নারীরা বেশিরভাগই কি জাহান্নামে যাবে?

বেশ কিছু হাদীছ থেকে আমরা জানতে পারি যে, জাহান্নামীদের অধিকাংশই নারী হবে।

أُرِيتُ النَّارَ فَإِذَا أَكْثَرُ أَهْلِهَا النِّسَاءُ يَكْفُرْنَ ‏”‏‏.‏ قِيلَ أَيَكْفُرْنَ بِاللَّهِ قَالَ ‏”‏ يَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ، وَيَكْفُرْنَ الإِحْسَانَ، لَوْ أَحْسَنْتَ إِلَى إِحْدَاهُنَّ الدَّهْرَ ثُمَّ رَأَتْ مِنْكَ شَيْئًا قَالَتْ مَا رَأَيْتُ مِنْكَ خَيْرًا قَطُّ

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?’ তিনি বললেনঃ ‘তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।’ তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাকো, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, ‘আমি কক্ষণো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।’ (বুখারী, কিতাবুল ঈমান, বাব- ২/২১, ২৯)

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস বর্ণিত এ হাদীছটি মূলত সূর্যগ্রহণ সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ হাদীছের ছোট একটি অংশ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে একবার সূর্যগ্রহণ হলে তিনি দীর্ঘ সালাত আদায় করেন সবাইকে নিয়ে। সেসময় তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হয়। তখন তিনি জাহান্নামের কথা বলতে যেয়ে এমন কথা বলেন, যার পরিপূর্ণ অংশ বুখারীর হাদীছ নম্বর ১০৫২ (কিতাবুল কুসুফ, বাব- ১৬/১০) এ পাওয়া যায়।

اطَّلَعْتُ فِي الْجَنَّةِ فَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا الْفُقَرَاءَ وَاطَّلَعْتُ فِي النَّارِ فَرَأَيْتُ أَكْثَرَ أَهْلِهَا النِّسَاءَ

আমি জান্নাতের দিকে উঁকি দিলাম, আর দেখতে পেলাম, তার অধিকাংশই দুঃস্থ গরীব লোক। তারপর জাহান্নামের দিকে উঁকি দিলাম, আর দেখতে পেলাম জাহান্নামবাসীদের অধিকাংশই মহিলা জাতি। (মুসলিম ৬৮৩০, ৬৮৩১; বুখারী ৬৪৪৯, ৬৫৪৬, ৬৫৪৭। হাদীছের শব্দ মুসলিমের)

এছাড়া আরেকটি হাদীছও পাওয়া যাচ্ছে এ মর্মে

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إِنَّ الْفُسَّاقَ هُمْ أَهْلُ النَّارِ ) قِيلَ: يَا رَسُولَ اللهِ، وَمَنِ الْفُسَّاقُ؟ قَالَ: ( النِّسَاءُ ) قَالَ: رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ، أَوَلَسْنَ أُمَّهَاتِنَا، وَأَخَوَاتِنَا، وَأَزْوَاجَنَا؟ قَالَ: ( بَلَى، وَلَكِنَّهُنّ إِذَا أُعْطِينَ لَمْ يَشْكُرْنَ، وَإِذَا ابْتُلِينَ لَمْ يَصْبِرْنَ

নিশ্চয়ই ফাসিকরা জাহান্নামের অধিবাসী। জিজ্ঞেস করা হলোঃ ফাসিক কারা হে রাসুলুল্লাহ? তিনি উত্তরে বললেন, ‘নারীরা’। তাঁরা বললেন, ‘তাঁরা কি আমাদের মা, বোন ও পত্নী নয়?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘অবশ্যই। তবে তাদেরকে যখন কিছু দেওয়া হয় তখন তারা শুকরিয়া করে না, আর যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হয় তখন সবর করে না।’ (আহমাদ, হাকিম, বায়হাকী)

