নারীদের অযথা বাহিরে বের হওয়ার বিষয়ে শরঈ বিধান কি?

মূলপাতা > নারীদের অযথা বাহিরে বের হওয়ার বিষয়ে শরঈ বিধান কি?

অযথা মেয়েদের ঘর থেকে বের হওয়া সমীচীন নয়। বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে নারীরা ঘরে বসে যিকির-আযকার, সাংসারিক কাজ ও অন্যান্য ইবাদাতে লিপ্ত থাকলে অনেক বেশি সাওয়াব পাবে। আর যখন কোন বিশেষ প্রয়োজনে বের হবে তখন অবশ্যই পুরুষ আকর্ষিত হয় এমন সাজসজ্জা করে বের হবেনা, বরং সাধারণ বোরক্বা বা পর্দা পড়ে বের হতে হবে। আর সর্বদা রাণীর মত স্ব-গৃহে অবস্থান করবে।

আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন-

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ ۖ وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ
‘এবং তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান কর, আর পূর্বেকার জাহিলী যুগের মত সাজসজ্জা করে বের হবেনা। সালাত ক্বায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য কর।’
[সূরা আহযাবঃ৩৩]

ইমাম ইবনু কাসীর রহঃ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তার তাফসীরে বলেন-

أي : الزمن بيوتكن فلا تخرجن لغير حاجة ومن الحوائج الشرعية…
অর্থাৎ, আপন ঘর সমূহকে নিজেদের জন্য আবশ্যক স্থান বানাও, এবং কোন শরীয়ত সম্মত প্রয়োজন ব্যতীত ঘর থেকে বের হয়োনা।
এবং এই আয়াতে ‘তাবাররুজ (সাজসজ্জা)’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- ঘ্রাণ ছড়ায় এমন সুগন্ধি মাখা,এবং মেয়েদের এমন সৌন্দর্য প্রকাশ করা যা বেগানা পুরুষকে আকৃষ্ট করে।
قال: التبختر. وقيل إن التبرج هو إظهار الزينة، وإبراز المرأة محاسنها للرجال
[তাফসীরে ত্ববারী ৪/২২; আহকামুল কুরআন, জাসসাস ৩/৩৫৯-৩৬০; আল জামে লি আহকামিল কুরআন, কুরত্ববী ১৪/১৮৯; – উল্লেখিত আয়াত দ্রষ্টব্য]
ইমাম আবু হাইয়্যান, ইমাম মুক্বাতিল, ইমাম আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী বলেন এবং হাফেজ ইবনু হাজার ইমাম ফাররা (রহিমাহুমুল্লাহ) থেকে ‘তাবাররুজ’ এর তাফসীরে বলেন –
মাথার খিমার ছেড়ে দিয়ে মুখ খুলে ও বেপর্দা হয়ে বের হওয়া।
[আল জামে লি আহকামিল কুরআন, কুরত্ববী ১৪/১৮৯; আল বাহরুল মুহীত্ব ৭/২৩০,২৫০;ফাতহুল বারী ৮/৩৪৮৭; ফাইযুল বারী ১/২৫৪]
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন-
﴿ وَاذْكُرْنَ مَا يُتْلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ وَالْحِكْمَةِ ﴾
এবং তোমরা নিজ গৃহে আল্লাহর যেসব আয়াত ও হিকমাহ (জ্ঞানগর্ভ বিষয়) পাঠ করা হয় তা স্মরণ রাখবে।
[সূরা আহযাবঃ৩৪]
এই আয়াতে মহিলাদের ঘরে বসেই তিলাওয়াত, যিকির, কুরআন ও হাদীস তালীম করার বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
আয়াতে কারীমায় ‘হিকমাহ’ দ্বারা আল্লাহর রাসূলের হাদীস ও সুন্নাহকে বুঝানো হয়েছে।
ويعني بالحكمة: ما أوحي إلى رسول الله صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّم من أحكام دين الله، ولم ينـزل به قرآن، وذلك السنة.
[তাফসীরে ত্ববারী, তাফসীরে কুরত্ববী – উল্লেখিত আয়াত দ্রষ্টব্য ]
আল্লাহ তা’আলা জান্নাত রমনী হুরদের ব্যাপারে বলেন-
﴿ حُورٌ مَقْصُورَاتٌ فِي الخِيَامِ ﴾
‘তাবুতে অবস্থান কারী হুরগন।’
