বাবা প্রতিদিন সকালে বেরিয়ে পড়েন বস্তা নিয়ে, কখনো বা ব্যাগ নিয়ে। সাথে থাকে তাঁর ১৩ বছরের কিশোর ছেলেটিও। ব্যাগ বোচকা ভর্তি বই নিয়ে বেরিয়ে যায় দুজনে। উদ্দেশ্য মানুষকে দাওয়াত দেওয়া, আল্লাহর দিকে আহ্বান করা। দিনের পর দিন চলে যায়, বাবা ছেলের দাওয়াতী কাজও চলতে থাকে পুরোদমে।
একদিন প্রচন্ড তুষারপাত হচ্ছে, চারিদিকে যেদিকেই তাকাই সেদিকেই সাদা শুভ্রতায় ঢাকা। ছোট ছেলেটি প্রতিদিনের মত বের হতে প্রস্তুত কাঁধে ব্যাগ নিয়ে। বাবাকে যেয়ে বললো,
–আব্বু চলেন যাই
বাবাঃ বাইরে দেখেছ না তুষারপাত হচ্ছে? আজকে যাওয়া হচ্ছে না।
ছেলেঃ কেন বাবা? তুষারপাতে কি হয়েছে?
বাবাঃ বাহিরে গেলে শীতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। তাই আজকে আমরা যাবো না।
ছেলেঃ বাবা! শীতের কারণে এই লোকগুলো জাহান্নামের আগুণ থেকে মুক্তি পাবে?
বাবাঃ ব্যস! আর কথা নেই। আজকে আমরা যাবো না।
ছেলেঃ আচ্ছা! আমি যেতে চাই, এই অনুমতি দিবেন কি?
বাবাঃ ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছা তুমি যাও! কিন্তু সাবধান থাকবে।
ছেলেটি ঘুরে বেড়াচ্ছে, এদিক থেকে ওদিক, যদি কোনো মানুষের দেখা পাওয়া যায়, তাঁকে আল্লাহর কথা বলা যায়, দুটা কথা বলে দাওয়াত দেওয়া যায়। কিন্তু দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনো মানুষের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। ছেলেটি ক্লান্তিহীন পথে হেঁটেই যাচ্ছে, একবুক আশা নিয়ে। দূরে একটি ঘর দেখতে পেয়ে ছেলেটি একটু দ্রুত পায়ে হেঁটে গেলো। দরজার কাছে যেয়ে কড়া নাড়লো, মনে মনে আশা কেউ একজন দরজা খুলবে আর সে তাঁর ঝুলি থেকে একটা বই দিয়ে তাঁর দায়িত্ব পালন করবে। অনেকক্ষণ কড়া নাড়লো, কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। কেউই খুললো না দরজা। ছেলেটি আরো কিছুক্ষণ নক করলো দরজা, কিন্তু কাউকে না পেয়ে সে চলে যাচ্ছিলো ব্যর্থ মনোরথে। কিছুদূর চলে গেলেও আবার পিছনে এসে দরজার কাছে চলে গেলো ছেলেটি। মনে মনে ভাবলো, ‘দেখি না আরেকবার কড়া নেড়ে যদি কেউ আসে!’। যেই ভাবা সেই কাজ। ছেলেটি আবার আশা নিয়ে দরজার কড়া নাড়তে শুরু করলো। কিন্তু এবারও তাঁকে নিরাশ হতে হলো। কেউই আসলো না। সে বাসার পথে হাঁটা শুরু করলো।
হঠাৎ………… মনে হচ্ছে দরজা খোলার শব্দ, কে যেন দরজা খুললো, ছেলেটি পেছনে তাকিয়ে দেখলো একজন মহিলা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি মহিলাটিকেই দেখে মুচকি হেসে দিলো। সে সামনে এগিয়ে মহিলাটির নিকটে গেলো। ব্যাগ থেকে একটি বই বের করে বললো,
“এটা আপনার জন্য! আপনি কি জানেন আপনাকে পৃথিবীর কেউ ভালো না বাসলেও এক সত্ত্বা ভালোবাসেন? এটা সেই সত্ত্বার পক্ষ থেকে আমি আপনাকে দিতে আসলাম।”
এতটুকু বলেই ছেলেটি তাঁর বাসার দিকে রওয়ানা দিলো।
সপ্তাহখানেক বাদ, জুমুয়াহর দিন। সেই ছেলেটির বাবা খতিব হয়ে মিম্বরে বয়ান করছে। বয়ান শেষে মুসল্লীদের প্রশ্নোত্তর পর্বের সময়। একজন মহিলা দাঁড়িয়ে গেলো। সে বললো, “ইয়া শায়েখ! আমি গত সপ্তাহেও জীবনের ব্যাপারে হতাশ ছিলাম। একদিন অনেক তুষারপাত হচ্ছিলো। আমার হতাশা চরমমাত্রায় পৌছে গিয়েছিলো। আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আত্মহত্যা করবো। সকল ব্যবস্থা নিয়ে ছিলাম আমার কার্য হাসিল করার জন্যে। হঠাৎ কে যেন দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করলো। আমি দরজা