বাহ্যিকভাবে হাদীছগুলো থেকে যা জানা যায় তা হলোঃ

  • (১) নারীরা জাহান্নামে অধিক যাবে। তবে এই জাহান্নামে যাওয়ার কারণ কেবল ‘নারীত্ব’ (womenhood) নয়। কেউ নারী হওয়ার কারণেই জাহান্নামে যাবে, এমনটা হাদীছ থেকে বোঝা যায় না। বরং এখানে নারীদের সাথে এমন কিছু কারণ (ত্রুটি, স্বভাবগত দুর্বলতা, নারীত্বের এমন বৈশিষ্ট্য যা বিপরীত লিঙ্গকে চরম পরীক্ষার সম্মুখীন করতে পারে ইত্যাদি) যুক্ত করা হয়েছে যা তার জাহান্নামের কারণ হতে পারে অথবা হবে (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই)
  • (২) জাহান্নামে অধিক যাওয়ার কারণ হলো স্বামীর প্রতি না-শোকরী করা, সাধারণভাবে না-শোকরী করা, সবর-ধৈর্য্যের ঘাটতি, এ ঘাটতির কারণে সামান্য ত্রুটি দেখলেই বিগত নিয়ামতের অস্বীকৃতি। অন্যান্য হাদীছ থেকে জানা যায় যে, অধিক পরিমাণে লা’নত করাও এর অন্যতম কারণ।

জাহান্নামে অধিক পরিমাণে নারীদের যাওয়ার ব্যাখ্যা কয়েক ধরণের হতে পারে।

  • (ক) বুখারীতে আবু সাঈদ খুদরী বর্ণিত হাদীছ মোতাবেক এটা খুব সম্ভব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঈদের দিন মহিলাদের উদ্দেশ্য যেই কথা বলেছিলেন (যেই হাদীছটি গত লেখায় আলোচিত হয়েছিলো) তারই অংশ। তাই হতে পারে এই হাদীছটি তৎকালীন ওই মহিলাদের জন্যই প্রযোজ্য, কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওইসময়কার মহিলাদের মাঝে ওমন আচরণ দেখতে পেয়েছিলেন। এখানে সার্বজনীন কোনো মূলনীতি বর্ণিত হয়নি যে সর্বকালের মহিলারা জাহান্নামে বেশি যাবে। তবে এই ব্যাখ্যা তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা এ বিষয়ক হাদীছ কেবলমাত্র আবু সাঈদ খুদরী থেকেই নয়, বরং ইবনে আব্বাস ও উসামা বিন যাইদ থেকেও বর্ণিত আছে। আর সূর্যগ্রহণের সেই দীর্ঘ হাদীছ পড়লে ঈদের দিনের অংশ বলে কোনোক্রমেই মনে হয় না, বরং দুটি ভিন্ন ঘটনা বলেই প্রতীয়মান হয়। আর যদি সার্বজনীন কোনো মূলনীতি এখানে বর্ণিত নাও হয়ে থাকে, তবুও দেখতে হবে যেই ইল্লতবশত এহেন সতর্কবাণী শোনানো হয়েছে সেই গুণগুলো সার্বজনীন কিনা বা এখনকার মহিলাদের মধ্যে তা আছে কিনা, যদি থাকে তবে একে সার্বজনীন (universal) না বললেও কেবলমাত্র তৎকালীন সময়ের সাথেই সম্পৃক্ত করা সম্ভবপর বলে মনে হয় না।
  • (খ) আরেকটি হাদীছ আছে যেখানে বলা হয়েছে, ‘জান্নাতবাসীদের মাঝে নারীদের সংখ্যা অল্প হবে’ নারীরা মূলতই জাহান্নামে বেশি যাবে, তবে তা পুরুষের তুলনায় বা মোকাবেলায় নয় বরং তা জান্নাতী নারীদের তুলনায়। এর অর্থ দাঁড়ায়, নারীরা যত সংখ্যক জান্নাতে প্রবেশ করবে এর চাইতে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ, নারীদের একদলের (জান্নাতীদের) মোকাবেলায় আরেকদলের (জাহান্নামীদের) সংখ্যা বেশি হবে।

যেমনটা ইমাম মুনাবী বলেছেন,

قال السمهودي: وفيه نظر لإمكان الجمع بأن المراد أن منكن في الجنة ليسير بالنسبة لمن يدخل النار منكن لأنهن أكثر أهل النار ويحمل عليه خبر عائشة أقل ساكني الجنة النساء يعني بالنسبة لمن يسكن منهن النار

সামহুদী বলেনঃ এখানে (বাহ্যিক সাংঘর্ষিকতার মাঝে) সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। কেননা জান্নাতে নারীদের কম হওয়া মূলত জাহান্নামে প্রবেশকৃত নারীদের তুলনায় বলা হয়েছে, এমনটাই উদ্দেশ্য এখানে। জান্নাতে নারী অধিবাসী কম হওয়ার ব্যাপারে আয়িশাহ রাদিআল্লাহু আনহুর মত হলো, এটা জাহান্নামে প্রবেশকৃত নারীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে। (অনুবাদে কিছুটা সংক্ষেপে করা হলো)

