সালাম সম্পর্কিত খুঁটিনাটি

মূলপাতা > সালাম সম্পর্কিত খুঁটিনাটি

কোন ক্ষেত্রে আগে সালাম দেওয়া ফকিহগণ মাকরূহ বলেছে
[শেষের নোটটি ভালো করে পড়ুন]

حديث أبي هريرة – رضي الله عنه – قال: قال رسول الله – صلى الله عليه وسلم -: ((لا تدخلون الجنة حتى تؤمنوا، ولا تؤمنوا حتَّى تَحابُّوا، أولا أدُلُّكم على شيء إذا فعلْتُمُوهُ تَحابَبْتُم؟ أفشوا السَّلامَ بيْنَكُم))

অর্থঃ আবু হুরায়রাহ(রাদি) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যতক্ষণ না মু’মিন হতে পারবে ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। যতক্ষণ না পরস্পর এক অন্যকে ভালোবাসবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা মু’মিন হতে পারবে না। আমি তোমাদেরকে কি সে বিষয়ে বলব না, যা করলে তোমরা এক-অন্যকে ভালোবাসতে পারবে? তোমাদের মাঝে সালামের প্রসার ঘটাও।
[সহিহ মুসলিমঃ ৫৪ নং হাদিস]
এই হাদিসের আলোকে বুঝা যায় আমাদের উচিত বেশি বেশি সকল অবস্থায় সালাম দেওয়া। কিন্তু ফুকাহেকেরাম কিছু ক্ষেত্রে সালাম দেওয়াকে মাকরূহ বলেছেন।
ফুকাহেকেরাম কিছু ক্ষেত্রে সালাম দেওয়া মাকরূহ বলেছেনঃ
  • বাথরুমে থাকা ব্যক্তিকে। চাই পেশাব করুক বা পায়খানা।
  • খাবার মুখে থাকা ব্যক্তিকে।
  • কুরআন তিলওয়াতকারী ব্যক্তিকে।
  • যিকিরকারী ব্যক্তিকে।
  • হাদিস বর্ণনাকারী ব্যক্তিকে।
  • খতিব সাহেবকে খুতবার সময়।
  • মুয়াজ্জিন আযান দেওয়ার সময়।
  • বিচারককে বিচার করার সময়।
  • ওয়াজকারীকে ওয়ায করার সময়।
  • কোরআন- হাদিস-ফেকাহ ও দীনি বক্তব্য শোনা ব্যক্তিকে
  • নামাজরত ব্যক্তিকে
  • লেনদেন বা চুক্তি রত ব্যক্তিদেরকে
  • ইত্যাদি ইত্যদি এভাবে দীনি বা দুনিয়াবি যেকোন কাজে মশগুল ব্যক্তিকে যাকে সালাম দিলে তার জন্য উত্তর দেওয়া কষ্টকর হয়, এমন ব্যক্তি ব্যক্তিকে সালাম করা মাকরূহ।

[মিনহাজ আল সহিহ মুসলিমঃ১/২৫১,ফেকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহুঃ ৪/২৬৮৫, মাওসুয়াতুল ফিকহিল কুয়েতিয়াঃ ২৫/১৬৪-১৬৫, মুগনীঃ ১/১৫৭, ফাতহুল কদিরঃ ১/১৭৩, ফাতাওয়ে শামীঃ ১/৬৬৬,ফাতাওয়ে আলমগীরিঃ৫/৩২৫, আযকারঃ ৪০১-৪০২।]

এমন অবস্থায় যদি কেউ সালাম দিয়ে ফেলে , তবে সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব নয়। বরং মুস্তাহাবা। কেননা , হাদিসে এসেছে

