন করলেন,

أتعجبون من غيرة سعد لأنا أغير منه والله أغير مني

তোমরা সাআদের আত্মমর্যাদাবোধ দেখে অবাক হচ্ছো? আমিতো তার চেয়েও বেশি আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। আর আল্লাহ! তিনি আমার চেয়েও আরো অধীক আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন।

কুরআন, হাদিস ও ফিকহ খুঁজলে কোথায়ও এই বিধান পাওয়া যাবে না যে, কেউ তার স্ত্রীর সাথে অন্য পুরুষকে দেখলে সে যেন তাকে হত্যা করে ফেলে। এবং সাআদ রাূি. যদি সত্যিই কোন গভীর অপরাধের স্বাক্ষপ্রমাণ ও শারয়ি বিচারিক সিদ্ধান্তের বাইরে এমনটি করে ফেলেন; তাহলে রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদালতে তারও বিচার হবে। তারপরও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাআদ রাদি. এই আত্মমর্যাদাবোধকে শুধু প্রশ্রয় দিয়েছেন তাই নয়; বলেছেন আমি এর চেয়েও অধীক আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। এটা ইমানদারের আত্মমর্যাদা। ইমানের একটা স্বাভাবিক চাহিদা।

কিন্তু প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা, জাহিল লোকদের সাথে অধীক মেলামেশা, শারিআতের ছোট-বড় যেকোনো বিষয় নিয়ে নিয়মিত ঠাট্টা মশকরা করা হয় এমন স্থানে যাতায়াত, শারিআতের ছোট-বড় যেকোনো বিষয় নিয়ে নিয়মিত ঠাট্টা মশকরে- এজাতীয় লোকদের সাথে অধীক সম্পর্ক এবং আধুনিক জাহিলিয়্যাতের মানদন্ডে উত্তীর্ণ চলমান রাজনীতি ও চলমান যুক্তিতর্কগুলো মুমিনের ইমানের আত্মমর্যাদাবোধ ধ্বংস করে দিচ্ছে। কোন একটা কাজ কুরআন, হাদিস ও ফিকহে বৈধ না অবৈধ, বা জাইয না না-জাইয এই প্রসঙ্গকে খুবই হালকা করে দেখাচ্ছে। চাই তা হারাম হোক অথবা সাধারণ কোন মাকরুহ-ই হোক।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা এজাতীয় পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِى الْكِتٰبِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ ءَايٰتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتّٰى يَخُوضُوا فِى حَدِيثٍ غَيْرِهِۦٓ ۚ إِنَّكُمْ إِذًا مِّثْلُهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنٰفِقِينَ وَالْكٰفِرِينَ فِى جَهَنَّمَ جَمِيعًا

কিতাবে তোমাদের প্রতি তিনি তো নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে, আল্লাহর আয়াত প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে এবং তা নিয়ে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন যে পর্যন্ত তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত না হবে তোমরা তাদের সাথে বসো না , নয়তো তোমরাও তাদের মত হবে। মুনাফিক এবং কাফের সবাইকে আল্লাহ তো জাহান্নামে একত্র করবেন। —সুরাহ আন- নিসা, আয়াত ১৪০

এ আয়াতের মর্ম এই যে, যদি কোন প্রভাবে কতিপয় লোক একত্রিত হয়ে আল্লাহ তাআলার কোন আয়াত বা হুকুমকে অস্বীকার বা ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে থাকে, তবে যতক্ষণ তারা এহেন গৰ্হিত ও অবাঞ্ছিত কাজে লিপ্ত থাকবে, ততক্ষণ তাদের মজলিশে বসা বা যোগদান করা মুসলিমদের জন্য হারাম। বাতিলপন্থীদের মজলিশে উপস্থিত ও তার হুকুম কয়েক প্রকার। যথা :

