ইসলামি অঙ্গনে লিখালিখি নিয়ে টুকটাক (দ্বিতীয় পর্ব)

  • ৬) ইলম জনমানুষের সামনে পৌঁছানোর একটা পদ্ধতি আছে যেটা আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এটার একটা হল প্রত্যেক কওমের কাছে এমন রাসূল/নবী পাঠানো যিনি তাঁদের ভাষায় তাঁদের সামনে তাওহীদ এবং হাক্ক-বাতিলকে তুলে ধরবেন। এই দিকটা থেকে আমাদের জনমানুষের উপযোগী ভাষায় , তাদের বুঝের সাথে মিলে যায় এমন ভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।
    আরেকটি হল দাওয়াতের বিষয়বস্ত। প্রথমে তাওহীদ, ঈমান, আকীদা, ওয়ালা ওয়াল বারাহ… এই বিষয়গুলো। আল্লাহর ইবাদাত ও তাগুত বর্জন।
    আমাদের ভাই বেরাদারদের লিখায় এই দ্বিতীয় বিষয়টি নাই। মানে আল্লাহর ইবাদাত ও তাগূত বর্জন। তারা গল্পে গল্পে একটা সহজ ইসলাম প্রচার করে। কিন্তু সেটাতে বেসিক আকিদার বিষয় ঠিক নাই। শুধু একটা সুগারকোটেড ভার্সন আছে। এই কারণে মিম্বার গ্রুপে স্যানিটারি প্যাড বানানো নিয়ে পোস্ট হয় । এবং লেখক, পাঠক , গ্রুপ এডমিন কেউই বোঝেনা কেন এই পোস্টটা এরকম একটা মিক্সড গ্রুপে এপ্রুভ করা সমস্যা । একই গ্রুপে পোস্ট হয় যে মসজিদ ভাঙ্গার মাধ্যমে যদি অনেক মানুষ দ্বীনে আসে তাহলে মসজিদ ভাঙ্গা ভালো।
    আবার রৌদ্রময়ীরা তাদের বিরুদ্ধে বলার কারণে তাগুতের কাছে নালিশ দেবার কথা বলে।
    কাজেই যারা এই সহজীয় ইসলাম প্রচার করছে তারা নিজেরা না ইসলামের বেসিকস বুঝেছে আর যারা পড়েছে না তারা বুঝছে।আর আমরা অনেক তৃপ্ত হয়ে যাচ্ছি যে দাওয়াহ অনেক প্রসারিত হচ্ছে। দ্বীনের সঠিক বুঝ, সঠিক আকীদা আর ভিত্তির ওপর মানুষ না দাঁড়ালে সেটা আসলে কোনো ইফেক্টিভ দাওয়া হয় না।
    এর পাশাপাশি সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স এর একটা ব্যাপার চলে আসে। এটা বেশ সিরিয়াস ইস্যু। খুব সিরিয়াস। আমাদের অনেক ভাইবেরাদার লিখতে লিখতে নিজেদের অথোরিটি ভাবা শুরু করছেন। উনারা যাই বলেন সেটাই দ্বীনের একমাত্র এবং শেষ কথা। এর বাহিরে আর কিছু নাই। থাকতে পারেনা। আর সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হল এসব লেখক ভাই বেরাদারদের পাঠকরাও তাদের অথোরিটি ভাবা শুরু করেছেন।
  • ৭) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সময় কম দেওয়া হয়।এই বিষয়টা আমার মধ্যে একসময় প্রবল পরিমাণে ছিল। ভাবতাম এমন সাহিত্য করব যে পাঠক এই সাহিত্য পড়েই তব্দা খেয়ে যাবে। আমার লিখা হাজারে হাজারে শেয়ার হবে।এই ভাবনা থেকে লিখায় অলংকার, ভাষাজ্ঞান ইত্যাদি শিখার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেক টাইম গিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ করতে পারিনি। অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল সময় ছিল সব হেলায় হারাইছি। লাভটা কী হইছে … আমি হয়তো আকাশ নীল রঙের এভাবে সাদামাটা ভাবে আকাশের বর্ণনা না দিয়ে বিভিন্ন উপমা দিয়ে ছাইপাশ চাপা মেরে আকাশের বর্ণনা দিলাম। পাঠক পড়ে মুগ্ধ হইলো। আমার প্রসংশা করল। ছেলেটাতো দারুণ লিখে… ব্যাস এ পর্যন্তই। কিন্তু আমি যদি একটু কম সময় এখানে দিতাম তাহলে অবহেলিত মৌলিক অনেক ফরজ কাজ করতে পারতাম। আমরা আসলে দিনশেষে নফসের গোলাম।আমি সাহিত্য সাহিত্য করছি কেন?
    ইসলামের খেদমত করার জন্য।যেন মানুষ বেশি বেশি বই পড়ে।
    কিন্তু আমি যদি সাহিত্য করতে গিয়ে কম সময় দিতাম তাহলে এই সময়টা অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগাতে পারতাম।উম্মাহ আরো উপকৃত হত। আরো বেশি খেদমত করতে পারতাম। কিন্তু আমি সেটা করিনি। কেন? কারণ আমার ভালো লাগেনা।আমার ভালো লাগে জীবনানন্দ, রবি ঠাকুর, নজরুল হইতে। আমার নফস চাই তাই আমি করি। কোন কাজটা করলে দ্বীনের বেশি খেদমত হবে সেটা ভাবার সময় আমার নাই। আমি চাই নফসকে তুষ্ট করতে।