  • (গ) জান্নাতে নারীরা পুরুষের চাইতে বেশি হবে, আর জাহান্নামেও তারা সংখ্যায় বেশি হবে। এ মর্মে একটি বর্ণনা এসেছে মুসলিমে (অধ্যায় ৫৩, বাব-৬, ৭০৩৯), যা অনেকটা এরকম,

عَنْ مُحَمَّدٍ، قَالَ إِمَّا تَفَاخَرُوا وَإِمَّا تَذَاكَرُوا الرِّجَالُ فِي الْجَنَّةِ أَكْثَرُ أَمِ النِّسَاءُ فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ أَوَلَمْ يَقُلْ أَبُو الْقَاسِمِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِنَّ أَوَّلَ زُمْرَةٍ تَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَلَى صُورَةِ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْرِ وَالَّتِي تَلِيهَا عَلَى أَضْوَإِ كَوْكَبٍ دُرِّيٍّ فِي السَّمَاءِ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ زَوْجَتَانِ اثْنَتَانِ يُرَى مُخُّ سُوقِهِمَا مِنْ وَرَاءِ اللَّحْمِ وَمَا فِي الْجَنَّةِ أَعْزَبُ

মুহাম্মাদ (ইবনু সিরীন) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা গর্ব প্রকাশ করে বলল, অথবা আলোচনা করতঃ বলল, জান্নাতে পুরুষ অধিক হবে, না মহিলা? এ কথা শ্রবণে আবূ হুরায়রা বললেন, আবুল কাসিম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি বলেননি, যে দলটি জান্নাতে প্রথমে প্রবেশ করবে তাদের মুখায়ব পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল হবে। তাদের পর যারা জান্নাতে যাবে তাদের চেহারা হবে ঊর্ধ্বাকাশের আলোকিত নক্ষত্রের মতো। তাদের প্রত্যেকের জন্যই থাকবে দু’ জন সহধর্মিণী। গোশ্তের এ পাশ হতে তাদের পায়ের নলার মগজ দৃশ্য হবে। জান্নাতের মাঝে কেউ (আর) অবিবাহিত থাকবে না।

এ হাদীছের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার আসকালানী ‘ফাতহুল বারীতে’ বলেন,

واستدل أبو هريرة بهذا الحديث على أن النساء في الجنة أكثر من الرجال كما أخرجه مسلم من طريق ابن سيرين عنه وهو واضح لكن يعارضه قوله صلى الله عليه وسلم في حديث الكسوف المتقدم رأيتكن أكثر أهل النار ويجاب بأنه لا يلزم من أكثريتهن في النار نفي أكثريتهن في الجنة لكن يشكل على ذلك قوله صلى الله عليه وسلم في الحديث الآخر: اطلعت في الجنة فرأيت أقل ساكنها النساء ويحتمل أن يكون الراوي رواه بالمعنى الذي فهمه من أن كونهن أكثر ساكني النار ويلزم منه أن يكن أقل ساكني الجنة، ويحتمل أن يكون ذلك في أول الأمر قبل خروج العصاة من النار بالشفاعة.

আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু এই হাদীছের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, জান্নাতে পুরুষের চাইতে নারীরা সংখ্যায় অধিক হবে, যেমনটা আবু হুরায়রা থেকে ইবনু সিরীনের সূত্রে মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। তবে এ মতটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীছ -যা পূর্বে সূর্যগ্রহণ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে- এর সাথে সাংঘর্ষিক, যাতে বলা হয়েছে যে, ‘আমি তোমাদের অধিকসংখ্যককে জাহান্নামের অধিবাসী হিসেবে দেখেছি’।

অবশ্য এই হাদীছের উত্তর এভাবে দেওয়া যেতে পারে যে, জাহান্নামের অধিবাসী অধিক হওয়া দ্বারা জান্নাতে অধিকসংখ্যক হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া যায় না। তবে এক্ষেত্রেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদীছের সাথে তা সাংঘর্ষিক হয়ে যায় যেখানে বলা হয়েছে, ‘আমি জান্নাতের অধিবাসীদের মধ্য থেকে নারীদের কমসংখ্যক দেখেছি’। এক্ষেত্রে সম্ভাবনা আছে যে, হাদীছটির রাবী রিওওয়ায়েত বিল মা’না করেছেন, অর্থাৎ, তিনি জাহান্নামে নারীদের অধিকসংখ্যক হওয়ার দ্বারা বুঝেছেন হয়ত তারা জান্নাতেও অল্পসংখ্যক হবে; অথবা হতে পারে যে, এর দ্বারা পাপীদের জন্য শাফাআতের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি পাবার পূর্বেকার অবস্থা বর্ণিত হয়েছে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন,