বিজ্ঞাপন এর জন্য কোন প্রকার বিনিময়মুল্য গ্রহন করা হয় না

  • ১. তাদের কুফরি চিন্তাধারার প্রতি সম্মতি ও সন্তুষ্টি সহকারে যোগদান করা। এটা মারাত্মক অপরাধ ও কুফরী।
  • ২. গৰ্হিত আলোচনা চলাকালে বিনা প্রয়োজনে অপছন্দ সহকারে উপবেশন করা। এটা অত্যন্ত অন্যায় ও ফাসেকী।
  • ৩. পার্থিব প্রয়োজনবশতঃ বিরক্তি সহকারে বসা জাইয।
  • ৪. জোর-জবরদস্তির কারণে বাধ্য হয়ে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে বসা ক্ষমার যোগ্য।
  • ৫. তাদের সৎপথে আনয়নের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হওয়া সওয়াবের কাজ।

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, এমন মজলিশ যেখানে আল্লাহ তাআলার আয়াত ও আহকামকে অস্বীকার, বিদ্রুপ বা বিকৃত করা হয়, সেখানে হৃষ্টচিত্তে উপবেশন করলে তোমরাও তাদের সমতুল্য ও তাদের গোনাহর অংশীদার হবে। অর্থাৎ আল্লাহ না করুন, তোমরা যদি তাদের কুফরি কথা-বার্তা মনে প্রাণে পছন্দ কর, তাহলে বস্তুতঃ তোমরাও কাফির হয়ে যাবে। কেননা, কুফরি পছন্দ করাও কুফরি। আর যদি তাদের কথা-বার্তা পছন্দ না করা সত্ত্বেও বিনা প্রয়োজনে তাদের সাথে উঠাবসা কর এমতাবস্থায় তাদের সমতুল্য হবার অর্থ হবে তারা যেভাবে শারিআতকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি সাধন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে, তোমরা তাদের আসরে যোগদান করে সহযোগিতা করায় তাদের মতই ইসলামের ক্ষতি সাধন করছ।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِىٓ ءَايٰتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتّٰى يَخُوضُوا فِى حَدِيثٍ غَيْرِهِۦ ۚ وَإِمَّا يُنسِيَنَّكَ الشَّيْطٰنُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرٰى مَعَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِينَ

আর আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, যারা আমার আয়াতসমূহ সম্বদ্ধে উপহাসমূলক আলোচনায় মগ্ন হয় , তখন আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন, যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসংগ শুরু করে। আর শয়তান যদি আপনাকে ভুলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়ার পর যালিম সম্প্রদায়ের সাথে বসবেন না। —সুরাহ আল-আনআম, আয়াত ৬৫

আয়াতটিতে বলা হয়েছে, আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, যারা আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলীতে শুধু ক্রীড়া-কৌতুক ও ঠাট্টা-বিদ্রুপের জন্য করে এবং ছিদ্রান্বেষণ করে, তখন আপনি তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন। এ আয়াতে প্রত্যেক সম্বোধনযোগ্য ব্যক্তিকে সম্বোধন করা হয়েছে। এতে মুসলিমদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, যে কাজ নিজে করা গোনাহ, সেই কাজ যারা করে, তাদের মজলিসে যোগদান করাও গোনাহ। এ থেকে বেঁচে থাকা উচিত।

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, যদি শয়তান আপনাকে বিস্মৃত করিয়ে দেয় অর্থাৎ ভুলক্রমে তাদের মজলিশে যোগদান করে ফেলেন-নিষেধাজ্ঞা স্মরণ না থাকার কারণে হোক কিংবা তারা যে স্বীয় মজলিশে আল্লাহর আয়াত ও রাসূলের বিপক্ষে আলোচনা করে, তা আপনার স্মরণ ছিল না, তাই যোগদান করেছেন। উভয় অবস্থাতেই যখন স্মরণ হয় তখনই মজলিশ ত্যাগ করা উচিত। স্মরণ হওয়ার পর সেখানে বসে থাকা গোনাহ। আয়াতের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, গোনাহের মজলিশ ও মজলিশের লোকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এর উত্তম পন্থা হচ্ছে মজলিশ ত্যাগ করে চলে যাওয়া। কিন্তু মজলিশ ত্যাগ করার মধ্যে যদি জান, মাল কিংবা ইজ্জতের ক্ষতির আশংকা থাকে, তবে সর্বসাধারণের পক্ষে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার অন্য পস্থা অবলম্বন করাও জায়েয। উদাহরণতঃ অন্য কাজে ব্যাপৃত হওয়া এবং তাদের প্রতি ভ্রক্ষেপ না করা। কিন্তু বিশিষ্ট লোক, দ্বীনী ক্ষেত্রে যাদের অনুকরণ করা হয়-তাদের পক্ষে সর্বাবস্থায় সেখান থেকে উঠে যাওয়াই সমীচীন।

আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, যে মজলিশে আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল কিংবা শারিআতের বিপক্ষে কথাবার্তা হয় তা বন্ধ করা, করানো কর্তব্য। কমপক্ষে সত্য কথা প্রকাশ করা। তবে যদি সেই সাধ্য না থাকে, তবে এরূপ প্রত্যেকটি মজলিশ বর্জন করা মুসলিমদের কর্তব্য। আর আগেই বলা হয়েছে, সংশোধনের নিয়তে এরূপ মজলিশে যোগদান করলে এবং হক কথা প্রকাশ করলে তাতে কোন দোষ নেই। আয়াতের শেষে বলা হয়েছেঃ স্মরণ হওয়ার পর অত্যাচারী সম্পপ্রদায়ের সাথে উপবেশন করো না। এ থেকে বুঝা যায় যে, এরূপ অত্যাচারী, অধাৰ্মিক ও উদ্ধত লোকদের মজলিশে যোগদান করা সর্বাবস্থায় গোনাহ; তারা তখন কোন অবৈধ আলোচনায় লিপ্ত হোক বা না হোক। কারণ, বাজে আলোচনা শুরু করতে তাদের বেশী দেরী লাগে না। কেননা, আয়াতে সর্বাবস্থায় যালিমদের সাথে বসতে নিষেধ করা হয়েছে। তারা তখনো যুলুমে ব্যাপৃত থাকবে এরূপ কোন শর্ত আয়াতে নেই।

কুরআনুল কারিমের অন্য এক আয়াতেও এ বিষয়টি পরিস্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে,

وَلَا تَرْكَنُوٓا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَآءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ

আর যারা যুলুম করেছে তোমরা তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না ; পড়লে আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে। এ অবস্থায় আল্লাহ্‌ ছাড়া তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না। তারপর তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। —সরাহ হুদ, আয়াত ১১৩

মূলত এ আয়াতে মানুষকে ক্ষতি ও ধ্বংস থেকে রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলা হচ্ছে, ঐসব পাপিষ্ঠদের দিকে একটুও ঝুঁকবে না, তাহলে কিন্তু তাদের সাথে সাথে তোমাদেরকেও জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে।

এখানে তাদের প্রতি সামান্যতম ঝোঁকা বা আকৃষ্ট হওয়া এবং তাদের প্রতি আস্থা বা সম্মতি জ্ঞাপন করাও নিষেধ করা হয়েছে। এই ঝোঁকা ও আকর্ষণের কয়েকটি অর্থ হতে পারে :

  • → যালেমদের চাটুকার হবে না ও তাদের শিরকি কর্মকাণ্ডের পক্ষপাতিত্ব করবে না।
  • → তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে না, তাদের কথামত চলবে না।
  • → তাদের প্রতি আদৌ আকৃষ্ট হবে না।
  • → তাদের কার্যকলাপ ও কথাবার্তা পছন্দ করো না।
  • → তাদের চাটুকারিতা করবে না ও তাদের আনুগত্য করবে না।
  • → তাদের কুফরি কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করা পরিত্যাগ করবে না।
  • → তাদের পক্ষ নিবে না। তাদের সাহায্য নিবে না।
  • → বাহ্যিক আকৃতি-প্রকৃতিতে, লেবাস-পোশাকে, চাল-চলনে তাদের অনুকরণ করবে না।

