এই বিষয়গুলো এভাবে অনলাইনে লিখতে হবে, আশা করি নি। গতরাতের পূর্বে কখনো ভাবিও নি। স্বতঃসিদ্ধ সুষ্পষ্ট বিষয়। শিক্ষিতজনমাত্রই উপলব্ধির কথা। কিন্তু তা হয় নি।

ধরুন ঢাকা ভার্সিটি থেকে শতজন ছাত্র স্নাতক করল কিংবা স্নাতকোত্তর। আমরা কখনো ভাবি? যেহেতু ঢাবিতে পড়েছে, নিশ্চয় তার মাঝে একধারে অর্থনীতি, ভূগোল, রসায়ন, পদার্থ, মেডিসিন, কলা, ব্যবসা সব বিষয়ে পান্ডিত্য থাকবে, থাকতে হবে। নিশ্চয় ভাবি না, ভাবার মত বোকামিও করি না। বুয়েট ফারেগ হলেই ভাবি না তিনি একইসাথে সফটওয়ারের নির্মাতা হবেন এবং স্থাপনা নির্মাতা। মেডিকেল ফারেগ হলেও ভাবি না তিনি আমার নাক কান থেকে নিয়ে হার্ট , চোখ, দাত সব বিষয়ের স্পেশালিস্ট।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, মাদ্রাসা পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে আমরা উপরের সব ধরণের আশা ও ধারণা পোষণ করে থাকি। এদিকে আমরা মাদ্রাসাওয়ালারাও মা শা আল্লাহ, কাউকে নিরাশ করি না। ফিকহ ফতোয়ায় আমার পারদর্শিতা কিংবা সম্পৃক্ততা না থাকুক, কিন্তু ওয়াজে, মাঠে বা ময়দানে , ফেসবুকে কিংবা লেখালেখিতে ফতোয়া প্রদান থেকে বিরত রাখবে এই সাধ্য কার? এদিকে জনগনের কল্পনায় আমাদের আলপনা বেশ অদ্ভুত । জামিয়া রাহমানিয়া, হাটহাজারী কিংবা ফরিদাবাদ থেকে ফারেগ মানেই তিনি ইলমে দ্বীনের ‘ডাক্তার, অর্থনীতিবিদ, পদার্থবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী’ সব। অথচ আপনাদের শাস্ত্রের যেমন ভিন্নতা ও বিভিন্নতা আছে, তেমনি মাদ্রাসাতেও আছে। আমাদের এখানেও, ফিকহ, হাদিস, তাফসির, আদব, তারিখ ইত্যাদি ডিপার্টমেন্ট আছে। তেমনি এর প্রতিটার মধ্যে আরো নানা শাখা প্রশাখাও আছে। যেমন ধরুন, ফিকহ এর মধ্যে, উসূলে ফিকহ, উসূলে ইফতা, কাওয়ায়েদে ফিকহ ইত্যাদি। সবগুলোতে সবার সমান পড়াশোনা কিংবা পারদর্শিতা তৈরি হয় না। সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের মত এখানেও নানা অনুষদ, শাখা ও প্রশাখা রয়েছে।

এই বাস্তবতাটা আমাদের জনসাধারণ বুঝতে চান না। সুতরাং একজন মুফতী, যিনি ইফতায় কেবল পারদর্শীই নন, বরং পড়াশোনার পর এর সাথে সম্পৃতক্তাও রাখেন। তার মতের বিরুদ্ধে এমন একজনের মত এনে সমালোচনা করা হয়, যার আদৌ কোনদিন ইফতায় পড়ার তাওফীক হয় নি। হয়ত তিনি অসাধারণ বাগ্মী, প্রভাষক, হাজারো হাদিসের হাফিয কিংবা শত শত রেফারেন্স তার মুখস্ত। আল্লাহ তায়ালার দেয়া এসব যোগ্যতা মানেই কি এই যে তিনি ইলমের সকল শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছেন? নিশ্চয় নয়। আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি, মদীনা কিংবা আযহারের ফারেগ, পড়াশোনার সাবজেক্ট ছিল আরবি সাহিত্য বা ক্বেরাত । তিনিও অবলীলায় ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর জনমানুষ সেসব ফতোয়া এনে শাস্ত্রবেত্তাদের মতের বিপরীতে দাড় করাচ্ছে, এমনকি শাস্ত্রীয় আলিমদেরকে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করছে।