না খুলে আমার কাজে অনড় থাকার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু এতবার দরজায় কড়া নাড়া হচ্ছিলো যে আমি বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দেখি একটা কিশোর ছেলে। সে আমার কাছে এসে একটা বই দিয়ে বললো এটা নাকি আমাকে যে সবচাইতে বেশি ভালোবাসে তাঁর পক্ষ থেকে সে নিয়ে এসেছে। আমি বইটা খুলি। খুলে দেখি সেখানে আল্লাহর কথা লেখা। আমি বই পড়ে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি ইসলাম গ্রহণ করবো। হ্যাঁ! আমি একজন কাফের ছিলাম। আমি যদি সেদিন আত্মহত্যা করতাম তবে আমি জাহান্নামী হয়ে যেতাম। আমি চিরস্থায়ী আগুণের বাসিন্দা হয়ে যেতাম।” খতিব সাহেবের বুঝতে বাকী থাকলো এই মহিলাকে সেই বই দেওয়ার কিশোর তাঁর নয়নের মনি, কলিজার টুকরা ছেলেই।
গল্পটি আমাদেরকে একটু নাড়া দেওয়ার মতই, দেখুন! আমরা আলহামদুলিল্লাহ দাবী করি আমরা হেদায়াত পেয়েছি, আমরা সঠিক পথ পেয়েছি। কিন্তু আমাদের শোকর এই পর্যন্তই। এরপর আমাদের কি অবস্থা হয়? অল্প কিছু কিছু বইপড়া, ফেসবুকে কিছু দ্বিনী ভাইয়ের পোস্ট, কিছ গ্রুপ ভিজিট করা, লাইক, শেয়ার, কমেন্ট এই তো এর বেশী কিছু কি? আমরা প্রত্যেকেই চাই আমাদের সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা হোক। শিরক, কুফর, জুলুমবাজি বন্ধ হোক। এটা প্রতিটি মুমিনেরই চাওয়া, একান্ত বাসনা। কিন্তু এই একান্ত বাসনা পূরণে করার জন্য আমরা কি করতে পারি? কতটুকু করতে পারি? শুধু ফেসবুক ইসলাম সংক্রান্ত কিছু পোস্ট শেয়ার করলেই কি শিরক, কুফর দূর হয়ে যাবে? ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে? কখনোই না। আমরা কয়টা মানুষের কাছে ইসলামের ম্যাসেজ নিয়ে গেছি? কয়টা? আমরা কয়টা মানুষের ঈমানের ফিকির করি? কিন্তু আপনি আমি তো সমাজের অবস্থা ভালোমতই জানি। ইন্টারে পড়াকালীন সেই মেধাবী ছেলেটার কথা আমি ভুলতে পারি না, আসলেই পারি না, ছেলেটা শেষমেষ ভালো করতে পারলো না পরীক্ষায়, সারাক্ষণ বসে একই মেয়ের কথা ভাবা, আশেপাশের সবাইকে ছবি দেখিয়ে বেড়ানো, সাইকেলে করে দূরে তাকে একনজর দেখার জন্য ধানমন্ডি চলে যেত, আর ক্লাসে আনমনা হয়ে থাকত, এই ছেলেটার কি ইসলামের দরকার নেই? সেই ছেলের কি আখিরাতের আযাব থেকে বাঁচতে হবে না? ওই বোনকে দেখুন! ভেবেছিলো নিজের ভালোবাসাকে বিয়ে করলেই বুঝি পৃথিবীর সব সুখ তার পদচুম্বন করবে কিন্তু তার স্বপ্ন স্বপই থেকে গেছে, বিনিময়ে মিলেছে লাথিগুতা! কি মনে হয় সেই বোনটির ইসলামের কথা জানার প্রয়োজন নেই? ধুঁকে ধুঁকে মরা সেই বোনের ও ইসলাম দরকার নেই যে স্বামীর অত্যাচার, শাশুড়ির কটুকথা শুনে শুনে জীবন নিয়ে হতাশ, শুধু জানটা বের হওয়ার অপেক্ষায়? পর্ণোগ্রাফির নীল সাগরে অবগাহণ করা ওই ছেলেটিরও কি ইসলামের প্রয়োজন নেই? প্রত্যেকের ইসলাম দরকার। হতাশায় জীবন যায় যায় তার ইসলামের আশার দরকার, দরকার তার যে জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলেছে, দরকার তারও যে জীবনের পাসওয়ার্ড হারিয়ে ফেলে ভুল পাসওয়ার্ড দিয়ে দিনগুজার করার ব্যর্থ চেষ্টায় মগ্ন। বনানীতে আত্মহত্যা করার চেষ্টায় ফেইল তারও ইসলাম দরকার। সারাদিন অফিস করে এসে ক্লান্ত জীবনসৈনিকেরও ইসলাম দরকার। খুব দরকার, সত্যিই বলছি খুব দরকার তাঁদের। কিন্তু তাদেরকে জানানো হচ্ছে না, জানতে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তাদেরকে জানাবেটা কে?
