ক্যালিগ্রাফি করা বা ওয়ালমেট বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখা কেমন?

মূলপাতা > ক্যালিগ্রাফি করা বা ওয়ালমেট বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখা কেমন?

আমাদের মাঝে কোরআনের আয়াত -হাদিস দ্বারা ক্যালিগ্রাফি করতে দেখা যায়। কেউ কেউ ক্যালিগ্রাফি না করে সাধারণভাবে লিখিত কোরআনের আয়াত ও হাদিস দ্বারা নকশা পাথর বা কাঠের উপরে করে থাকে। এখন প্রশ্ন হল , সালাফ ও সমকালীন আলেমগণ এমন করার ব্যাপারে কি ফাতাওয়া দিয়েছেন, তা খেয়াল করে দেখা।

দুটি দিক নিয়ে আলোচনা হবে

  • সাধারণভাবে লিখিত কোরআনের আয়াত-হাদিস কাঠ বা পাথরের উপর লিখে দেয়ালে টানানো কেমন?
  • ক্যালিগ্রাফি করে আয়াত বা হাদিস লেখা কেমন?

প্রথম মাসালাঃ

সাধারণভাবে আয়াত বা হাদিস লিখে দেয়ালে বা অন্য কোথাও ঝুলানো অথবা মোবাইল ইত্যাদিতে ব্যাবহার করা মাকরূহ কাজ। কেননা, কোরআন নাযিল হয়েছে মানুষের হেদায়েতের উদ্দেশ্যে। সুতরাং যেসব কাজে হেদায়েত লাভ হয় তা ব্যাতীত সাধারণ সৌন্দর্যবর্ধন বা ব্যক্তির কাজে কোরআন বা হাদিসের বাণী ব্যাবহার করা মাকরূহ। বরং তাকে যে স্থানে ব্যাবহার করলে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয় , সে স্থানেই তাকে রাখা উচিত।

আল্লামা কুরতুবী (রাহি) বলেন,

عن محمد بن الزبير قال: سمعتُ عمر بن عبد العزيز يُحدِّث قال: “مرَّ رسولُ الله صلى الله عليه وسلم بكتاب في أرض فقال لشاب من هذيل: «ما هذا»، قال: من كتاب الله كتبه يهودي، فقال: «لعنَ الله من فعل هذا، لا تضعوا كتاب الله إلاَّ موضعه» ()”. قال محمد بن الزبير: “رأى عمر بن عبد العزيز ابناً له يكتب القرآن على حائط فضربه
অর্থঃ মুহাম্মদ বিন যুবায়ের বলেন, আমি উমর বিন আব্দুল আজীজ (রাহি)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম জমিনে পড়ে থাকা একটা কিতাবের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন হুজাইল গোত্রের একটি ছেলেকে বললেন, এটা কি? তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাবের একটি অংশ যা ইয়াহুদীগণ লিখেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে এমনটি করেছে তার উপর লানত হোক। তোমারা আল্লাহর কিতাবকে তার স্থান ব্যাতীত রাখবে না। মুহাম্মদ বিন যুবায়ের বলেন, উমার বিন আব্দুল আজীজ (রাহি) তার এক সন্তানকে দেয়ালের উপর কোরআন লিখতে দেখনেল অতপর তাকে প্রহার করলেন।
[তাফসীরে কুরতুবীঃ ১/৩০, তাজাক্কারঃ১২০]

আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রাহি) লিখেছেন,

“وتُكره كتابة القرآن، وأسماء الله تعالى على الدرهم، والمحاريب، والجدران، وما يُفرش، والله تعالى أعلم”
অর্থঃ কোরআনের আয়াত এবং আল্লাহ্‌ নামাসমূহ দেরহাম, মেহরাব ,দেয়ালে ও আসবাব পত্রের উপর লেখা মাকরূহ।
[ফাতাওয়ে শামীঃ ১/১৭৯]

ইমাম নববি (রাহি) লেখেন,

مذهبنا أنه يُكره نقش الحيطان والثياب بالقرآن، وبأسماء الله تعالى”
অর্থঃ আমাদের মাজহাব হল, কোরআনের আয়াত বা আল্লাহ্‌ তায়ালার নাম দ্বারা দেয়াল বা কাপড়ের উপর নকশা করা মাকরূহ।
[তিবইয়ানঃ ৮৯ ও ৯৭]

তিনি আরো বলেন,

ويكره كتابته على الحيطان سواء المسجد وغيره
অর্থঃ মসজিদের দেয়াল হোক বা অন্য কোন দেয়াল কোরআনের আয়াত দ্বারা লেখা মাকরূহ।
[রওদতুত তালেবীনঃ ১/৮০]