    দিনশেষে সেই একই আয়াতটাই ঘুরে ফিরে আসে

    তোমাদের ওপর জি*হা*দ ফরজ করা হয়েছে। যদিও তা তোমাদের কাছে অপছন্দ; কিন্তু তোমরা যা পছন্দ কর না, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং তোমরা যা পছন্দ কর, সম্ভবতঃ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। [সূরা আল বাকারাহ,২ঃ২১৬]

     

    ভাইয়েরা দেখুন, আমি কিছুটা কড়া কড়া কথা বলেছি এই পোস্টে। এরকম পোস্ট আমার সাথে আসলে যায়না। আমি আসলেই কিছুটা নরম প্রকৃতির মানুষ ( এ কারণেই

    কাশগড়-কতো না অশ্রুজল

    বইটা লিখতে আমাকে বেশি কষ্ট করা লাগছে বোধহয়) কিন্তু ইসলাম প্রিয় ভাইদের এমন অবস্থা দেখে নিজেকে স্থির রাখা একটু কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।
    সাহিত্যচর্চার নামে কোথায় চলেছি আমরা? লিখাকে সাহিত্যমানে উন্নীত করার জন্য কার পদক্ষেপ অনুসরণ করছি আমরা?

    ভাই দেখেন, আমাদের লক্ষ্য হল ইসলাম প্রচার করা। মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া। সাহিত্যচর্চা করা না। লিখার সাহিত্যমান ইসলামের খেদমত করার একটা টুল। সাহিত্যে বিপ্লব ঘটানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের দরকার মানুষকে ইসলামের দিকে নিয়ে আসা। আর এজন্য আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হচ্ছে ইখলাস। আমাদের লিখায় যদি ইখলাস না থাকে তাহলে যতোই সাহিত্যের মোড়কে মুড়িয়ে লিখালিখি করুন না কেন, তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাবেনা। আপনি সাহিত্যে নোবেল পেয়ে যেতে পারেন কিন্তু মানুষের হৃদয়ে ইসলামের দাওয়ার পৌঁছাতে পারবেন না যদি আপনার লিখায় ইখলাস না থাকে। যদি আপনি লিখাগুলোর আমল না করেন।

    বাজারে খুব কাটতি হয়তো হবে বইগুলোর, কিন্তু মানুষের অন্তরকে খুব বেশী প্রভাবিত করবেনা।

    …অতএব, ফেনা তো শুকিয়ে খতম হয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ এমনিভাবে দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন”। [ সূরারাদ,১৩: ১৭]

     

    তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ তা’আলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেনঃ পবিত্রবাক্য হলো পবিত্র বৃক্ষের মত। তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আকাশে উত্থিত।সে পালনকর্তার নির্দেশে অহরহ ফল দান করে। আল্লাহ মানুষের জন্যে দৃষ্টান্ত বর্ণণা করেন- যাতে তারা চিন্তা- ভাবনা করে।এবং নোংরা বাক্যের উদাহরণ হলো নোংরা বৃক্ষ। একে মাটির উপর থেকে উপড়ে নেয়া হয়েছে। এর কোন স্থিতি নেই”। [সূরা ইব্রাহীম,১৪: ২৪- ২৬]

    আসুন আমরা সাহিত্যচর্চার নামে বাড়াবাড়িতে লাগাম পড়াই। সাহিত্যের জন্য সেকুল্যারদের বইপত্র গুলে খেতে হবে এমন কথা নেই। ইসলামিক ঘরণার বইপত্র পড়েই জুতসই কাজ করা যাবে ইনশা আল্লাহ। আমার কিছু সাজেশনসঃ