মোটকথা আয়াতগুলিতে একটি সামগ্রিক মূলনীতি তুলে ধরা হয়েছে। যে সব জায়গা, অবস্থান, ও শিক্ষাব্যবস্থা আল্লাহর এই দ্বীনের সাথে চিন্তা ও আমলের দিক থেকে উপহাস করে; শিরকের প্রতি উৎসাহ যোগায়, তা থেকে দূরে থাকতে মুমিনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ এই ধরণের পরিবেশ মানুষের চিন্তা ও কর্মের যে বিবর্তন তৈরি করে দেয় তা সে ঘুনোক্ষরেও টের পায়না। ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, ❝কোন মানুষের জন্য এই বেহাল অবস্থা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।❞
কারণ, এজাতীয় পরিবেশের প্রভাবে ব্যক্তি তার স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সাথে ছেড়ে দিচ্ছে, নিজের মেয়েকে, বোনকে একা ছেড়ে দিচ্ছে- এটা তার আত্মমর্যাদায় সামান্যও নাড়া দিচ্ছে না।

আমাদের এমন অনেক পরিচিত ভাই আছেন; ইউনিভার্সিটি লেভেলে যাদের এমন অনেক বন্ধু আছে যারা ইসলামের শিআর (প্রতীক) নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অহেতুক বিতর্ক করে এবং ইসলামের ওমুক ওমুক বিধান মানবিক নয় দাবি করে তা প্রমাণের চেষ্টা করে। কিন্তু তা তাদের ইমানি আত্মমর্যাদায় লাগে না। না তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের কাছে সঠিক আদর্শ তুলে ধরার প্রয়াস পান, আর না তারা তাদের থেকে নিজেদের আলাদা করে নেন। যদিও তারা ঐসব পরিবেশে পড়ে থাকার কারণ হিসেবে সুযোগ পেলে ইসলামকে তুলে ধরবেন এমন একটা প্রতিজ্ঞার কথা হর হামেশাই প্রকাশ করতে পছন্দ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে একটা পর্যায়ে তাদের নিজিদের মাঝেই ইসলামের বিধি বিধান নিয়ে এক ধরণের হীনমন্যতা তৈরী হয়। যে হীনমন্যতাকে তারাই আবার আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার নামে সংজ্ঞায়ন করেন।

এমনও অনেককে দেখেছি যারা নিজেদের এই আত্মমর্যাদাহীনতাকে উল্টো জাস্টিফাই করেন।
তারা বলেন; ইসলাম কী এতই ঠুনকো?
কিছু একটা বললেই কী প্রতিবাদ করতে হবে?
রাসুলকে গালি দিয়েছে তো কী হয়েছে?
এতে কী রাসুলের মান সম্মান কমে গেছে?
রাসুলের রিসালাত কী ফুটো হয়ে গেছে?

তারা এর প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতে না পারুক, কুরআনুল কারিমের নির্দেশ অনুসারে অন্তত সে সব ব্যাক্তি, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থা অন্ততঃ বর্জন করতে পারতো, যেখানে এই দ্বীনে হানিফের কোন বিধান নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হয়।

❝ইমানী আত্মমর্যাদাবোধ❞ এটা প্রচলিত অর্থে ফিকহি বা ধারণাগত কোন বিষয় নয়। এটি সরাসরি মানসুস আলাইহি বিষয়। হাদিসের কিতাবে এই শিরোনামেই অধ্যায় আছে। কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে;

وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ

আর যারা ইমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালবাসায় দৃঢ়তর। সুরাহ আল-বাকারাহ, আয়াত ১৬৫

❝আশাদ্দি❞ শব্দটার মাঝে কঠোর পর্যায়ের ভালোবাসার কথা আছে। আর ভালোবাসায় দৃঢ়তর এর নানা দিক আছে। এর মধ্যে এটাও একটা বিষয় যে, বান্দা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘণ করবে না। যদিও তা খুবই হালকা বিষয়ই হয়।

আজকাল মানুষ দ্বীনকে এভাবে খেয়াল করেনা। প্রত্যেকটি বিষয়ে সরাসরি আদেশ-নিষেধসূচক নুসুস কামনা করে। মানুষ প্রশ্ন করে- কুরআনে কোথায় বলা আছে সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যাবে না। কোথায় বলা আছে প্রচলিত ক্রিকেট, ফুটবল হারাম, বয়ফ্রেন্ড গার্ল ফ্রেন্ড রাখা যাবে না?