আমি, আপনি আর আপনারাই। হ্যাঁ! আমাদেরকেই জানাতে হবে। ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। যেখানে যেখানে সম্ভব যেতে হবে। দাওয়াত মানে শুধু নরম নরম কথা বলা আর কাফেরদের পদলেহন করা না, দাওয়াত মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কাছে একটি আলো এসেছে, সেই আলোকে জাস্ট পৌছিয়ে দেওয়া। এই বার্তাকে পৌছে দেওয়া, তাদেরও একজন রব আছেন, তাঁদের জীবনেরও একটা উদ্দেশ্য আছে, সেই রবের ইবাদাত করাই তাঁদের জীবনের উদ্দেশ্য, তাঁরা যেন হতাশ না হয় আল্লাহ- তাঁদের রব সবকিছু দেখতেছেন, তার কষ্টকেও, কষ্টদাতাকেও, কিন্তু এই কষ্ট চূড়ান্ত না, চূড়ান্ত না সেই জালেমের সুখও, আসল বিচার হবে আখেরাতে, যেই আখেরাত সাজাবে সে সফল, যে পারবে না সে ব্যর্থ, তাঁদের দায়িত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এই ম্যাসেজকে সত্য বলে মেনে নেওয়া, এর উপরই জীবন পরিচালনা করা, এর ব্যতিরেকে কোনোকিছুকেই সত্য না মানা, তার আনুগত্য না করা, সে এরকমটা করবে সেই সফল হলো। এগুলো মানুষকে বুঝাতে হবে। যে বুঝবে সে তো নিজেরই উপকার করলো, যে অস্বীকার করলো, এর সাথে শত্রুতা পোষণ করলো সে তো ব্যর্থ হলো। কিন্তু আমার আপনার কাজ ইসলামকে পৌছে দেওয়া। তাওহীদ কি, ঈমান কি, ইসলাম কি, কুফর কি, শিরক কি এগুলো পরিষ্কারভাবে চিনিয়ে দেওয়াক, এই কথাগুলো পৌছে দেওয়া। কিন্তু আমরা তা না করে আছি ফেসবুকে। আমরা খারাপ কাজ করছি তা না, তবে আমরা অক্ষম হয়ে গেছি। নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগাচ্ছি না। কিন্তু কথা ছিলো নিজের সবটুকু দিয়ে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করা, এই দ্বীনের ম্যাসেজকে পৌছে দেওয়া যারা এই ম্যাসেজ পায়নি, রাসুলুল্লাহর(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু আমরা নিজেরা কম্বলের তলে লুকিয়ে ভাবছি দ্বীন প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে।
মনে করুন আপনার বাবা অসুস্থ, আপনি কি খুব স্বস্তিতে থাকতে পারবেন? দিব্যি ঘুরে বেড়াতে পারবেন? পারবেন না তো? তেমনি ইসলামের প্রতি এই মমত্ববোধ আমাদের থাকতে হবে। তখনই যেয়ে আমাদের অন্তরে ব্যাথা আসবে, মানুষের কাছে ইসলামকে পৌছিয়ে দেওয়া তাড়না আসবে, ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে প্রেরণা আসবে। ইসলামও আজ তার সুস্থ অবস্থায় নেই? তাহলে আমি আপনি সুস্থ আর দিব্যি স্বাভাবিক থাকি কিভাবে? আমি আপনি রাতে ঘুমাই কিভাবে? আমি অলস বসে থাকি কিভাবে? আমি অলস হয়ে ফেসবুক গুতাই কিভাবে? সারাক্ষণ হাসি ঠাট্টা তামাশায় দিন কাটালে কি দ্বীনের উপকার হয়? হয় না তো! তাহলে বসে আছি কেন? বসে থাকবো কেন? বসে থাকবেন না, অলস হবেন না, সজাগ হোন। জেগে উঠুন। ইসলামের মহা নেয়ামতের শুকরিয়াকে পূর্ণ করুন, সম্পূর্ণ করুন, মুকাম্মাল করুন। নিজের সর্বশক্তি ব্যয় করুন আল্লাহর রাস্তায়, একটুও বাকী রাখবেন না, নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় ক্লান্ত করুন।
কলমগুলো চলুক, মস্তিষ্কগুলো সচল হোক, প্রেরণার হরমোনগুলো শিরশির করে উঠুক, অলসতার ধ্বংস হোক! নির্জীবতার নিপাত হোক! আপনার পথ চেয়ে আছে অনেকে! একটু তাকিয়ে দেখুন!
Join the Conversation