لِأَنَّ النِّسَاءَ أَكْثَرُ مِنْ الرِّجَالِ إذْ قَدْ صَحَّ أَنَّهُنَّ أَكْثَرُ أَهْلِ النَّارِ وَقَدْ صَحَّ لِكُلِّ رَجُلٍ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ زَوْجَتَانِ مِنْ الْإِنْسِيَّاتِ سِوَى الْحُورِ الْعِينِ وَذَلِكَ لِأَنَّ مَنْ فِي الْجَنَّةِ مِنْ النِّسَاءِ أَكْثَرُ مِنْ الرِّجَالِ وَكَذَلِكَ فِي النَّارِ فَيَكُونُ الْخَلْقُ مِنْهُمْ أَكْثَرَ

নারীরা পুরুষের চাইতে সংখ্যায় বেশি, যেহেতু জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী নারী হবে এবং প্রত্যেক পুরুষ জান্নাতে মানবজাতির মধ্য থেকে হুরদের থেকে নয়- দুজন করে নারীসঙ্গী পাবে- এই মর্মে হাদীছ বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়েছে। এটা এই কারণেই যে, জান্নাত ও জাহান্নাম উভয় স্থানেই নারীরা অধিক হবে, কেননা তারা সৃষ্টিগতভাবেই (পুরুষের চাইতে) সংখ্যায় অধিক।

ইমাম নববী কাযী ইয়াজের মতামত এভাবে বর্ণনা করেন,

قال القاضي : ظاهر هذا الحديث أن النساء أكثر أهل الجنة . وفي الحديث الآخر أنهن أكثر أهل النار ، قال : فيخرج من مجموع هذا أن النساء أكثر ولد آدم ، قال : وهذا كله في الآدميات ، وإلا فقد جاء للواحد من أهل الجنة من الحور العدد الكثير

কাযী বলেছেনঃ এই হাদীছ থেকে বাহ্যিকভাবে এটা বোঝা যায় যে, নারীরা জান্নাতে অধিক হবে; তবে আরেকটি হাদীছে দেখা যায়, নারীরা অধিকাংশ জাহান্নামের অধিবাসী। তিনি বলেন, এই দুই হাদীছ থেকে সামগ্রিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নির্গত হয় যে, আদম সন্তানদের মধ্যে নারীরাই অধিকসংখ্যক………

  • (ঘ) নারীরা হয়ত জাহান্নামে অধিক যাবে, তবে এটা হয়ত শাফাআতের আগের অবস্থা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাফাআত করার পর উম্মাহর নারী ও পুরুষগণের পাপীগণকে আল্লাহ তাঁর অনন্ত হিকমাহ অনুযায়ী ন্যায্য শাস্তি দেবার পর জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে এসে বাহরুল হায়াতে প্রবেশ করাবেন এবং জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেবেন। এই ব্যাখ্যাটি বেশ চমৎকার, যা মেনে নিলে এমন কোনো সমস্যা তৈরী হয় না, যা ইসলামের অন্যান্য মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। বরং এ ব্যাখ্যা মেনে নিলে অন্যান্য সকল সম্ভাবনাকেও এর সাথে যুক্ত করে দেওয়া সম্ভব। আল্লাহু আ’লাম।