মানুষ মনে করে সরাসরি ঘোষিত হারামের বাইরে শারিআতে আর কোন বিধান নেই। দ্বীনের বড়বড় বিধানকে তুচ্ছজ্ঞান করার জন্য এটা হচ্ছে প্রাথমিক স্তর। আমি বলছিনা শারিচতের যে কোন সাধারণ নিষিদ্ধ বিষয়কেও হারাম ফাতওয়া দিতে হবে। বরং আমি বলছি বিষয়টি ইলমি মুবাহ পর্যায়ে রেখেও একজন মুমিনকে ইমানি আত্মমর্যাদাবোধের দাবী পুরণ করতে হবে। এটিই বান্দার জন্য আল্লাহর সাথে সম্পর্কের দাবি।

কোন মানুষ ফিতনায় আক্রান্ত হলে, সবার আগে তার ইমানি আত্মমর্যাদাবোধ নষ্ট হয়ে যায়। আত্মমর্যাদাবোধ হচ্ছে বার্তা সিগনালের মতো। শুরুতেই মস্তিস্কে বার্তা দেয়। আত্মমর্যাদাবোধ নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ কোথাও কোন সমস্যা দেখেনা। তখন মানুষের কাছে ক্রিকেট, সিনেমা, লাইফ স্টাইল, দামি দামি খাবার ও দামি দামি ব্র্যান্ডের পোষাক, বঙ্কিম, রবিন্দ্রনাথ ও শেক্সপিয়র ছাড়া বাকি সব আলাপচারিতা নিরামিষেরর মত লাগে। এজাতীয় লোক সিনেমা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। কিন্তু কুরআন পড়তে দিলে বেশীদূর যেতে পারে না। আবার ইসলামের প্রশ্নে বড়বড় তাত্ত্বিক জ্ঞান দেয়। কিন্তু, সালাত, সিয়াম পবিত্রতার কথা বললে হা করে তাকিয়ে থাকে। যেন জিনে ধরেছে।

এজন্য অনেকটা দায়ী নৈতিকতা বিহীন প্রচলিত সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা। যার আগাগোড়াই ইমান বিধ্বংসি। যদি প্রশ্ন হয়, কীভাবে? বলব, সেটা বুঝতেও ইমানি আত্মমর্যাদাবোধ থাকা লাগবে। সিস্টেমের ভেতর ঢুকে সিস্টেম বদলাতে গিয়ে এতোদিনে যার ইমান ও কুফরের ব্যবধানের জায়গাটা ঝাপসা হয়ে গেছে, তিনি অল্পকথায় এটা বুঝার কথা না। তার কাছে শিক্ষার অহংবোধ আছে। কিন্তু ওহীর ইলম নাই। ওহীর ইলম শব্দগত জ্ঞানকে বলে না। ভাবাদর্শগত জীবন ধারণাকে বলে। সে তা থেকে বঞ্চিত। ফলে সে একই সাথে শিক্ষিত, অংহকারী, আবার দ্বীন বুঝার প্রশ্নে দীনতায় জরাগ্রস্ত। সে বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তিবাদী, কিন্তু একজন মানুষ কেন সার্বক্ষনিক আল্লাহর নিঃশর্ত আনুগত্য করতে বাধ্য এই যুক্তি বুঝতে অক্ষম, বধির।

কাজেই আমাদের মেয়েরা প্রচলিত ফ্রি মিস্কিং ❝ধর্মনিরপেক্ষ❞ শিক্ষায় ক্লাস ফোর, ফাইভের উপরে পড়বে কী না এটা এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে মেয়ে হোক বা ছেলে, যদি মুমিন হয়, তবে সে অসচেতনভাবে এমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেবে কী না, যা তাকে গলাটিপে তার সৃষ্টির লক্ষ-উদ্দেশ্য ভুলিয়ে কেবল ভোগবাদী ব্যবস্থার একজন উৎপাদক হিসেবে তৈরি করে। প্রমোট করে এমন জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যেখানে উপকরণ সংগ্রহ ও জীবনকে সুখি করাকে মানব জীবনের উন্নতি ও অধিপতির মাপকাঠি ধরা হয়। যে শিক্ষা ব্যবস্থা সমস্ত মানবীয় মূল্যবোধ ধ্বংস করে এক নতুন ধারার আদর্শ তুলে ধরে, যেখানে নৈতিকতার কোন স্থির মানদণ্ড নেই, নেই জীবনের উদ্দেশ্যের সঠিক দিক দর্শন, এমনকি বেসিক্যালি আল্লাহর তাওহিদের শিক্ষাটাও নেই, সেই শিক্ষা ও তার ব্যবস্থাপনার কোলে একজন মুমিন নিজেকে সঁপে দিবে কী না? দিলে কিভাবে, কতটুকু তার বোঝাপড়া দরকার।

একই সাথে ❝ধর্মনিরপেক্ষ❞ শিক্ষায় উচ্চমাত্রার শিক্ষিত হয়েও তথাপি ন্যুনতম মুসলিম হিসেবে পরিচিত থাকার যে ধারাটি এখনো চোখে পড়ছে তার পেছনে অবদান কার সেটাও খেয়াল করা দরকার। বিগত দুশো বছর ধরে এই অঞ্চলের আলিমরা ঐ দু:সাহসিক জীবন যাত্রার ঝুঁকি না নিলে- যেখানে মাত্র তিন-চার হাজার টাকায়, পাঁচ-ছয় জনের একটি সংসারের মাস চলে যেতে পারে- পুরো ব্যবস্থাটাই তছনছ হয়ে যেতো। আলিমরা নানা ভাবে মুসলিম জনসমষ্টিগত পরিবেশ এবং ইসলামের কাছে দায়বদ্ধ এমন পারিবারিক সিস্টেম টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা না চালালে এই ❝ধর্মনিরপেক্ষ❞ শিক্ষা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতো তা ভাবলেও শিউরে উঠি। খুব বেশি দিন না, মাত্র পাঁচ বছর এ দেশের মাদরাসা মসজিদ ও দ্বীনি দাওয়াতি কর্মসূচিগুলো বন্ধ করে দিয়ে আলিমরা পুঁজিবাদী কারখানামুখি হলে মুসলিম ঘরগুলো থেকে কী মানের প্রজন্ম তৈরী হতে পারে বিগত বছরগুলোতে আমরা কিছুটা হলেও তা আছঁ করতে পেরেছি। যুগ সচেতনদের তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

কাজেই প্রচলিত শিক্ষা ও নারী শিক্ষা নিয়ে কেউ কথা বললে, ❝ধর্মনিরপেক্ষ❞ ধর্মের সুরে হই হই আওয়াজ তোলার আগে নিজের ইমানি আত্মমর্যাদাবোধের জায়গা থেকে একটু চিন্তা করা প্রয়োজন। আজ সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে যে নাস্তিকতার বুনন হচ্ছে তার উৎস কোথায় সে দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া সময়ে দাবি। ইমানি আত্মমর্যাদাবোধ যদি না থাকে তবে তা কীভাবে অর্জন করতে হয় সেই দিক্ষা নিন। টুপি, পান্জাবি পরে, আলিম ওলামার বেশ ধরে নাস্তিক্যবাদের সহযোগি হয়ে ওঠার আগে একটু চিন্তা করুন আল্লাহর কাছে কী জবাব দেবেন। আল্লাহ সকলের সহায় হোন।

Join the Conversation
By - আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইমাম ও খতিব, বায়তুল ফালাহ্ জামে মসজিদ, শের-এ বাংলা রোড, খুলনা।