বাসা-বাড়িতে বসবাস আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং মানুষের মৌলিক অধিকারও বটে। মুসলিম-অমুসলিম-নির্বিশেষে সবার ঘরবাড়ি প্রয়োজন। নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষ ঘরবাড়ি নির্মাণ করবে- এটাই স্বাভাবিক। ইসলাম এ ক্ষেত্রে কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করেনি; কিন্তু ইসলাম সব মুসলিমের ঘরবাড়ির অভ্যন্তরে অভিন্ন পরিবেশ চেয়েছে। এ বিষয়ে বিশদ বিবরণ রয়েছে কুরআন-সুন্নাহ’তে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاللّهُ جَعَلَ لَكُم مِّن بُيُوتِكُمْ سَكَنًا
আল্লাহ করে দিয়েছেন তোমাদের গৃহকে অবস্থানের জায়গা। [১]
যাপিত জীবনে আমরা হয়ত বাসাবাড়িতে থাকি কিংবা ব্যবসা-বানিজ্য, চাকুরিসহ জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে অবস্থান করি। কিন্তু একজন মুমিন হিসেবে আমাদের বাসাবাড়ি কেমন হওয়া উচিত? কী কী ফ্যাসিলিটি থাকা উচিত? কেমন হলে আমাদের বাসা কিংবা বাড়িটা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শত্রু থেকে নিরাপদ থাকবে পরবো এবং সাথেসাথে গৃহবাসীদের ওপর আল্লাহ তাআলার রহমাত বর্ষিত হবে? এ বিষয়ে কয়েকটি পয়েন্ট আপনাদের জন্য পেশ করছি। দুআ করি আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের প্রত্যেককে আমলের তাওফিক দান করেন। আমিন।
  • ১. একজন মুমিনের বাসা-বাড়িতে ইবাদত, জিকির-আজকার, কুরআন তিলাওয়াত এক কথায় আল্লাহর বিধান পালনের আদর্শ-পরিবেশ বিদ্যমান থাকবে। কেননা, জিকির থেকে বিমুখ বাসা-বাড়িকে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আবু মুসা আল-আশআরি রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لاَ يَذْكُرُهُ مَثَلُ الحَيِّ وَالمَيِّتِ. رواه البخاري. ورواه مسلم فَقَالَ: مَثَلُ البَيْتِ الَّذِي يُذْكَرُ اللهُ فِيهِ، وَالبَيْتِ الَّذِي لاَ يُذْكَرُ اللهُ فِيهِ، مَثَلُ الحَيِّ والمَيِّتِ
যে আল্লাহর যিকির করে আর যে যিকির করে না, উভয়ের উদাহরণ মৃত ও জীবন্ত মানুষের মত। এটি বুখারি রাহি.–এর বর্ণনা। আর মুসলিম রাহি. এটি এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, যে ঘরে আল্লাহর যিকির করা হয় এবং যে ঘরে আল্লাহর যিকির করা হয় না, উভয়ের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের ন্যায়। [২]
অর্থাৎ- যারা আল্লাহর জিকির করে তারা জীবিত আর যারা আল্লাহর জিকির করে না তারা মৃতের মত। কেননা যারা জীবিত তাদের সকল কার্যকলাপ শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্যই হয়ে থাকে, পক্ষান্তরে যারা মৃত্যু তারা কোন কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং জীবিত থেকেও আল্লাহর জিকির করেন না তারা মৃতের মতো।
  • ২. একজন মুমিনের গৃহে অতিঅবশ্যই শারিআহ পালনের পরিবেশ বিদ্যমান থাকবে। বিশেষভাবে সালাত ও হিজাবের উপযোগী পরিবেশ থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي
আমার স্মরণার্থে সালাত কায়িম কর। [৩]
মুআয ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু খুবাইব আল-জুহানীর সূত্রে হিশাম ইবনু সাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
دَخَلْنَا عَلَيْهِ ، فَقَالَ لاِمْرَأَتِهِ: مَتَى يُصَلِّي الصَّبِيُّ؟ فَقَالَتْ: كَانَ رَجُلٌ مِنَّا يَذْكُرُ عَنْ رَسُولِ اللهِ ﷺ أَنَّهُ سُئِلَ عَنْ ذَلِكَ، فَقَالَ: إِذَا عَرَفَ يَمِينَهُ مِنْ شِمَالِهِ، فَمُرُوهُ بِالصَّلاَةِ
আমরা মুআয ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু খুবাইব আল-জুহানীর কাছে গেলাম। এ সময় তিনি তার স্ত্রীকে বললেন, শিশু কখন সলাত আদায় করবে? তার স্ত্রী বললেন, আমাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি এ বিষয়ে উল্লেখ করেন যে, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলছিলেন, শিশু যখন ডান ও বাম (হাতের) পার্থক্য নির্ণয় করতে পারবে তখন তাকে সলাত আদায়ের নির্দেশ দিবে। [৪]
অনুরূপভাবে একজন মুমিনের ঘরে পর্দা ও লজ্জাশীলতার পরিবেশ থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّاَزۡوَاجِکَ وَ بَنٰتِکَ وَ نِسَآءِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ یُدۡنِیۡنَ عَلَیۡهِنَّ مِنۡ جَلَابِیۡبِهِنَّ ؕ ذٰلِکَ اَدۡنٰۤی اَنۡ یُّعۡرَفۡنَ فَلَا یُؤۡذَیۡنَ ؕ وَ کَانَ اللّٰهُ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا.
হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না।আর আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[৫]
উমর রাদি. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিবেদন করলেন,
يَا رَسُولَ اللَّهِ، يَدْخُلُ عَلَيْكَ الْبَرُّ وَالْفَاجِرُ، فَلَوْ أَمَرْتَ أُمَّهَاتِ الْمُؤْمِنِينَ بِالْحِجَابِ. فَأَنْزَلَ اللَّهُ آيَةَ الْحِجَابِ
হে আল্লাহর রাসুল! আপনার স্ত্রীদের কাছে ভালো-মন্দ সব ধরনের লোক আসে। যদি তাদেরকে হিজাবের বিধান দিতেন! এ পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা হিজাবের আয়াত নাযিল করেন। [৬]
হিজাব পালনের দ্বারা উদ্দেশ্য হল, নারীরা যথাসম্ভব ঘরে থাকবে। বিশেষ প্রয়োজনে বের হতে হলে শরীর ও সৌন্দর্য জিলবাব দ্বারা এমনভাবে ঢেকে রাখবে যাতে কোনোভাবেই পরপুরুষের সামনে প্রকাশ না পায়।
  • ৩. একজন মুমিনের বাড়িতে দ্বীনি তালিমের তথা কুরআন–সুন্নাহ, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ–এর আকিদাহ–মানহাজ, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর সিরাহ, মিল্লাতে ইবরাহিম, আল-ওয়ালা ওয়াল বার ও অন্যান্য জরুরিয়াতে দ্বীনের শিক্ষাদানের আদর্শ পরিবেশ বিদ্যমান থাকবে। যেহেতু মানুষের প্রাথমিক শিক্ষাগার ও প্রশিক্ষণ স্থান হলো গৃহ। তাই পিতামাতা যাতে সন্তানদেরকে এবং স্বামী যাতে স্ত্রীকে হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে শেখায় এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে, ইসলাম সেদিকে তাদের দৃষ্টি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا

হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। [৭]
এ আয়াতের অর্থ আলি রাদি. এভাবে করেছেন,
علموا أنفسكم وأهليكم الخير وأدبوهم
তোমরা নিজেরা শেখ এবং পরিবারবর্গকে শেখাও সমস্ত কল্যাণময় রীতি-নীতি এবং তাদের আদব শিক্ষা দাও এবং এসব কাজে অভ্যস্ত করে তোল। [৮]