একইভাবে মুফতীদের কাছে সরকারি ও প্রশাসনিক নির্দেশনা আশা করাও অদ্ভুত ব্যাপার। মুফতীদের ফতোয়া লিখতে হয় অত্যন্ত মাপা শব্দে, সতর্কতার সাথে। তাঁরা বড়জোর পরামর্শ দিতে পারেন। নির্দেশনা জারী করা মুফতীর এখতিয়ারবহির্ভূত। এটা করবে কাযী বা প্রশাসন। এজন্যে উসূলে ইফতার গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হলো ক্বাযা ও ইফতার মধ্যে তফাৎ কী কী? ফলে প্রশাসকের ভাষা ও মুফতীর ভাষা ও শব্দ প্রয়োগে সেই তফাৎ থাকা আবশ্যক যেটা তার দায়িত্ব ও ইখতেয়ারের সীমার মধ্যে থাকে।

মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব একবার ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে বয়ান করেছিলেন। অধম সেখানে ছিলাম। তিনি বয়ানের শুরুতেই বলেন, আপনাদের অর্থাৎ ডাক্তারদের সাথে আমাদের বিশেষ কিছু মিল আছে। অন্যতম মিলটি হলো, আপনারাও যেমন এমবিবিএস পাশ করলেই সব বিষয়ের স্পেশালিস্ট হন না, তেমনি আমরাও মাওলানা পাশ করলেই সব বিষয়ের পারদর্শী হই না। আমাদের এজগতেও সেসব বিভাজন ও শ্রেণিবিন্যাস আছে যেগুলো আপনাদের আছে। হযরতের ঐকথা বলার উদ্দেশ্য সম্ভবত এটা ছিল, তাবলীগী অনেক ভাই, ফিকহ ফতয়ায় পারদর্শিতা না থাকা সত্ত্বেও, সাল লাগানো একজন আলেমের কথাকে শাস্ত্রবেত্তা মুফতীদের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।

আমাদের মধ্যে আরেক ধরণের ভুল প্রচলিত আছে, আমরা কোন ওয়াজ, নসীহত কিংবা ইতিহাসগ্রন্থে কোন কথা পেলে সেটাকে ফিকহী কিতাবের দেয়া মাসায়েল কিংবা ফতোয়ার উপর প্রাধান্য দিয়ে বসি। অথচ উভয়ের তারতম্যের কথা উসূলের কিতাবে একটি স্বীকৃত নীতি। ফতোয়ার কিতাব নয়, এমন গ্রন্থগুলোকে উসূলের কিতাবে সুস্পষ্টভাবে দুর্বল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে৷

শেষের যে কথাটি বলতে হয়, ডাক্তারদের দেয়া পরামর্শ সব ডাক্তার ব্যখ্যা করেন না। কিংবা করলে যতটুকু সাধারণ মানুষ বুঝতে সক্ষম ততটুকু করেন। সম্ভবত সব শাস্ত্রেই এই কথাটি প্রযোজ্য। সবার সব কিছু বোঝার কথাও না। এর প্রয়োজনও নেই। সাধারণ মানুষের উপর শরীয়ত কেবল আমল ও অনুসরণের দায়িত্ব অবধারিত করেছে, পান্ডিত্য অর্জন সবার জন্যে জরুরী নয়। সুতরাং মুফতীদের দেয়া সাদামাটা কথার তাৎপর্য ও গভীরতা সবাই বুঝবে এটা আশা করা অবান্তর ও অবাস্তব। অপরদিকে মুফতীগণও বাধ্য নন, জনগণকে তাদের দেয়া পরামর্শ ব্যখ্যা করতে কিংবা জনগনের বুঝ মোতাবেক ফতোয়ায় তাদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে। এই নীতিটাও উসূলের কিতাব সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সুতরাং যার শাস্ত্র তাকে সে বিষয়ে কাজ করতে দেই। নিজে না বুঝলে সেটাকে নিজের অযোগ্যতা, অপরিপক্কতা হিসেবে চিহ্নিত করি। এটা তো হুসনে যন ও নেক ধারনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমলও বটে। রাব্বে কারীম আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দিন। বর্তমান ভাইরাস ও ভাইরাসকে কেন্দ্র করে যে কোন বিবাদ বিসংবাদ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন৷ আমীন!

 

Join the Conversation