  • এসো কলম মেরামত করি
  • ফররুখ আহমাদের কবিতা
  • আল মাহমুদের ইসলামিক কবিতা
  • ড. ইয়াদ আল কুনাইবির লিখা। মাস্ট রিড তালিকায় এটা রাখতেই হবে দুইটা কারণে। প্রথমত টপিক সিলেকশন। উনি যদিও ইজাযাহ বা অনুমতিপ্রাপ্ত একজন কিন্তু উনি বেশি ইলমি আলোচনা করেন না। উনার যোগ্যতা থাকার পরেও উনি সেটা আলিমদের জন্য রেখে দেন। উনি এমন টপিক বেছে নেন যেগুলো উম্মতের জন্য জরুরী। আমার লিখতে ভালো লাগে, পাঠকের পড়তে ভালো লাগে, কোনো ট্রেন্ডি টপিক, লিখলে বেশি লাইক কমেন্ট শেয়ার পাওয়া যায় এই টাইপের টপিক না। বরং এমন টপিক যেটা আসলেই উম্মতের কাজে লাগবে। দ্বিতীয়তঃ উপস্থাপনা। উনি খুব সহজভাবে উপস্থাপন করেন। সাহিত্যমান থাকা না থাকা মূল ইস্যু না। মূল ইস্যু হল পাঠক লিখাটা উপলব্ধি বা আত্মস্থ করতে পারলেন কিনা। এটা উনার মধ্যে থাকে। ঠিক একই কারণে জাভেদ কায়সার ভাইয়ের #অনেক_আঁধার_পেরিয়ে বইটাও পড়া দরকার।
  • সাইয়্যেদ আবুল হাসান নাদভী রহিমাহুল্লার বইগুলা। দেখুন উনার টপিক সিলেকশন কতোটা চমৎকার এবং যুগের দাবী ছিল।
  • শায়খ আনোয়ার আ৳ আ*%কি রহিমাহুল্লাহর লিখা, লেকচার। ভালোভাবে লক্ষ্য করুন উনি কীভাবে খুব সাধারণ আম টপিক নিয়ে আলোচনা করে মানুষকে মৌলিক বিষয়গুলো বুঝিয়েছেন।
  • শায়খ আলি তামিমি। উনার কাছ থেকে শিখুন কীভাবে ইতিহাস এবং আকীদার ওপর জোর দিতে হয়।
  • শায়খ আহমাদ মুসা জিবরিল। উনার আলোচনাগুলো ইলমি। তবে এই ইলমি আলোচনাগুলো শোনা লেখকদের জন্য খুবই দরকারী।
  • আমাদেরই একজন আপনা লোক আসিফ আদনান। আমার মনে হয়েছে উনার লিখাগুলো আমাদের সবারই খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়া দরকার। ভালোভাবে দেখুন চিন্তাপরাধ বইয়ের লিখাগুলো কীভাবে স্ট্রাকচারড করা হয়েছে।
  • শ্বেত সন্ত্রাস, সহস্র সূর্যের চেয়ে উজ্জ্বল, পাঠক সাবধান! ভয়ের জগতে পবেশ করছো তুমি … এই আর্টিকেলগুলো ভালোমতো পড়ুন। দেখুন, কীভাবে পাঠককে গল্পে টেনে ধরে রাখতে হয়, কীভাবে শুরু করতে হয়,কীভাবে শেষ করতে হয়। মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। কাশগড়-কতো না অশ্রুজলড় কতো-না অশ্রুজল লিখার সময় রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে এই আর্টিকেলগুলো মাথায় রাখার চেষ্টা করেছিলাম সবসময়। (ভাইয়ের প্রবল আপত্তি ছিল উনার নাম এই লিস্টে দেবার ব্যাপারে।আল্লাহ ভাইকে রিয়ামুক্ত থেকে ইখলাসের সাথে কাজ করার তৌফিক দিক। আমি মনে করি আসিফ আদনানের মূল্যায়ন এখনো এদেশে ঠিকমতো হচ্ছেনা। আজ থেকে কয়েকবছর পর হয়তো আসিফ আদনান পাঠের গুরুত্ব আরো অনেক বেশি স্পষ্ট হবে)
  • আরবি বা উর্দু বইপত্র আছে অনেক নিশ্চয়ই। তবে আমার কোনো আয়ডিয়া নাই।
  • শেষ করব খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা পয়েন্টে আলোচনা করে। লেখকদের তাদের লিমিট জানা উচিত। টপিক সিলেকশনে খুবই খুবই কৌশলী হতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে কোনগুলো মূল বিষয় আর কোনগুলো সেকেন্ডারি। আমি যদি লেখালেখির মাধ্যমে দাওয়া করি তাহলে আমার একটা প্ল্যান থাকা উচিত। শুধু নাস্তিকদের খন্ডন বা সেলফ মোটিভেশন বা ইসলাম কতো সুন্দর এগুলো নিয়ে আমাদের লেখক ভাইদের পড়ে থাকাটা প্রমাণ করে যে এই প্ল্যানটা ম্যাক্সিমামেরই নাই।
  • আবার বলি আমার লিখায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে মাফ করে দিয়েন। ব্যক্তিগত আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য ছিলনা। সবাই আমার জন্য দুয়া করবেন।আমিও আপনাদের জন্য দুয়া করি,করব ইনশা আল্লাহ।
    (সিরিজ হয়তো চলবে ইনশা আল্লাহ…)

 

এনামুল হোসাইন
By - এনামুল হোসাইন

একদিন আমাদের কবরেও ফুটবে ঘাসফুল। বাসা বাঁধবে একদল সৈনিক পিঁপড়ে

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *