আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতের মধ্যে মানুষকে করেছেন সর্বশ্রেষ্ঠ। মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বানিয়েছেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ সা. কে। তাঁকে বানিয়েছেন সকল মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ ও অনুকরণীয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা তাঁর মধ্যে মনুষত্বের সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ খুঁজে পাই। ইবাদাত, দাওয়াত, জিহাদ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সকল ক্ষেত্রে।
আল্লাহর রাসুলের সা. আদর্শ আমাদের সামনে সংরক্ষিত আছে অগণিত হাদিসের বর্ণনার মাধ্যমে। অসংখ্য বড় বড় গ্রন্থ রচনা হয়েছে তাঁর জীবন-চরিত বিষয়ে। সেই মহাসমুদ্র হতে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিকের কেবল দুই একটি নমুনা আমরা এখানে উল্লেখ করব।
রাসুল সা. যখন আবিদ:
রাসুলের সা. সালাত: আল্লাহ তাআলা তাঁর অগ্র-পশ্চাতের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করার ঘোষণা দেয়া সত্বেও তিনি রাত জেগে এত দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন যে তাঁর পা মুবারাক ফুলে যেত। এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন, ‘আমি কি শোকরগুযার বান্দা হব না?’ [বুখারি: ১১৩০]
রাসুল সা. এর কান্না: সালাতরত অবস্থায় তিনি আল্লাহর মহব্বত ও ভয়ে কাঁদতেন। কান্নার কারণে তাঁর বুকের ভেতর থেকে ফুটন্ত হাড়ির মত শব্দ শোনা যেত। [আবু দাউদ: ৯০৪, সহিহ]
রাসুল সা. এর তিলাওয়াত: রাসুল সা. স্পষ্টভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। প্রতিটি আয়াত পৃথক পৃথকভাবে তিলাওয়াত করতেন। [আবু দাউদ: ৪০০১, সহিহ] তিনি কখনো জোরে কখনো আস্তে তিলাওয়াত করতেন। [সহিহ শামায়েলে তিরমিযি: ২৪২]
রাসুল সা. এর সাওম: তিনি অধিক পরিমাণে নফল সাওম রাখতেন। কখনো তিনি লাগাতার এত বেশি সাওম রাখতেন যে সাহাবাগণ ভাবতেন, তিনি আর সাওম রাখা বন্ধ করবেন না। আবার কখনও তিনি নফল সাওম বন্ধ রাখতেন ফলে সাহাবাগণ মনে করতেন তিনি আর নফল সাওম রাখবেন না। [বুখারি: ১৯৭১]
রাসুল সা. এর সাদাকাহ: তাঁর কাছে সম্পদের পাহাড় ছিল না। বরং কখনো মাসব্যাপী তাঁর ঘরে চুলা জ্বলত না। [বুখারি: ৬৪৫৮] তবু তাঁর কাছে কেউ কিছু চাইলে তিনি কখনো তাকে ফিরিয়ে দিতেন না। [বুখারি: ৬০৩৪]
রাসুল সা. এর আল্লাহভীতি: আল্লাহ তাআলা তাঁর অতীত-ভবিষ্যতের সকল ভুলত্রুটি ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তবু আল্লাহকে ভয় করায় তিনি ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রসর। [বুখারি: ২০] তিনি প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি প্রতিদিন ৭০ বারেরও অধিক আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি’। [বুখারি: ৬৩০৭]
রাসুল সা. যখন দায়ী:
একজন দায়ীর জন্যও আল্লাহর রাসুল সা. সর্বোত্তম আদর্শ। দাওয়াতের ময়দানে তিনি কঠিন পরিশ্রম করতেন। এই মহান কাজের জন্য তিনি তাঁর সব আরাম আয়েশ ত্যাগ করেছিলেন। মানুষকে তাওহীদের পথে আনার জন্য তিনি এত বেশি চেষ্টা করতেন যেন তাদের পিছনে ছুটতে গিয়ে তিনি নিজেকে শেষ করে দিবেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘আপনি যেন নিজেকে শেষ করে দেবেন যদি তারা ইমান না আনে।’ [সুরা আশ-শুআরা ২৬:৩]
দাওয়াতের ময়দানে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে অবর্ণনীয় নির্যাতন ও উৎপীড়ন। জুলুম অত্যাচারের কোন উপায় বাদ রাখে নি কাফের মুশরিকরা। তায়েফের ময়দানে তাঁকে রক্তাক্ত করেছিল মুশরিকরা। তবু তিনি তাদের জন্য বদ দোয়া করেন নি। তিনি চেহারা থেকে রক্ত মুছতে মুছতে বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার জাতিকে ক্ষমা করে দিন, কেননা তারা জানে না’। [বুখারি: ৩৪৭৭]
রাসুল সা. যখন মুজাহিদ:
আল্লাহর রাসুল সা. জিহাদের ময়দানের একজন পরিশ্রমী মুজাহিদ ছিলেন। তিনি খন্দকের যুদ্ধে সাহাবাদের সাথে পরিখা খননের কাজ করেছেন। মাটি বহন করেছেন। গাঁইতি দ্বারা শক্ত পাথর ভেঙেছেন। অথচ তখন ক্ষুধার কারণে তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। [বুখারি: ৪১০১, ৪১০৪]
তিনি পূর্ণ সাহসিকতা ও উদ্যমের সাথে জিহাদ করতেন। হুনাইনের যুদ্ধে যখন মুসলিমরা সাময়িকভাবে পিছু হটছিল তখন রাসুল সা. দ্রুত খচ্চর হাঁকিয়ে শত্রুদের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন। তখন আব্বাস রা. তাঁর খচ্চরের লাগাম ধরে রেখেছিলেন যেন তা বেশি দ্রুত ছুটতে না পারে। [মুসলিম: ৪৪৬১ ই.ফা.]
পরিবারে আল্লাহর রাসুল:
আল্লাহর রাসুল সা. ছিলেন স্ত্রীদের সাথে সর্বাধিক ভালো আচরণকারী। [তিরমিযি: ৩৮৯৫, সহিহ] তিনি স্ত্রীদের কাজে সহায়তা করতেন। [বুখারী: ৬৭৬]
তিনি কখনো কোন স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেন নি। কখনো কোন খাদেমকেও প্রহার করেন নি। [মুসলিম: ৫৮৪২, ই.ফা.]
তিনি নিজের কাজ নিজ হাতে করতেন। নিজের কাপড় সেলাই করতেন। নিজের জুতা সেলাই করতেন। [আল-আদাবুল মুফরাদ: ৫৪০, সহিহ]
ছোটদের সাথে আল্লাহর রাসুল:
রাসুল সা. ছোটদেরকে আদর করে চুমু খেতেন। [বুখারি: ৫৯৯৭] কোলে নিতেন। কখনো ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়েও সালাত আদায় করেছেন। [বুখারি: ৫১৬]
তিনি ছোটদের সাথে মিশতেন। তাদের সাথে কথা বলতেন। খোঁজ-খবর নিতেন। কারো পোষা পাখির কথাও জিজ্ঞেস করতেন। [বুখারি: ৬১২৯]
প্রতিবেশিদের সাথে আল্লাহর রাসুল:
তিনি ছিলেন একজন উত্তম প্রতিবেশি। তিনি অন্যদেরকেও প্রতিবেশিদের সাথে সদাচরণের আদেশ দিতেন। তিনি প্রতিবেশিকে দেয়ার জন্য তরকারিতে ঝোল বেশি রাখতে বলেছেন। [মুসলিম: ৬৪৪৯ ই.ফা.] তিনি আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতিবেশিকে অভুক্ত রেখে তৃপ্তি সহকারে আহার করে সে মুমিন না’। [আল-আদাবুল মুফরাদ: ১১২, সহিহ]
সামাজিকতায় আল্লাহর রাসুল:
তিনি সমাজের মানুষের সাথে মিশতেন। হাসিমুখে সাক্ষাত করতেন। [বুখারি: ৩৮২২] তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতেন। অস্পষ্টভাবে বা দ্রুত কথা বলতেন না। তাঁর কথা সবাই বুঝতে পারত। [মুসনাদ আহমাদ: ২৬২০৯, হাসান]
তাঁকে দাওয়াত করা হলে তিনি দাওয়াতে উপস্থিত হতেন, যদিও তা অতি সাধারণ খাবারের দাওয়াত হোক। এতে তিনি লজ্জাবোধ করতেন না। [শামায়েলে তিরমিযি: ৩২৭, সহিহ]
রাসুল সা. যখন বিচারক:
তিনি সর্বোত্তম ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর বিচারে কোন পক্ষপাত বা স্বজনপ্রীতি ছিল না। অন্যদের জন্য যে বিচার ছিল তাঁর নিকটাত্মীয়দের জন্যও সেই বিচার ছিল। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা চুরি করত আমি তার হাতও কেটে দিতাম’। [বুখারি: ৩৪৭৫]
রাসুল সা. এর চারিত্রিক উৎকর্ষের আরো কিছু উদাহরণ:
আখলাক ও সদাচরণ: আল্লাহর রাসুল সা. উত্তম আখলাকের অধিকারী ছিলেন। তিনি কারো সাথে দুর্ব্যবহার করতেন না। আল্লাহ তাআলা তাঁর আখলাক সম্পর্কে বলেছেন, ‘নিশ্চই আপনি উচ্চ আখলাকের অধিকারী’। [সুরা আল-ক্বলাম ৬৮:৪]
আনাস রা. দশ বছর তাঁর খিদমাত করেছেন। রাসুল সা. তাকে একবারও ‘উফ!’ বলেন নি। কখনো বলেন নি, ‘এটা করলে না কেন?’ অথবা ‘এটা করলে কেন?’ [বুখারি: ৬০৩৮]
লজ্জা: রাসুল সা. কুমারী মেয়েদের চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন। [বুখারি: ৬১১৯] তিনি কখনো অশ্লীল কথা বলতেন না। অশ্লীল কথা বলা তাঁর স্বভাবও ছিল না, ইচ্ছাকৃতভাবেও বলতেন না। [বুখারি: ৩৭৫৯]
বিনয়: তিনি বিনয়ী ছিলেন। অহংকার করতেন না। তাঁর অতিরিক্ত প্রশংসা করা পছন্দ করতেন না। তিনি তাঁর প্রশংসায় সীমালঙ্ঘন করতে নিষেধ করেছেন। তিনি পছন্দ করতেন, তাঁকে ‘আল্লাহর বান্দা ও রাসুল’ বলা হোক। [বুখারি: ৩৪৪৫] তিনি এটাও পছন্দ করতেন না যে তাঁর সম্মানে মানুষ দাঁড়িয়ে যাক। [মুসনাদ আহমাদ: ১২৩৪৫, সহিহ]
সাহসিকতা: তিনি অন্য সবার চেয়ে বেশি সাহসী ছিলেন। এক রাতে মদীনাবাসী একটি শব্দ শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। রাসুল সা. সবার আগে শব্দের দিকে ছুটে গিয়েছিলেন এবং শব্দের উৎস আবিস্কার করেছিলেন। [বুখারি: ২৯০৮]
মহানুভবতা: তিনি জিহাদের ময়দানে ব্যতিত কাউকে কখনো প্রহার করেন নি। কেউ তাকে গালি দিলে তিনি কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নি। [মুসলিম: ৫৮৪২, ই.ফা.] তিনি খারাপ আচরণের জবাবে খারাপ আচরণ করতেন না। বরং ক্ষমা করতেন ও উপেক্ষা করতেন। [বুখারি: ৪৮৩৮]
রাসুল সা. এর জীবিকা:
তিনি অনেক সাদামাটা জীবন-যাপন করতেন। বিলাসিতা পছন্দ করতেন না। অল্প সম্পদেই তিনি ছিলেন তুষ্ট। অনেক সময় পেট ভরে খাওয়ার মত নিম্নমানের খেজুরও তাঁর ঘরে থাকত না। [মুসলিম: ৭১৯০, ই.ফা.] কখনো মাস পার হয়ে যেত কিন্তু তাঁর ঘরে চুলা জ্বলত না। শুধু খেজুর ও পানি খেয়ে কাটাতেন। [বুখারি: ৬৪৫৮] অথচ এ নিয়ে তাঁর কোন অভিযোগ ছিল না। তিনি আল্লাহর শোকর আদায় করতেন।
তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’। [সুরা আল-আহযাব ৩৩:২১]
