একটা হাদীছ থেকে বলা ও প্রচার করা হয়ে থাকে যে, নারীদের বুদ্ধি কম ও তারা দ্বীনের ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ।
সেই হাদীছটা হলোঃ
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي أَضْحًى ـ أَوْ فِطْرٍ ـ إِلَى الْمُصَلَّى، فَمَرَّ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ ‏”‏ يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ، فَإِنِّي أُرِيتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ ‏”‏‏.‏ فَقُلْنَ وَبِمَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ، وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ، مَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ أَذْهَبَ لِلُبِّ الرَّجُلِ الْحَازِمِ مِنْ إِحْدَاكُنَّ ‏”‏‏.‏ قُلْنَ وَمَا نُقْصَانُ دِينِنَا وَعَقْلِنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ أَلَيْسَ شَهَادَةُ الْمَرْأَةِ مِثْلَ نِصْفِ شَهَادَةِ الرَّجُلِ ‏”‏‏.‏ قُلْنَ بَلَى‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَذَلِكَ مِنْ نُقْصَانِ عَقْلِهَا، أَلَيْسَ إِذَا حَاضَتْ لَمْ تُصَلِّ وَلَمْ تَصُمْ ‏”‏‏.‏ قُلْنَ بَلَى‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَذَلِكَ مِنْ نُقْصَانِ دِينِهَا
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্‌র রসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্‌র রসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি।
(এই হাদীছটির শব্দ বুখারীর ৩০৪ নং হাদীছের; একইরকম শব্দে ও শব্দের সামান্য তারতম্য সহকারে হাদীছটি অন্যান্য গ্রন্থেও আছে; মুসলিম ৭৯, তিরমিযী ২৬১৩, ইবনে মাজাহ ৪০০৩)
প্রথমত, মু’মিন মুসলিম হিসেবে আমাদের সামনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো কথা বা কাজ এলে আমাদের আচরণ হওয়া দরকার আত্মসমর্পণমূলক। ঈমানদার হিসেবে আমাদের প্রথম কর্তব্য হলো- হাদীছটাকে মেনে নেওয়া, যেহেতু আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করে নিয়েছি। তাই হাদীছ দেখলে প্রথমে তার ব্যাখ্যা না খুঁজে দরকার মেনে নেওয়ার। আর যদি কেউ তাকে রাসূল হিসেবে না মেনে থাকে (আস্তাগফিরুল্লাহ) তবে তার জন্যও উচিত প্রথমেই মন্তব্য না করে বসা। কারণ হাদীছ প্রকৃতিগতভাবেই বেশ জটিল বিষয়। কেননা হাদীছের ভাষা ও শব্দ পুরোপুরি জানতে হলেও বেশ খানিকটা সবর করতে হয়, আর হাদীছের সঠিক ও যথার্থ ফাহম-তাফহীম পেতে হলে আরও কাঠখড় পোড়ানোর দরকার পড়ে। তাই নিজের মনে জেঁকে বসা ধারণার বাহিরে কোনো বিষয় সামনে চলে আসলে আগ বেড়ে মন্তব্য না করাই নূন্যতম পরিপক্বতার পরিচয়। কাফির-অমুসলিম, প্রাচ্যবিদ, নারীবাদীসহ প্রত্যেকের জন্য একই কথা প্রযোজ্য।
বাহ্যিক পাঠের মাধ্যমে হাদীছ থেকে আমরা যা যা জানতে পারিঃ
  • ১. নারীরাই বেশি পরিমাণে জাহান্নামী হবে (এটা নিয়ে বিস্তারিত জানতে, নারীরা বেশিরভাগই কি জাহান্নামে যাবে? এই লেখা টা পড়ে আস্তে পারেন)
  • ২. নারীরা স্বামীদের ইহসানকে খুব সহজেই অস্বীকার করে;
  • ৩. নারীদের বুদ্ধি ও দ্বীনের মাঝে ত্রুটি আছে। আজকে মূলত এই ৩নং পয়েন্টটি নিয়েই কথা।

প্রথমে আকলের ব্যাপারে আসি। আকল আসলে কি? এটা নিয়ে অনর্থক বাহাছ করা একেবারেই অসম্ভব কিছু না। সংক্ষেপে ইমাম আইনীর কথাটা উল্লেখ করা যেতে পারে, যা তিনি উমদাতুল ক্বারীতে বলেছেন,

الْعقل جَوْهَر خلقه الله فِي الدِّمَاغ وَجعل نوره فِي الْقلب، تدْرك بِهِ المغيبات بالوسائط والمحسوسات بِالْمُشَاهَدَةِ
আকল-বুদ্ধি এমন এক জিনিস, যা আল্লাহ মানুষের মস্তিষ্কে সৃষ্টি করে অন্তরে তার আলো দিয়ে দিয়েছেন; যার মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমের সহায়তায় কোনো কিছুর নিগূঢ়তা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়কে উপলব্ধি করতে পারে।
এককথায় আকল মানুষের এমন এক যোগ্যতা যা আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন, যা মানুষের চেতনার সাথে যুক্ত থেকে পর্যবেক্ষিত বস্তুর ধারণা নেয়, বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরীকৃত ধারণাকে প্রক্রিয়াজাত করে, তুলনা করে, চিন্তার মাধ্যমে সুগঠিত করে, সুবিন্যস্ত করে; যার মাধ্যমে মানুষ কোনো বিষয় সম্পর্কে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কোনো সামগ্রিক ধারণা লাভ করতে পারে।
এটা মানুষের সাধারণ একটা যোগ্যতা, সৃষ্টিগত ও প্রাকৃতিক ক্ষমতা, যা প্রতিটি মানুষের মাঝেই থাকে, হোক সে নারী কিংবা পুরুষ। তবে আকলের কাজ করার ক্ষমতা, যোগ্যতা ও এর কার্যকারিতার মাঝে মানুষে মানুষে ব্যাপক পার্থক্য দেখা দেয়, নারী ও পুরুষের মাঝে। কোনো কোনো মানুষের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তারা এইমাত্র পৃথিবীতে আসমান থেকে টপকে পড়েছে, আবার কারো কারো কথা শুনলে মনে হয় তারা যেন ওইসকল মানুষের মাঝে পড়েই না বা তারা যেন ভিনগ্রহের মানুষ। আবার কোনো কোনো মানুষের সাথে চলাফেরা করলে মনে হয় এরা কি মানুষ নাকি অন্য কিছু, এদের কি বুদ্ধি বলতে আদৌ কিছু আছে নাকি তা টাকার সাথে ব্যাংকের লকারে দিয়ে রেখেছে? আবার সেই মানবজাতির-ই কারো কারো অবদান দেখলে নিজেকে মনে হয় ‘আমার ঘটে কি আদৌ কিছু আছে?’ এটা মোটামুটি সবার ক্ষেত্রেই সঠিক। তাহলে এই হাদীছটি দ্বারা আসলে কি বোঝানো হচ্ছে? একে ব্যাখ্যা করলে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনা তৈরী হয়।
  • ক) আল্লাহ সকল নারীদের সকল পুরুষের চাইতে কম আকল দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, তাই সকল নারীদের বুদ্ধি-আকল সকল পুরুষের চাইতে কম। এটা গ্রহণযোগ্য কথা না। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির কোনো এক শ্রেণীকে কম আকল দেবেন, আর কাউকে বেশি এতে কোনো সমস্যা নেই, আল্লাহর মর্জি। কিন্তু এ ব্যাখ্যা বাস্তবসম্মত নয় মোটেও, কারণ আয়িশাহ রাদিআল্লাহু আনহার আকল, ফাহম, ইদরাকের সাথে অনেক আদনা থেকে মাঝারি পর্যায়ের সাহাবীর আকলেরই তুলনা দেওয়া যায় না। ড. আয়িশাহ হামদান রাহিমাহাল্লাহ আর মরিয়ম জামিলা রাহিমাহাল্লাহর আকলের সামনে অনেক পুরুষই অসহায়। এরকম উদাহরণ ডজন ডজন দেওয়া যাবে। তাই এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়, আর হাদীছের শব্দও যেহেতু কিছুটা দ্ব্যর্থবোধক তাই অবাস্তব ব্যাখ্যা গ্রহণ না করলেও চলে।
  • খ) সাধারণভাবে পুরুষজাতির বুদ্ধি আল্লাহ সাধারণভাবে নারীজাতির চাইতে বেশি দিয়েছেন। এ কারণে কিছু পুরুষ যেমন আকলের দিক থেকে মিসকীন, তেমনি সকল নারীই মরিয়ম জামিলা নয়, এ ব্যাখ্যা মোটেও বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। এমন ব্যাখ্যা গ্রহণ করে নিলে তেমন সমস্যা থাকে না।