আলি রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أَدِّبُوا أَوْلاَدَكُمْ عَلَى خِصَالٍ ثَلاَثٍ : عَلَى حُبِّ نَبِيِّكُمْ ، وَحُبِّ أَهْلِ بَيْتِهِ ، وَعَلَى قِرَاءَةِ الْقُرْآنِ ، فَإِنَّ حَمَلَةَ الْقُرْآنِ فِي ظِلِّ اللهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ مَعَ أَنْبِيَائِهِ وَأَصْفِيَائِهِ
তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে তিনটি বিষয়ে শিক্ষা দাও :
  • ক. তোমাদের নবির প্রতি ভালোবাসা।
  • খ. তার পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা এবং গ. কুরআন তিলাওয়াত।

কুরআনের ধারকরা নবি-রাসুল ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সাথে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে থাকবে, যখন তার ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না। [৯]

সাদ ইবনু আবু ওয়াক্কাস রাদি. বলেন,
كنا نعلم أولادنا مغازي رسول الله صلى الله عليه وسلم كما نعلمهم السورة من القرآن
আমরা আমাদের সন্তানদের রাসুলের যুদ্ধের ইতিহাস শিক্ষা দিতাম, যেমনিভাবে তাদেরকে আমরা কুরআনের সুরাহ শিক্ষা দিতাম। [১০]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدۡ کَانَ فِیۡ قَصَصِهِمۡ عِبۡرَۃٌ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ
তাদের বৃত্তান্তে অবশ্যই বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আছে শিক্ষা। [১১]
অর্থাৎ নবিদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য বিশেষ শিক্ষা রয়েছে। এর অর্থ সমস্ত নবীর কাহিনীতেও হতে পারে এবং বিশেষ করে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনীতেও হতে পারে, যা এ সুরাহ’তে বর্ণিত হয়েছে। কেননা, এ ঘটনায় পূর্ণরূপে প্রতিভাত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার অনুগত বান্দাদের কি কি ভাবে সাহায্য ও সমর্থন প্রদান করা হয় এবং কূপ থেকে বের করে রাজসিংহাসনে এবং অপবাদ থেকে মুক্তি দিয়ে উচ্চতম শিখরে কিভাবে পৌছে দেয়া হয়। পক্ষান্তরে চক্রান্ত ও প্রতারণাকারিরা পরিণামে কিরূপ অপমান ও লাঞ্ছনা ভোগ করে। আর যেহেতু আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের জন্য আদর্শ নির্ধারণ করেছেন, তাই তার জীবনীর ভেতর অতি অবশ্যই আমাদের জন্য উত্তম শিক্ষা রয়েছে।
  • ৪. মানুষ থাকলে তার আত্মীয়-স্বজন থাকবে। বাড়িতে মেহমানও আসবে। তাই মেহমানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহে রাখা জরুরি। প্রকৃত মুমিনের বাড়িতে অবশ্যই মেহমানদারির ব্যবস্থা থাকবে। সাথে সাথে আর একটা বিষয়ের প্রতি তাকে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তার দ্বারা তার প্রতিবেশিরা কষ্ট না পায়। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلاَ يُؤْذِ جَارَهُ، وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ
যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। আর যে আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন মেহমানের সম্মান করে। [১২]
  • . মুমিনের গৃহ–বসবাসের ঘর প্রশস্ত ও বড়োসড়ো হওয়া উচিত। তবে অবশ্যই তা সামর্থানুপাতে হবে। কারণ তাতে ইবাদতের জায়গা, হিজাবের সুব্যবস্থা ও মেহমানদারীর সুযোগ থাকতে হবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أربعٌ مِنَ السعادَةِ: المرأةُ الصالِحَةُ، والمسْكَنُ الواسعُ، والجارُ الصالِحُ، والمرْكَبُ الهَنيءُ.
সৌভাগ্যের বিষয় চারটি—সতীসাধ্বী স্ত্রী, প্রশস্ত বাড়ি, সৎকর্মশীল প্রতিবেশী ও আরামদায়ক বাহন। [১৩]
তিনি আরো বলেছেন,
طُوبَى لِمَنْ مَلَكَ لِسَانَهُ، وَوَسِعَهُ بَيْتُهُ، وَبَكَى عَلَى خَطِيئَتِهِ
সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য, যে তার যবান সংযত করতে সক্ষম হয়েছে, বাড়িকে প্রশস্ত করেছে এবং নিজের পাপের জন্য ক্রন্দন করেছে। [১৪]
  • ৬. একজন মুমিন গৃহ নির্মাণে অবশ্যই প্রতিযোগিতা ও অহংকার পরিহার করবে। বাড়িঘর, অট্টালিকা নির্মাণে প্রতিযোগিতা করা কাম্য নয়। জিবরাইল আলাইহিস সালাম কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে প্রশ্ন করলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أَنْ تَلِدَ الْأَمَةُ رَبَّتَهَا وَأَنْ تَرَى الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ الْعَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ

দাসী তার আপন মুনিবকে প্রসব করবে, তুমি আরো দেখতে পাবে- নগ্নপদ বিবস্ত্র হতদরিদ্র মেষ রাখালেরা বড় বড় দালান-কোঠা নিয়ে গর্ব ও অহংকার করবে। [১৫]
  • ৭. একজন মুমিনের বৈশিষ্ট হল, বাড়িতে প্রবেশের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِذَا دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَذَكَرَ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طَعَامِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ لاَ مَبِيتَ لَكُمْ وَلاَ عَشَاءَ. وَإِذَا دَخَلَ فَلَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ قَالَ الشَّيْطَانُ أَدْرَكْتُمُ الْمَبِيتَ. وَإِذَا لَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ عِنْدَ طَعَامِهِ قَالَ أَدْرَكْتُمُ الْمَبِيتَ وَالْعَشَاءَ
কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশকালে ও খাবার গ্রহণকালে আল্লাহর নাম স্মরণ করলে শয়তান (তার সঙ্গীদের) বলে, তোমাদের রাত্রি যাপন ও রাতের আহারের কোনো ব্যবস্থা (এ ঘরে) হলো না; কিন্তু কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশকালে আল্লাহকে স্মরণ না করলে শয়তান বলে, তোমরা রাত্রি যাপনের জায়গা পেয়ে গেলে। আহারের সময় আল্লাহকে স্মরণ না করলে শয়তান বলে, তোমাদের রাতের আহার ও শয্যা গ্রহণের ব্যবস্থা হয়ে গেল। [১৬]
  • ৮. একজন মুমিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِذَا خَرَجَ الرَّجُلُ مِنْ بَيْتِهِ فَقَالَ بِسْمِ اللَّهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللَّهِ.‏ قَالَ ‏يُقَالُ حِينَئِذٍ هُدِيتَ وَكُفِيتَ وَوُقِيتَ فَتَتَنَحَّى لَهُ الشَّيَاطِينُ
যদি কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলে, বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’, তবে তাকে বলা হয়– তুমি হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছ, (আল্লাহ তাআলাই) তোমার জন্য যথেষ্ট, তুমি হিফাজত অবলম্বন করেছ (অনিষ্ট থেকে)। তাতে শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। [১৭]
  • ৯. একজন মুমিন ঘরে প্রবেশকালে সালাম দিবে। কেননা, সালাম দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً
তবে যখন তোমরা কোন ঘরে প্রবেশ করবে তখন তোমরা পরস্পরের প্রতি সালাম করবে অভিবাদনস্বরূপ যা আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্ৰ। [১৮]
এই আয়াতে নিজ গৃহে বা অন্যের গৃহে প্রবেশের কিছু আদব বর্ণনা করা হয়েছে। আর তা হল এই যে, প্রবেশের সময় বাড়ির লোকদেরকে সালাম দেওয়া। মানুষ নিজের স্ত্রী-সন্তানদেরকে সালাম দেওয়া বোঝা বা অপ্রয়োজনীয় মনে করে। কিন্তু ইমানদার ব্যক্তির জন্য জরুরী আল্লাহর আদেশ পালন করে সালাম দেওয়া। নিজের স্ত্রী-সন্তানদেরকে শান্তির দুআ দেওয়া থেকে কেন বঞ্চিত রাখা হবে?
  • ১০. একজন মুমিন শয্যা গ্রহণের সময় দরজা বন্ধ করবে, আগুন (চুলা) নিভিয়ে নিবে ও খাবার পাত্র ঢেকে রাখবে। ঘুমানোর আগে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এজাতীয় কিছু কাজ করতে বলেছেন, প্রত্যেক পরিবারের জন্য তা মেনে চলা জরুরি। কেননা এতে বহু উপকারিতা রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِذَا كَانَ جُنْحُ اللَّيْلِ أَوْ أَمْسَيْتُمْ، فَكُفُّوا صِبْيَانَكُمْ ؛ فَإِنَّ الشَّيَاطِينَ تَنْتَشِرُ حِينَئِذٍ، فَإِذَا ذَهَبَ سَاعَةٌ مِنَ اللَّيْلِ، فَحُلُّوهُمْ، فَأَغْلِقُوا الْأَبْوَابَ، وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ ؛ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَفْتَحُ بَابًا مُغْلَقًا، وَأَوْكُوا قِرَبَكُمْ ، وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ، وَخَمِّرُوا آنِيَتَكُمْ، وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ، وَلَوْ أَنْ تَعْرُضُوا عَلَيْهَا شَيْئًا، وَأَطْفِئُوا مَصَابِيحَكُمْ.
যখন সন্ধ্যা হয়, তখন তোমাদের সন্তানদের ঘরে আটকে রাখো। কেননা এ সময় শয়তানরা ছড়িয়ে পড়ে। তবে রাতের কিছু অংশ অতিক্রম করলে তখন তাদের ছেড়ে দিতে পারো। আর ঘরের দরজা বন্ধ করবে। কেননা শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। আর তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে তোমাদের মশকের মুখ বন্ধ করবে এবং আল্লাহর নাম নিয়ে তোমাদের পাত্রগুলোকে ঢেকে রাখবে, কমপক্ষে পাত্রগুলোর ওপর কোনো বস্তু আড়াআড়ি করে রেখে দিয়ো। আর (শয্যা গ্রহণের সময়) তোমরা তোমাদের প্রদীপগুলো নিভিয়ে দেবে। [১৯]
  • ১১. একজন মুমিনের ঘর বা বাড়িতে ছবি বা মূর্তি থাকতে পারে না। কেননা, সে জানে যে, ছবি-মূর্তি ইসলামে নিষিদ্ধ। তাই এসব থেকে বাড়ি-ঘর মুক্ত রাখা মুমিনের অন্যতম কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لاَ تَدْخُلُ الْمَلاَئِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلاَ صُورَةٌ
যে ঘরে কুকুর ও ছবি থাকে, সে ঘরে (রহমত ও বরকতের) মালাইকা প্রবেশ করে না। [২০]
  • ১২. মুমিনের ঘর অতিঅবশ্যই বাদ্যযন্ত্র মুক্ত থাকবে। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
بَعَثَنِي اللهُ رَحْمَةً وَهُدًى لِلْعَالَمِينَ وَبَعَثَنِي لِمَحْقِ الْمَعَازِفِ وَالْمَزَامِيرِ، وَأَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ
আল্লাহ তাআলা আমাকে মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রাহমাত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন এবং বাদ্যযন্ত্র, ক্রুশ ও জাহিলি প্রথার বিলোপসাধনের নির্দেশ দিয়েছেন। [২১]
  • ১৩. একজন মুমিনের বাড়িতে অপচয়-অপব্যয় থাকতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
كُلُواْ وَاشْرَبُواْ وَلاَ تُسْرِفُواْ إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
তোমরা খাও এবং পান করো; কিন্তু অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। [২২]
মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন।
Join the Conversation
By - আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইমাম ও খতিব, বায়তুল ফালাহ্ জামে মসজিদ, শের-এ বাংলা রোড, খুলনা।