[সূরা আর রহমানঃ৭২]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ত্ববারী তার তাফসীরে দ্বিহাক থেকে নিজ সনদে বর্ণনা করেন-
قوله: ( مَقْصُورَاتٌ ) قال: المحبوسات في الخيام لا يخرجن منها.
‘মাক্বসূরাত’ বলতে বুঝানো হয়েছে তাবুতে আবদ্ধ হূর যারা সেখান থেকে বের হয়না।
ইমাম ত্ববারী হাসান বসরী থেকে নিজ সনদে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-
قوله : ( مقصورات في الخيام ) قال : محبوسات ، ليس بطوافات في الطرق .
‘তারা তাবুতে আবদ্ধ। তারা রাস্তায় ঘোরাঘুরি করেনা।’
ইমাম কুরতুবীও তার তাফসীরে এর ব্যাখ্যায় লিখেন-
محبوسات مستورات في الخيام في الحجال لسن بالطوافات في الطرق
তারা তাবুতে আবদ্ধ ও আবৃত সিংহাসনে পায়ে পা তুলে (রাজরাণীর মত) আছে, রাস্তায় ঘোরাঘুরি করেনা।
[তাফসীরে ত্ববারী ২৩/৭৮,৭৯; তাফসীরে কুরত্ববী ১৭/১৭১ – উল্লেখিত আয়াত দ্রষ্টব্য ]
আমাদের নারীরাও আমাদের নিকট এমন রাজরাণী তুল্য। সুতরাং নারীদের উচিৎ অযথা বাহিরে বের না হওয়া।
কেননা আমাদের নেককার নারীরা আমাদের নিকট হুরদের তুলনায়ও বেশি মর্যাদাশীলা। সুতরাং তারা আচরনের ক্ষেত্রে হুরদের চেয়েও আরও এগিয়ে থাকার কথা।
আনাস রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূলের নিকট কিছু মহিলারা এসে বললঃ
হে আল্লাহর রাসূল! পুরুষরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে যেতে পারে, কিন্তু আমাদের জন্য এমন কোন আমল আছে যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদের নাগাল পাব!!?
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জবাবে বল্বন-
‘তোমাদের মাঝে যারা (এই সাওয়াবের আশায় পূর্ণ পর্দার সাথে) ঘরে বসে থাকবে তারা আল্লাহর রস্তায় মুজাহিদদের (সাওয়াবের) নাগাল পাবে!!
“عن أنس ، رضي الله عنه ، قال : جئن النساء إلى رسول الله صلى الله عليه وسلم فقلن : يا رسول الله ، ذهب الرجال بالفضل والجهاد في سبيل الله تعالى ، فما لنا عمل ندرك به عمل المجاهدين في سبيل الله ؟ فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ” من قعد – أو كلمة نحوها – منكن في بيتها فإنها تدرك عمل المجاهدين في سبيل الله
ইমাম বাযযার তার মুসনাদে এটি বর্ণনা করেন। তবে এই বর্ণনায় ‘রওহ ইবনুল মুসাইয়্যাব আল কালবী’ নামক রাবী বিতর্কিত।
[তাফসীরে ইবনু কাসীর ১১/১৫১; দুররুল মানসূর ১২/৩১-৩২- সূর আহযাবের ৩৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য ]
হাদীস শরীফে আছে-
عن ابن مسعود رضي الله عنه، عن النبي صلى الله عليه وسلم قال:”إن المرأة عورة، فإذا خرجت استشرفها الشيطان، وأقرب ما تكون من رحمة ربها وهي في قعر بيتها”
“নিশ্চয়ই মহিলারা হচ্ছে আওরাহ (ঢেকে থাকার বস্তু), যখনই সে ঘর থেকে বের হয় শয়ত্বান তাকে (পুরুষের চোখে) নন্দিত করে দেয়! ঐ নারী তার রবের রহমতের অতি নিকটবর্তী যেই নারী ঘরের কোন এক কোণায় অবস্থান করে (ও আল্লাহর স্মরণ করতে থাকে)।”
[সহীহুত তিরমিযীঃ১১৭৩;মু’জামে তাবরানীঃ২৯৭৪ আত তাওহীদ, ইবনু খুযাইমা ১/৪৯;সহীহ ইবনু হিব্বান ১২/৪১৩ হাঃ৫৫৯৭;আত তারগীব ওয়াত তারহীব ১/১৮০;মাজমাউয যাওয়ায়েদ ২/৩৮, ৪/৩১৭;হিদায়াতুর রুয়াত, ইবনু হাজার ৩/২৫২; আ’রিদ্বাতুল আহওয়াযী,
ইবনুল আরাবী ৩/৯২- হাদীসটির মান সহীহ]