رُوِيَ عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا. أَنَّ رَجُلاً مَرَّ وَرَسُول اللَّهِ
صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – يَبُول، فَسَلَّمَ فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ
অর্থঃ ইবনে উমার(রাদি) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম পেশাব করা অবস্থায় এক ব্যক্তি পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে তিনাকে সালাম দেয়, কিন্তু তিনি উত্তর দেয়নি।
[সহিহ মুসলিমঃ ১/২৮১]
وَمَا رُوِيَ عَنْ جَابِرٍ – رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ – أَنَّ رَجُلاً مَرَّ وَرَسُول اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – يَبُول، فَسَلَّمَ عَلَيْهِ فَقَال النَّبِيُّ – صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – إِذَا رَأَيْتَنِي عَلَى مِثْل هَذِهِ الْحَال فَلاَ تُسَلِّمْ عَلَيَّ. فَإِنَّكَ إِنْ فَعَلْتَ ذَلِكَ لَمْ أَرُدَّ عَلَيْكَ
অর্থঃ জাবের (রাদি) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেশাব করা কালীন একব্যক্তি পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে তিনাকে সালাম দেয়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলেন, যখন তুমি আমাকে এ ধরনের অবস্থায় দেখবে ,তখন সালাম দিবে না। যদি সালাম দেও , তবে আমি উত্তর দিব না।
[ইবনে মা’জাঃ১/১২৬]
নোটঃ এ হাদিসের উপর ভিত্তি করে অনেকে বলে থাকেন , যেসকল স্থানে সালাম দেওয়া মাকরূহ সেসকল স্থানে উত্তর দেওয়া ওয়াজিব নয়।
শেষের নোটঃ উপরে আমরা কিছু ক্ষেত্রে সালাম দেওয়া মাকরূহ হওয়ার বিষয়টি দেখতে পেলাম। অনেক ক্ষেত্রে দলিলের আলোকে মাকরূহ হওয়ার দিকটি প্রমাণিত। যেমন পেশাব করা অবস্থায় । আর অনেক ক্ষেত্রে ইজতেহাদি। যেমন খাবার খাওয়া ইত্যাদি। আমরা যদি মানুষের সকল প্রয়োজন ধরে সালাম দিবো কি দিবো বিষয়টি বিবেচনা করে সালাম দিতে চাই , তবে সালামের প্রচার ও প্রসার সম্ভব হবে কিনা সে ব্যাপারে আল্লামা ইবনে দাকিকুল ঈদ(রাহি) বলেন,
بِأَنَّ النَّاسَ غَالِبًا يَكُونُونَ فِي أَشْغَالِهِمْ فَلَوْ رُوعِيَ ذَلِكَ لَمْ يَحْصُلِ امْتِثَالُ الإفشاء
অর্থঃ মানুষরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের কাজে ব্যাস্ত থাকে। যদি তাঁদের ব্যস্ততার প্রতি লক্ষ্য রেখে সালাম দেওয়া হয়, তবে সালামের প্রাসার সাধনের আদেশ পালনে ব্যাহত হবে।
[ফাতহুল বারীঃ ১১/১৯ ]
এ জন্য পেশাব করা ব্যক্তিকে ও সালাতরত ব্যক্তিকে(হাম্বালীদের মতে নামাজ পড়া ব্যক্তিকে সালাম করা যায়) ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি সালাম করাতে কোন সমস্যা নেই।
এদিকে তাকিয়ে “ইসলামি ওয়েব” বলেছে,
