রমাদান উপলক্ষে শক্তি সঞ্চয় করা

খুব দ্রুতই আমরা রমাদান-কে স্বাগত জানাতে চাচ্ছি। মাঝে রয়েছে অল্প কিছু মুহূর্ত। রমাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস। কল্যান লাভের মাস। নেককাজ, ইহসান, ইমান, আনুগত্য, সদাকাহ, তাকওয়া ও কুরআনের মাস। এসবকিছুই একজন মুমিন বান্দার এ মাসের লক্ষ্য উদ্দেশ্য। আর এটা সকলেরই জানা কথা যে, প্রত্যেক লক্ষ্য পূরণের জন্য কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। কিছু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করতে হয় যেগুলো তাকে লক্ষ্য পূরণের সহায়তা করে। যার মাধ্যমে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর তার জন্য সহজ হয়। রমাদানে একজন ব্যক্তির কাঙ্খিত লক্ষ্য হলো এমন সব বিষয় অর্জন করা যা তাকে দুনিয়া-আখেরাতে উপকৃত করবে।

আর এটাও সকলের জানা কথা যে, ওই ব্যক্তি বুদ্ধিমান নয়, যে তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করল না এবং সেও বুদ্ধিমান নয় যে উন্মুক্ত বাজার থেকে নিজের উপকারী এবং অতীব প্রয়োজনীয় বস্তু সংগ্রহ করতে পারল না। সেই সাথে অকল্যাণ থেকেও বেঁচে থাকতে পারলো না।

দুনিয়া এবং আখেরাতের কল্যাণ লাভে আমার আপনার সহায়ক হতে পারে এমন যত বিষয় রয়েছে তার ভিতরে অন্যতম হলো “কুউয়াত” তথা “শক্তি”। “কুউয়াত” (শক্তি) এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ সিফাত, যেই সিফাত দ্বারা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা গুণান্বিত। এবং তার প্রিয় বান্দাদেরকেও তিনি সেই গুণে গুণান্বিত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اِنَّ اللّٰہَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الۡقُوَّۃِ الۡمَتِیۡنُ

‘নিশ্চয় আল্লাহই রিযকদাতা, তিনি শক্তিধর, পরাক্রমশালী।’ —[সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ৫৮]
রানী বিলকিসের সম্প্রদায় নিজেদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এ “কুউয়াত” তথা শক্তির আলোচনা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

قَالُوۡا نَحۡنُ اُولُوۡا قُوَّۃٍ وَّ اُولُوۡا بَاۡسٍ شَدِیۡدٍ ۬ۙ وَّ الۡاَمۡرُ اِلَیۡکِ فَانۡظُرِیۡ مَاذَا تَاۡمُرِیۡنَ

‘তারা বলল, আমরা শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা, আর সিদ্ধান্ত আপনার কাছেই। অতএব চিন্তা করে দেখুন, আপনি কী নির্দেশ দেবেন।’ —[সূরা আন-নামল, আয়াত ৩৩]
আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলদের কাছে যেসব প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছিলেন সেগুলোর ক্ষেত্রেও তিঁনি বলেছেন যে, সেগুলো তোমরা “কুউয়াত” তথা শক্তি দিয়ে গ্রহণ করো। আল্লাহ তাআলা বলেন,

یٰیَحۡیٰی خُذِ الۡکِتٰبَ بِقُوَّۃٍ

‘হে ইয়াহইয়া, তুমি কিতাবটিকে শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধর।’ —[সূরা মারইয়াম, আয়াত ১২]
তিঁনি আরো বলেন,

خُذُوۡا مَاۤ اٰتَیۡنٰکُمۡ بِقُوَّۃٍ وَّ اسۡمَعُوۡا

‘আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি তা শক্তি দিয়ে ধর এবং শোন।’ —[সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৯৩]
.

সুতরাং মুমিনদের উচিত রমাদানের জন্য তাদের শক্তিকে সঞ্চয় করা, যাতে করে তারা রমাদানের যাবতীয় কল্যাণ লাভ করতে পারে অকল্যাণের বিষয় থেকে দূরে থাকতে পারে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ وَفِي كُلٍّ خَيْرٌ احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ واستعن بِاللَّه ولاتعجز وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا وَلَكِنْ قُلْ قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ فَإِنَّ لَوْ تَفْتَحُ عمل الشَّيْطَان.

‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিন হতে অধিক উত্তম ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। তবে প্রত্যেকের মাঝেই কল্যাণ রয়েছে। (কেননা কল্যাণের মূলই হলো ইমান; আর তা কমবেশি উভয়ের মধ্যে মওজুদ আছে)। আর (দীনি) যে কাজে তোমার উপকার হবে, তার প্রতি আগ্রহ রাখো এবং আল্লাহ তাআলার সাহায্য কামনা করো (কিন্তু তা অর্জনে) দুর্বলতা প্রকাশ করো না। যদি তোমার কোন কাজে (চাই তা দীন সম্পর্কীয় হোক বা দুনিয়াবি ব্যাপারে হোক) কিছু ক্ষতি সাধিত হয় তখন তুমি এভাবে বলো না- “যদি আমি কাজটি এভাবে এভাবে করতাম তাহলে আমার এই এই ভালো হত।” বরং বলল, আল্লাহ এটাই ভাগ্যে রেখেছিলেন, আর তিনি যা চান তাই করেন। (لَوْ) তথা “যদি” শব্দটি শয়তানের কাজের পথকে খুলে দেয়।’ —[সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৬৪; ইবনু মাজাহ, হাদিস নং ৭৯]

উপরোল্লেখিত হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মূলনীতি আলোচনা করা হয়েছে :

  • ১. উপকারী বিষয়ের প্রতি আগ্রহ রাখা
  • ২. আল্লাহ তাআলার সাহায্য কামনা করা
  • ৩. তাকদিরের ওপর আপত্তি না করে দৃঢ়বিশ্বাস রাখা
  • আর একজন শক্তিশালী মুমিনের জন্য এর সবটাই খুবই সহজ বিষয়।

এজন্য রমাদানের উদ্দেশ্যে আমাদের শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আসল বিষয় হল শক্তি না থাকলে আপনি পুরো রমাদান সওম রাখবেন কি করে? শক্তি না থাকলে আপনি রাতের বেলায় কিয়াম করবেন কী করে? শক্তি না থাকলে আপনি রমাদানের অন্যান্য নেক আমল বেশি করে করবেন কী করে?

“কুউয়াত” তথা শক্তি দুই প্রকার :

  • ১. ইমানি শক্তি
  • ২. শারিরীক শক্তি

তবে এমন অনেক বয়স্ক লোককে দেখা গেছে যারা ইমানের শক্তিতে বলিয়ান হয়ে পুরো রমাদানে সওম সম্পাদন করেছে এবং কিয়াম করেছে। আবার এমন অনেক যুবককে দেখা গেছে যাদের ইমানের দুর্বলতা কারণে তারা রমাদানে কিয়াম করতে পারে নাই সওমও রাখতে পারে নাই। এজন্য শুধু শারীরিক শক্তি যথেষ্ট নয়; বরং ইমানের শক্তিই মূল বিষয়।

এমন কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো আমার-আপনার “কুউয়াত” তথা শক্তিকে বৃদ্ধি করবে। সেগুলো জানতে হবে এবং মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। আমাদের শক্তিকে বৃদ্ধিকারী অন্যতম তিনটি বিষয় উল্লেখ করছি :

  • ১. দুআ
  • ২. ইসতিগফার
  • ৩. তওবাহ

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَ یٰقَوۡمِ اسۡتَغۡفِرُوۡا رَبَّکُمۡ ثُمَّ تُوۡبُوۡۤا اِلَیۡہِ یُرۡسِلِ السَّمَآءَ عَلَیۡکُمۡ مِّدۡرَارًا وَّ یَزِدۡکُمۡ قُوَّۃً اِلٰی قُوَّتِکُمۡ وَ لَا تَتَوَلَّوۡا مُجۡرِمِیۡنَ

‘হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও অতঃপর তার কাছে তাওবা কর, তাহলে তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের শক্তির সাথে আরো শক্তি বৃদ্ধি করবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে বিমুখ হয়ো না।’ [সূরা হুদ, আয়াত ৫২]

আল্লাহ তাআলা রমাদান উপলক্ষে আমাদেরকে “কুউয়াত” তথা শক্তি সঞ্চয় করার তাওফিক দান করেন।

Join the Conversation
By - আব্দুল্লাহ আল মামুন

ইমাম ও খতিব, বায়তুল ফালাহ্ জামে মসজিদ, শের-এ বাংলা রোড, খুলনা।