আরো দেখুন: 
[ফাতহুল কদীরঃ ১/১৬৯,তাবয়ীনুল হাকায়েকঃ ১/৫৮, মাহমাউল আনহারঃ ১/১৯১, বাহরুল রায়েকঃ ২/৪০, মাজমু’ শরহে মুহাজ্জাবঃ ২/৭০, ইকনা: ২/১২৮ , কাশফুল কিনাঃ ৩/২৭২, শরহুল কাবীরঃ ১/৪২৫, মানহুল জালীলঃ ১/৫১৭-৫১৮, মাজমাউল ফাতাওয়াঃ ২৫/৬৬-৬৭।]

অনেকে হয়ত বলতে পারে, আমরা এটা সম্মানের সাথে রাখব এবং এর দ্বারা শিক্ষা হাসিল করব। যদি এটা সামনে থাকে , তবে বেশি বেশি আখিরাতে কথা বা আমলের কথা মনে হবে। তাহলে এতে সমস্যা কি?

শায়েখ উসাইমিন(রাহি)-এর উত্তরে বলেন,

يقول بعض الناس: يكون تذكيراً للناس . فنقول: التذكير يكون بالقول، لا بكتابة الآيات .
ثم إنه أحياناً يكتب على الجدار: (وَلا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضاً) الحجرات/ 12، وتجد الذين تحت الآية هذه يغتابون الناس، فيكون كالمستهزئ بآيات الله
অর্থঃ কিছু মানুষ বলে,(এভাবে আয়াত বা হাদিস লেখার দ্বারা) মানুষের নসীহা কারণ হয়ে থাকে। আমরা বলি, তাজকিয়াহ কথার মাধ্যমে হয়ে থাকে, লেখার দ্বারা নয়। কেননা, অনেক সময় দেয়ালে লেখা থাকে, “তোমরা একে অপরের গীবত করবে না।” হুজরাতঃ ১২ নং আয়াত। অথচ তুমি আয়াত লিখিত দেয়াল বা ফলকের নিচেই দেখবে মানুষ একে অপরের গীবত করছে। তখন এটা আল্লাহর আয়াতের সাথে ঠাট্টামি ছাড়া কিছুই না।
[লিকায়ু বাবিল মাফতুহঃ ১৩/১৯৭]
দ্বিতীয় মাসালাঃ
উপরে দেখলাম সাধারণভাবে কোরআনের আয়াত বা হাদিস দ্বারা লিখিত নকশা সালাফগন ও দীনের প্রজ্ঞাময় আলেমগণ পছন্দ করেনি । সেক্ষেতে আমাদের সামাজে ক্যালিগ্রাফি নামে কোরআন বা হাদিসের এমন অনেক নকশা করা হয় যা, সাধারণ অধিকাংশ মানুষের পক্ষে পড়া সম্ভব হয় না। এমনভাবে কোরআনে আয়াত ও হাদিসের নকশা করা যা পড়া যায় না, এটা কোরআন ও হাদিসের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী আমল। এর থেকে বেঁচে থাকা আমাদের একান্ত জরুরি।

শায়েখ মুহাম্মদ সালেহ মুনাজ্জীদ (ফাঃআ) বলেন,

أنّ في بعض هذه اللوحات عبث واضح كالكتابات الملتوية المعقّدة التي لا يُنتفع بها لأنّها لا تكاد تُقرأ
অর্থঃ এর কিছু কিছু ফলকের মধ্যে এমন নকশার অমূলক হবার দিকটি স্পষ্ট ফুটে ওঠে। যেমন, আয়াত এমন দুর্বোধ করে লেখা হয়ে থাকে যে তার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় না। কেননা, তার (এমনভাবে লেখা থাকে যে) কিছুমাত্র পড়াও যায় না।
[t.ly/dHbC]

নোটঃ
তবে মাসনুন দোয়াগুলো স্মরণ রাখা বা আমলের উদ্দেশ্যে দেয়ালে ,কাগজ , কাঠ বা অন্যকোন ফলকের উপরে লিখে রাখা জায়েজ আছে। কেননা, এর মাঝে ফায়েদা আছে ও তালিমের জন্য উপকারি হয়ে থাকে।
যেমন মজলিস শেষের দোয়া মজলিসে লিখে রাখা,
(سبحانك اللهم ربنا وبحمدك، أشهد أن لا إله إلا أنت، أستغفرك وأتوب إليه
[লিকাউ বাবিল মাফতুহঃ ১৩/১৯৭]