কিছু বিষয় স্মরণ রাখতে হবে সবসময়।

  • প্রথম, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারী ও পুরুষ সকলের জন্যই রাসূল হিসেবে এসেছিলেন। তাঁর দায়িত্ব ছিলো তাঁর উম্মাহ ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে হেদায়াতের রাস্তা প্রদর্শন করা, সুসংবাদ দান করা, সতর্ক করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারী ও পুরুষ প্রত্যেকের প্রতিই এই দায়িত্ব পালন করে গেছেন। যাকে যেভাবে দরকার, যে ভঙ্গীতে দরকার, যতটুকু কোমলতা কিংবা কঠোরতার প্রয়োজন সেভাবেই তাকে তাঁর দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বারবার বলেছেন, যাতে তাদের অন্তরে তা ভালোভাবে গেঁথে যায়। নারীদের প্রতি সম্বন্ধিত এ বর্ণনাগুলো সেই দায়িত্বের-ই অংশ বিশেষ। সুতরাং তাঁকে কেবলমাত্র একজন ‘পুরুষ’ হিসেবে নয় বরং তাঁকে নবী ও রাসূল হিসেবেই দেখতে হবে। তিনি আমাদের ইচ্ছামত নয়, বরং সত্যকে সত্যের মত বর্ণনা করতে এসেছেন, সেটাই তাঁর সত্যিকারের মাকাম।
  • দ্বিতীয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বর্ণনাসমূহে স্পষ্ট করে কিছুই বলেননি যে আসলে কোন সময়কার নারী, কবেকার নারী, তারা কি চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে নাকি অল্পসময়ের জন্য থাকবে, কখন যাবে কীভাবে যাবে- এর কোনো কিছুই তিনি নির্দিষ্ট করে দিয়ে যাননি; তিনি এগুলোকে গোপন ও লুক্কায়িত রেখেছেন। এর মূল কারণ, তিনি চান না আমরা এসব নিয়ে এখন একে অন্যকে বিচার করতে লেগে যাবো আর এর থেকে মূল বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া বাদ দিয়ে কেবলমাত্র এসব খুঁটিনাটি বিষয়ের পেছনে ছোটা শুরু করবো। হাশর হওয়ার আগে দুনিয়াতেই তর্ক-বিতর্ক করে ছোটখাটো একখানা বিচারালয় করে তুলবো- এসব কারণে এ বর্ণনাগুলো বর্ণিত হয়নি। এখানে যা যা তিনি বলেছেন, এর মূল উদ্দেশ্য তাম্বীহ বা সতর্কীকরণ। পুরুষ না নারী কে জান্নাতে অধিক যাবে, কোন লিঙ্গের মানুষ দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ হবে- এসব অনর্থক বিতর্ক কিংবা গর্ব প্রকাশের জন্য নয় মোটেও। রাসূলের উম্মাহর কোনো অংশকে তিনি জোর করে বা শত্রুতা করে জাহান্নামে দিয়ে দেবেন, এমনটা ভাবাও সম্ভব না; অথবা এসবের মাধ্যমে তিনি উম্মাহ ও মানবজাতির একটি অংশকে আরেক অংশের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেবেন, এসব কল্পনাও করা যায় না। উম্মাহর কেউ জাহান্নামে গেলে তাঁর কষ্ট বই সুখ লাগবে না, আর সবাইকে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারলে তাঁর চাইতে খুশী আর কেউ হবে না। তাই এখান থেকে তাম্বীহ বা সতর্কীকরণের বার্তা না নিয়ে অনর্থক জান্নাতে কার সংখ্যা বেশি হবে- এসব নিয়ে বাহাছ-মুবাহাছার কোনো অর্থ হয় না।
  • তৃতীয়, কেউ যাতে না ভাবে যে, রাসূল মনে হয় শুধু নারীদের নিয়েই কথা বলেছেন, পুরুষদের নিয়ে কিছুই বলেননি (এটা নিয়েও আলাদা করে লেখার ইচ্ছা আছে ইনশাআল্লাহ)। মূলত, এমন ভাবনা ভুল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন অনেক সতর্কবাণী শুনিয়েছেন যা পুরুষরাই অধিক করে, তাদের দ্বারাই হয়ে থাকে, যা ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা থেকে প্রমাণিত। সেসকল ক্ষেত্রে আলাদা করে পুরুষদের কথা বলে দিতে হয়নি, শুধু কাজের কথা বর্ণনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, কারণ মানুষ এতেই বুঝে নেবে যে, এখানে কারা উদ্দেশ্য। আর মূলত এসব বর্ণনায় কোনো লিঙ্গের মানুষকে সাধারণভাবে কিছু বলা হয়না বলা হয় যাদের মাঝে সেই খারাপ স্বভাব রয়েছে তাদেরকে। তিনি যেখানে সামগ্রিকভাবে কোনো জিনসের মাঝে স্বভাবগত কোনো দুর্বলতা –যা আল্লাহর বান্দা হিসেবে শাস্তির কারণ হতে পারে কিংবা পরিবার ও সমাজতন্তুর (social fabric) জন্য ক্ষতিকর- সেখানেই তিনি জিনসের ত্রুটি উল্লেখ করেছেন। কোনো ইল্লত-কারণ বা ত্রুটি উল্লেখ করা ব্যতীত কেবলমাত্র লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে কাউকে কিছুই বলা হয়নি। নারীদের ব্যাপারে হাদীছগুলো এই শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *