এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো যাকে দেখে দ্বীনের পথে হাঁটার জন্য অনেকটা ইন্সপিরেশান পেয়েছিলাম। রেগুলার ফরযের পাশাপাশি নাওয়াফেল আর তাহাজ্জুদ ছিলো তার নিত্যদিনের অভ্যাসের মত। ওর কাছ থেকেই সেই প্রথম আমার গাদি গাদি ইসলামী পিডিএফ বইয়ের সাথে পরিচয়। সেই ছেলে নিজের পরিবারকে পরিবর্তন করে ফেললো আল্লাহর ইচ্ছায়। মা দ্বীনের পথে অনেক এগিয়ে গেলেন, যথাসাধ্য শরয়ী পর্দা করতে শুরু করলেন, উকিল বাবা ও নিজের গ্লিটারিং মুখটাকে লম্বা লম্বা পাকা দাড়িতে ঢেকে ফেললেন। এই কিছুদিন আগেই দুজনে হজ্জ ও করলেন আলহামদুলিল্লাহ। কতই না সাওয়াব পাচ্ছে আমার বন্ধুটা তাই না! কিন্তু! কি যে হলো! সেই বন্ধু এখন নামাযই ঠিক মত পড়ে না, ভার্সিটিতে গেলে ঠিকঠাক মত চোখের পর্দা করতে পারেনা মোদ্দাকথা আমার ইন্সপিরেশানকে আমি হারিয়েছি। কিন্তু কেন? কি এমন হলো তার জীবনে? আমি আসলে ভালমত জানি না ঠিক কি কারনে এমনটা হলো। কিন্তু যতদূর মনে পড়ে গুলশানের হামলার পরে সে দাড়ি কাটতে বাধ্য হয় পরিবারের চাপে, বাসায় যেই যেই বইতে জিহাদ নামের শব্দটা ও ছিলো সেই বইকে বিক্রি ও করে দেয়। এমনকি সে আমাকে একবার বলেছিলো সে নামায কিভাবে ছেড়ে দেওয়ার মত পর্যায়ে আসলো, কারন সে নাকি মাঝে মাঝে অলসতার কারনে নামাযের নফল-সুন্নাত ছেড়ে দিত। যাই হোক হয়ত আগে পরে অনেক কারন থাকতে পারে আমি সঠিক জানি না। কিন্তু এটা ঠিক যে আমি আমার সেই আগের বন্ধু যে রেগুলার ১৫ মিনিট হেটে তার পছন্দের মসজিদে নামায পড়তে আসত, এই সাইট সেই সাইট থেকে ওই বই সেই কিতাব ডাউনলোড করে আমাকে দিত সেই বন্ধুকে আমি হারিয়েছি। আল্লাহ আমার ইন্সপিরেশানকে আবার আমার কাছে ফিরিয়ে দেন যাতে আবার বারবার তাকে দেখে আমি ইন্সপাইরড হতে পারি। আমীন।
কিন্তু শয়তানের পদক্ষেপগুলো না এমনই সূক্ষ্ণ ও শাতিরানা (চালাকিতে ভরপুর)। ছোট ছোট পদক্ষেপ নিয়েই সে সামনে আসে। বন্ধুর মুখোশ নিয়ে সামনে এসে পিঠে ঠিকই ছুরি গুঁজে দিয়ে যায়। আজকে দ্বীনের বুঝ আসতে শুরু করার মুহুর্তে এই ওয়াসওয়াসা, কালকে ওই গুনাহের স্মৃতি মনে করানো, পরশু লম্বা চুলের মেয়েটার সেই হেয়ার স্প্রের ঘ্রান মনে করিয়ে দেয়, আবার আরেকদিন সেই মান্ধাতার আমলে শুনা কোনো গানের অন্তরাটা ধরিয়ে দেয়। এত কিছুর পরে ও দ্বীনের প্রতি ইস্তিকামাতের কারনে কিন্তু শয়তান সাহেব হতাশ হয়ে চলে যান না দিনের পর দিন এভাবে ওভাবে বারবার নানা রঙে তিনি আসতেই থাকেন। কখনো রাগ হয়ে, কখনো আড়ালে থেকে, কখনো বন্ধুর রুপ ধরে, কখনো একটু আরামের রুপ ধরে, কখনো ‘কালকে করবো’ কথার মাধ্যমে, কখনো আরেকটু ঘুমাই এই বুলি শুনিয়ে সে আসতেই থাকে। আগে ছেলে পাঞ্জাবী পরত সাথে টুপি মাথায় দিতো, ফেবুতে বায়তুল মাকদিস বিজয়ের স্বপ্ন দেখাত, কোনোদিন সুন্দর সুন্দর পোস্ট দিয়ে আমার মত অভাগাদের মনে আরেকটু সাহসের সঞ্চার করত, কখনো বা উম্মাহর মা-বোনদের প্রতিশোধ না নিতে পারার ক্রোধ অন্তর বেয়ে ভার্চুয়াল জগতে চলে আসতে, আগে উম্মাহর কে কোথায় কেমন আছে তা জানা যেত তার শেয়ার করা বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে। আর এখন সেই ছেলের ওয়ালে বঙ্গবন্ধুর মহত্ত্ব নিয়ে পোস্ট শেয়ার দেখা যায়, মাঝে মাঝে কোনো বিদেশি পশ্চিমা লেখকের বানী তার ওয়ালে আসন পেতে বসে, কখনো চকচকে রঙের শার্ট প্যান্টে টাক করার ছবি, এদিক থেকে ওদিকে গড়িয়ে যাওয়া কেশের ছবি ও পাওয়া যাচ্ছে। যেই লোক ঘন্টায় ঘন্টায় বিভিন্ন আলেমদের উক্তি পোস্ট দিতো এখন সে কেন জানি হতাশাবাদীদের মত কেমন অন্তর জ্বলগায়া টাইপের পোস্ট দেয়। আজন্ম দাড়িওয়ালা আংকেলকে যখন চকচকে গালে দেখি অন্তর সত্যিই কেপে ওঠে।
শয়তান আসলেই খুব ট্রিকি। পাঞ্জাবী জুব্বা ধরার পরে ওই শার্টের রঙটা ভালো লাগিয়ে দেওয়ার মধ্যে কিভাবে যে নিজের মিশনে জিতবে বলা মুশকিল। ‘আরে ক্যাপটা তো দারুন!’ বললেন নাকি শয়তান আপনার অন্তরে একটা জায়গা করে নিলো তা বলাটা কঠিন। ‘টুপিটা ফেলে এসেছি, যেয়ে নিয়ে আসবো? নাহ থাক টুপি কি আর ফরয নাকি?’ আজকে টুপিকে ফরয বলছেন না কালকে যদি দাড়িকে ওয়াজিব না বলেন তবে কি হবে? আগে ফজরের পরে মসজিদে বসে থেকে ইশরাক চাশত পড়ে বের হতাম এখন আর পারি না তাই বলে ফেলি ‘এটা তো মুস্তাহাব নামায’ কি জানি কালকে মুস্তাহাব থেকে সুন্নাতে টানাটানি হয় কিনা! ২ মাস আগে শার্ট পরতাম এখন ‘গরম তো তাই শার্ট-গেঞ্জি পরি’। আগে চোখের সুরমা দিতুম, সেদিন কোন বন্ধু আমাকে দেখে সারা ক্লাস ‘হাফলেডিস হাফলেডিস’ বলে ক্ষেপিয়েছে এভাবেই সিদ্ধান্ত নিলুম নো সুরমা ইন মাই আই। দাড়ি রাখতাম এখন ‘বিদেশে যাবো তো ভাই, এই পাসপোর্টটা হাতে পেলেই আবার দাড়ি ছেড়ে দিবো’ আগে কুরআন ১ পারা করে পড়তাম ‘এখন কেন জানি পড়া হচ্ছে না’। এভাবে দ্বীনের নফল-মুস্তাহাব-মুবাহ-সুন্নাতে আমরা নানা অযুহাতে ছাড় দিয়ে যাচ্ছি। এভাবেই শয়তান আমাদের অন্তরে নিজের প্রভাব প্রতিপত্তির রাজত্ব বসিয়ে ফেলছে (আউযুবিল্লাহ) কিন্তু আমাদের বুঝা উচিত মানুষের অন্তর পাকা মেঝে না ২০ বছর আগে পরের মধ্যে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। মানুষের অন্তর তো বেজায় উদ্বায়ী। সারাক্ষন উদাম গায়ে ছুটোছুটি করতে পারলেই উনার শান্তি। একেবারে ‘একদন্ড ও বসে না স্থিরভাবে’ সেই বাচ্চাটার মত। হেদায়েত খুব কঠিন জিনিস একে ধরে রাখতে হলে হিম্মত চাই, ধৈর্য চাই, দাঁতে দাঁত চেপে পার করার মত দৃঢ় মনোবল চাই। হেদায়েত একবার পেলে খুব শক্তভাবে ধরে থাকতে হয়। হেদায়েতের রশি বেয়ে দিন দিন উন্নতির চরম সীমায় পৌছানোই কর্তব্য। হেদায়েত পেয়ে গেলে এমনিতেই অন্তর খুব সেন্সিটিভ হয়ে যায়। ভার্সিটির বন্ধুর জন্য যেই কথা বলা দক্ষিন হাত দিয়ে কাচামরিচ ডলে ভাত খাওয়ার মত সহজ সেই কথা মুখ দিয়ে উচ্চারনের চেয়ে আকাশ ভেঙ্গে পড়া আরো ভালো মনে হয় আপনার কাছে। পাহাড়ের উপর চড়লে আস্তে আস্তে চড়া যায় কিন্তু সেখান থেকে বেখেয়ালে পড়ে গেলে একেবারে সিধা পড়তে হয় সময় লাগে না তেমন। তেমনি হেদায়েত পাওয়ার পরে ঈমান ও আমলের বৃদ্ধির মাধ্যমে হেদায়েতকে বৃদ্ধি করতে হয়। তা না হলে চিরশত্রু শয়তান তার জায়গা অন্তরে করে নিবে আস্তে। আগে যেই পাপের কথা মনে উঠলে গা ঘিন ঘিন করতো সেই পাপের দিকেই এখন মন টানে এমন হওয়াটা ও আশ্চর্যজনক নয়। (আল্লাহ মাফ করুন)। আজকে দাড়ি ছাটবেন কাল কিভাবে যে দ্বীন ছেটে নিবে তার ঠিকঠিকানা নাই। আজকে ছোট ছোট শয়তানের পদক্ষেপ অনুসরন করলে সে আমাকে ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে ছাড়বে। তাই শয়তানের পদক্ষেপ থেকে সাবধান এবং বেশি বেশি ইস্তিকামাতের দুয়া করতে থাকা চাই।
হে আল্লাহ! আমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয়তম করে দিন, কুফর, পাপাচার ও নাফরমানীকে অন্তরে ঘৃন্য করে তুলুন এবং আমাদেরকে হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন।
Join the Conversation