  • গ) তৃতীয় আরেকটি ব্যাখ্যা হতে পারে এই যে, নারী ও পুরুষকে আল্লাহ আকলের যোগ্যতা সমান দিয়েছেন, তবে পুরুষ ও নারীর মনস্তত্ত্ব, প্রকৃতি (nature), মানসিক অবস্থা ইত্যাদির মাঝে যেহেতু পার্থক্য রয়েছে -যা অত্যন্ত সুস্পষ্ট-, আর এসব উপাদান আকলের কার্যকারিতায় কিছুটা প্রভাব ও পার্থক্য তৈরী করে থাকে। যেমনঃ নারীদের মাঝে বিবেকের চাইতে আবেগ বেশি কাজ করে থাকে, তাই তারা কখনো কখনো লজিক্যালি ভাবার পরিবর্তে ইমোশনালি ভাবে, তাদের মাঝে আকলের চাইতে দয়ার্দ্রতা ও কোমলতা বেশি প্রাধান্য পেয়ে যায়, আর কখনো কখনো তা আকলের যথার্থ কার্যকারিতাকে কমিয়ে দেয়, একইভাবে কখনো কখনো তারা অতি সহজে গলে যায় কিংবা কথায় প্রভাবিত হয় (সংবাদে আসে যে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে বিছানায় পর্যন্ত নিয়ে যায়, এসব ঘটনা সত্য হলে তা এই কথার বাস্তবতাই প্রকাশ করছে), তখন আকলের ওপর নারীপ্রকৃতি বিজয়ী হয়। খ ও গ অপশনদ্বয় মূলত একই মুদ্রার দুই পিঠ। হয় বেসিক্যালিই তাদেরকে আকল কম দেওয়া হয়েছে, যার কারণে নারীস্বভাব ফুটে ওঠে বেশি; আর নাহয় নারীদের স্বভাবগত মেকানিজমই এমন যে, তাদের কিছু কিছু স্বভাব আল্লাহপ্রদত্ত সমান আকলকে অনেকক্ষেত্রেই তুলনামূলক কম কার্যকর বা কখনো একেবারেই অকার্যকর করে দেয়।
যেই ব্যাখ্যাই মেনে নেওয়া হোক না কেন এমনটাই নারীর সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি। এটাই আল্লাহর মহাপ্রজ্ঞার অংশ, এটাই আল্লাহর সৃষ্টি বৈচিত্র্য। আর যেহেতু এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া, তাই সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, আর সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য কখনোই কারও জন্য খোদ-বা-খোদ ইছম বা গুনাহের কারণ হতে পারে না, আর না তা ত্রুটির কারণ হতে পারে না, যতক্ষণ না তার বদৌলতে অন্য কোনো গুনাহের কারণ না হচ্ছে। তাই নারীর আকল সৃষ্টিগতভাবে কম হওয়ার কারণে তা নারীর জন্য তিরষ্কারের কারণ হতে পারে না, যারা এমনটা মনে করেন- তারা দ্বীনকে হাসি-ঠাট্টার বস্তু বানিয়ে ফেলেন। এমন কথাই উপরোক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেছেন হাফিজ ইবনু হাজার আসকালানী। তিনি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
وأن العقل يقبل الزيادة والنقصان ، وكذلك الإيمان كما تقدم ، وليس المقصود بذكر النقص في النساء لومهن على ذلك ; لأنه من أصل الخلقة ، لكن التنبيه على ذلك تحذير من الافتتان بهن ، ولهذا رتب العذاب على ما ذكر من الكفران وغيره لا على النقص
“আকলের মাঝে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটতে পারে, যেমনটা ঈমানের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে, যেমনটা পূর্বে গত হয়েছে। নারীর আকলে ‘ঘাটতি’ দ্বারা তাদের ভর্তসনা উদ্দেশ্য নয়, কেননা এমনটাই তাদের সৃষ্টিগত প্রকৃতি; বরং এখানে মূল উদ্দেশ্য এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া, এ সম্পর্কিত ফিতনা সম্পর্কে সাবধান করে দেওয়া। এ কারণে এখানে আযাবের সম্পর্ক করা হয়েছে (স্বামীর ইহসান অতি সহজেই) অস্বীকার করা ও এ সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে, আকলের ত্রুটির সাথে নয়।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীর আকলের ‘কমতি’ এর ক্ষেত্রে আইনী সাক্ষ্যদানের উদাহরণ দিলেন, এর কি কারণ থাকতে পারে?
ইসলাম জীবন-জগত-মানুষের সামগ্রিক দর্শন ও মেটাফিজিক্স পেশ করে, তাতে নারী আল্লাহর (আসলান) একজন সম্মানিতা সৃষ্টি হলেও তার প্রকৃত স্থান ঘরে। বিয়ের আগে বাবার ঘর, বিয়ের পরে স্বামীর ঘর। নারীর কাজ ঘর সামলানো ও বাচ্চাকাচ্চা পালা অর্থাত, ইসলামী সভ্যতার ক্ষুদ্রতম তবে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ভবিষ্যত প্রজন্মকে সময় দেওয়া, পরিবারব্যবস্থাকে যথার্থ স্থানে কায়েম রাখা। এমতাবস্থায় ইসলামী সমাজে নারীর জন্য বাহিরের কাজ-কারবারে অংশ নেওয়াটা অযাচিত, অনর্থক হস্তক্ষেপ ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সম্ভবও নয়। এ কারণে অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন ইত্যাদি সম্পর্কে নারী তাত্ত্বিক জ্ঞান যদি রেখেও থাকে, তবুও বাস্তবজগতে এসবের সাথে তার সম্পর্কের সুযোগ হয়ে ওঠে না। আর সাক্ষ্যদান করার বিষয়টা অনেকক্ষেত্রেই বাস্তবজগতের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। তাই এক্ষেত্রে তাদের কমতি তো থেকেই যাচ্ছে।
আর তাছাড়া সাধারণভাবে তাদের সন্তান-সন্ততি, পরিবার, বাবা-মা, তাদের তত্ত্বাবধায়ন নিয়েই বেশিরভাগ সময়ে ব্যস্ত থাকতে হয়, এছাড়া হায়েজ-নিফাসের সময়কার শারিরীক ও মানসিক কষ্ট, গর্ভাবস্থার যন্ত্রণা সহকারে তাঁদের নানা সমস্যায় ভোগা লাগে। তাই তাদের দ্বারা সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তির আশঙ্কা থেকে যায়। কিন্তু সাক্ষ্যদান অত্যন্ত ভারী বিষয়, একে যেনতেনভাবে নেওয়াটা মোটেও কাম্য নয়। এর সাথে মানুষের অধিকার জড়িত থাকে। তাই এক্ষেত্রে সতর্কতার দাবী হলো, সাক্ষ্যদানের জন্য একজন পুরুষের বিপরীতে দুজন নারী নিয়ে নেওয়া। তবে যদি নারীদের ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে সেক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের অর্ধেক বলে বিবেচিত হবে না, এমনটা বেশকিছু আলেমের মত। যেমনঃ ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন,
وَالْمَرْأَةُ الْعَدْلُ كَالرَّجُلِ فِي الصِّدْقِ وَالْأَمَانَةِ وَالدِّيَانَة إلَّا أَنَّهَا لَمَّا خِيفَ عَلَيْهَا السَّهْوُ وَالنِّسْيَانُ قَوِيَتْ بِمِثْلِهَا وَذَلِكَ قَدْ يَجْعَلُهَا أَقْوَى مِنْ الرَّجُلِ الْوَاحِدِ أَوْ مِثْلَهُ وَلَا رَيْب أَنَّ الظَّنَّ الْمُسْتَفَادَ مِنْ شَهَادَةِ مِثْلِ أُمِّ الدَّرْدَاءِ وَأُمِّ عَطِيَّةَ أَقْوَى مِنْ الظَّنِّ الْمُسْتَفَادِ مِنْ رَجُلٍ وَاحِدٍ دُونَهُمَا وَدُونَ أَمْثَالِهِمَا
এবং নারী ও পুরুষ সত্যবাদীতা, আমানত, দিয়ানত এসবের দিক থেকে একইরকম একমাত্র তাদের মধ্যে যদি ভ্রান্তি কিংবা ভুলপ্রবণতার আশঙ্কা পাওয়া যায়, তবে আরেকজন নারীকে এনে তার শক্তি বৃদ্ধি করা হবে। যা তাকে একজন পুরুষের চাইতে কিংবা তার মত শক্তিশালী করে তুলবে। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে উম্মু দারদা ও উম্মু আতিয়্যাহর মত নারীদেরকে যতটুকু সন্দেহাবসর দেওয়া হবে তা বেশি শক্তিমান হবে, যতটুকু একজন পুরুষকে তাদের বাদ দিয়ে বা তাদের মত দুজনকে দেওয়া হবে তার চাইতে।”
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন,
فَمَا كَانَ مِنْ الشَّهَادَاتِ لَا يُخَافُ فِيهِ الضَّلَالُ فِي الْعَادَةِ لَمْ تَكُنْ فِيهِ عَلَى نِصْفِ رَجُلٍ
যদি (নারীদের) সাক্ষ্যদানের ক্ষেত্রে যদি অভ্যাসগত ভ্রান্তির আশঙ্কা না করা হয়, তবে সে পুরুষের অর্ধেক বলে বিবেচিত হবে না।
যেমনটা হাদীছের বর্ণনার কাজটা এক প্রকারের সাক্ষ্যদানই। তবে যেহেতু তা সেভাবে বাহ্যিক জগতের উত্থান-পতনের সাথে জড়িত না, এখানে ব্যক্তির ব্যক্তিগত সততা ও হাদীছ মনে রেখে ঠিকঠাক বর্ণনা করতে পারার যোগ্যতাই মূল বিবেচ্য, তাই হাদীছ গ্রহণের ক্ষেত্রে নারী হলে হাদীছ গ্রহণ করা হবে না- এমন কোনো মূলনীতি নেই। তবুও আলেমদের।ফিকহী ইখতিলাফ থাকতে পারে, আর হুকুমের মূল ইল্লত ও প্রকৃত হিকমাহ আল্লাহ ছাড়া আর কেই-বা জানে? তিনিই পরম স্রষ্টা এবং দৃশ্য ও অদৃশ্যের সকল জ্ঞানের প্রকৃত অধিকারী।
আর দ্বীনের কমতি হওয়ার ব্যাপারে ইবনু হাজার আসকালানী বলেছেন,
وليس نقص الدين منحصرا فيما يحصل به الإثم بل في أعم من ذلك قاله النووي ; لأنه أمر نسبي ، فالكامل مثلا ناقص عن الأكمل ، ومن ذلك الحائض لا تأثم بترك الصلاة زمن الحيض لكنها ناقصة عن المصلي
আর দ্বীনের ক্ষেত্রে ত্রুটি এমন কোনো বিষয় নয় যাতে গুনাহ হবে, বরং তা সাধারণ বিষয়, যেমনটা নববী বলেছেন, ‘এই বিষয়টা আসলে আপেক্ষিকভাবে বলা হয়েছে, যেভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ জিনিসকে অসম্পূর্ণ জিনিসের সাথে পূর্ণতার দিক থেকে বলা হয়ে থাকে। এ কারণে হায়েযগ্রস্ত নারী হায়েযের সময়কালে সালাত ত্যাগ করার কারণে গুনাহগার হন না, তবে তিনি (আপেক্ষিকভাবে) সালাত আদায়কারীর চাইতে অসম্পূর্ণ।”
পরিশেষে এটাই বলতে হয় যে, আমাদের মাঝে নবুওয়্যাত ও রিসালাতের মর্যাদা সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রচারিত হয়ে আছে। নবীরা সাধু-সন্তের মত ধ্যান করবেন, উনি সবসময় কেবল ভালো ও উপদেশের কথা বলবেন, সবাইকে মধুর মধুর কথা বলবেন- এই হচ্ছে নবী-রাসূল সম্পর্কে আমাদের ধারণা। কিন্তু উম্মাহকে পথ দেখানো, কারো কোনো দোষ-ত্রুটি থাকলে তা দেখিয়ে দেওয়া, সংশোধন করার চেষ্টা করা, তাঁকে নম্রতার সাথে কিংবা কখনো কঠোরতার সাথে ইসলাহ করা, সুসংবাদের পাশাপাশি সত্য সতর্কবাণী শোনানোও যে রাসূলদের দায়িত্ব- এটা বেমালুম ভুলে যায় অনেকেই। এই দৃষ্টিতে রাসূলের এই হাদীছটি নারীদের ছোট করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং উম্মাহর নারীদের প্রতি পিতাসুলভ দরদই ফুটে ওঠে। আর তিনি কেবল সতর্কবাণী-ই শোনাননি, সাথে সাথে যাদের মাঝে এই খারাপ স্বভাব আছে তাদেরকে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও সাদাকাহর মাধ্যমে মুক্তির পথও বাতলে দিচ্ছেন।
Join the Conversation