ولكن ما دام هؤلاء لم يذكروا دليلاً على ما قالوا: فإننا نستصحب الأصل وهو: مشروعية ابتداء السلام والرد على من سلم. فالابتداء بالسلام سنة، والرد على من سلَّم واجب، ويستوي في ذلك الآكل وغيره، حتى يرد دليل مخصص لهذا الأصل العام.
هذا هو الذي نراه، وعليه فلا بأس بالسلام على الآكل، وإذا سلم عليه رد كما يرد غيره
অর্থঃ যতক্ষণ তাঁদের বর্ণনা করার কথার দলিল উল্লেখ না করবে,(উপরে যেসব স্থানে সালাম দেওয়া মাকরূহ বলা হয়েছে সেসব স্থানে সালাম দেওয়া মাকরূহ এর দলিল) ততক্ষণ আমরা মূলনীতির উপর থাকব যে, প্রথমে সালাম দেওয়া এবং উত্তর দেওয়া বৈধ। এবং প্রথমে সালাম দেওয়া সুন্নাহ ও সালামকৃত ব্যক্তির জন্য উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। এক্ষেত্রে আহারকারী ও অন্যরাও সমান, যতক্ষণ না এসব ক্ষেত্রে সালাম দেওয়া নিষেধে বা মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে বিশেষ দলিল বর্ণিত না হবে। এই মূলনীতির ভিত্তিতে আমরা মনে করি, খাবার গ্রহণকারী ব্যক্তিকে সালাম দেওয়া এবং সে অন্যান্য ব্যক্তি যেমন সালামের উত্তর দিয়ে থাকে তাঁদের মতো সালামের উত্তর দেওয়াতে কোন সমস্যা নেই।
[ইসলামি ওয়েবঃ ফাতাওয়া নংঃ ১৪৯০৪]
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
অনেকে বলে , সে ব্যাস্ত আছে। আমি যদি সালাম দিয়, তবে হয়ত সে উত্তর দিবে না, এতে তো সে আমার জন্য গুনাহগার হয়ে যাবে?
উত্তরঃ আল্লামা ইবনে হাজর(রাহি) ফাতহুল বারিতে এ প্রশ্নের উত্তরে লেখেন,
عَن بن عَبَّاسٍ وَمِنْ طَرِيقِ كُلٍّ مِنْ عَلْقَمَةَ وَعَطَاءٍ وَمُجَاهِدٍ نَحْوَهُ وَيَدْخُلُ فِيهِ مَنْ مَرَّ عَلَى مَنْ ظَنَّ أَنَّهُ إِذَا سَلَّمَ عَلَيْهِ لَا يَرُدُّ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ يُشْرَعُ لَهُ السَّلَامُ وَلَا يتْركهُ لهَذَا الظَّن لِأَنَّهُ قد يخطىء
قَالَ النَّوَوِيُّ وَأَمَّا قَوْلُ مَنْ لَا تَحْقِيقَ عِنْدَهُ أَنَّ ذَلِكَ يَكُونُ سَبَبًا لِتَأْثِيمِ الْآخَرِ فَهُوَ غَبَاوَةٌ لِأَنَّ الْمَأْمُورَاتِ الشَّرْعِيَّةَ لَا تُتْرَكُ بِمِثْلِ هَذَا
অর্থঃ আল্লামা তবারী(রাহি) তিনি আলকামা, আতা, মুজাহিদ ও অন্যদের সূত্রে ইবনে আব্বাস (রাদি) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যদি কোন ব্যক্তি এমন কোন ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যে, তার ধারণা হয় , যদি আমি তাকে সালাম করি , তবে সে আমার সালামের উত্তর দিবে না। তার জন্য সালাম দেওয়া জায়েজ আছে। এই ধারণার কারণে সালাম দেওয়া থেকে বিরত থাকবে না। কেননা, কখনও কখনও এমন ধারণা ভুল হয়।
ইমাম নববী(রাহি) বলেছেন, যার নিকট এই মাসালার তাহকিক নেই ,তার কথা, (কোন ব্যক্তি সালাম দিবে না, জেনে তাকে সালাম দেওয়া তে) তো অন্য ব্যক্তিকে গোনাহগার বানানোর কারণ হয়ে যায়, এটা বোকামিমূলক কথা। কেননা, শরিয়তের আদিষ্ট বিষয় এরকম কোন ধারণার কারণে ছেড়ে দেওয়া (বিধি সম্মত নয়)।
[ফাতহুল বারীঃ ১১/২০]