ইসলামি অঙ্গনে লিখালিখি নিয়ে টুকটাক (প্রথম পর্ব)

প্রথমেই বলে নেই এই রিমাইন্ডারটি আমার নিজের জন্য। এই লিখায় কাউকে আঘাত দেবার বিন্দুমাত্র কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই। এই লিখায় যেসব বিষয়ের আলোচনা আছে তার অনেক কিছুই আমার মাঝে ছিল প্রবল পরিমাণে।এগুলো থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছি। একজন মুসলিম ভাই হিসেবে আমি চাই আমার অন্য মুসলিম ভাই যেন এই সমস্যায় না পড়েন। তা ভেবেই এই পোস্ট লিখা

ইসলামি ঘরণায় সাহিত্য [১], অলঙ্কার ইত্যাদি হল হালের ক্রেজ। এখনকার তরুণ যুবক সেই সাথে কিছু মধ্য বয়স্কদেরও মাথার মধ্যে কীভাবে যেন ঢুকে গিয়েছে সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে ইসলামের বিপুল খেদমত সাধিত হবে। অনেকের মাথায় ঢুকেছে আমার একটা বই লিখতেই হবে। সবাই বই লিখে আমি না লিখলে কেমন দেখায়!

এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই অনেককাল থেকেই বাংলা ভাষায় রচিত ইসলামি বইপত্র সেকুলার ‘সাহিত্যমানে’ উত্তীর্ণ হতে পারবেনা। এটা দোষের কিছুনা। এর ফলে সাহিত্যিক দিক থেকে ইসলামের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে সমস্যা যেটা হয়েছে ইসলামি বইপত্রে কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার, বাংলাভাষী মূল জনস্রোত যে ভাষায় কথা বলেনা, সেই ভাষা ব্যবহার অনেক পাঠককেই ইসলামি বইপত্র থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।

যুগের পর যুগ ধরে ইসলামি বইপত্রের চারপাশে যে অনীহার প্রাচীর গড়ে উঠেছিল তা ভাঙতে শুরু হয় ২০১০/১১ সালের সময় থেকে। এই সময় ফেইবুকে বেশ কয়েকজন ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণ যুবকরা ‘চলতি ভাষায়’ ইসলাম নিয়ে লিখালিখি শুরু করেন। কঠিন কঠিন শব্দ আর অপ্রচলিত ভাষার যে প্রাচীর গড়ে উঠেছিল বাংলা ভাষায় ইসলাম প্রচারের চারপাশে সেই প্রাচীর ভাঙ্গার প্রথম আঘাত পড়ে এই তরুণ যুবকদের হাত ধরেই। আলহামদুলিল্লাহ পরবর্তীতে শাপলা পরবর্তী পরিস্থিতি জেনারেল লাইন কিংবা মাদ্রাসা লাইনের আরো অনেক তরুণ যুবকের হাতে কলম/কীবোর্ড ধরিয়েছে। ২০১৬/১৭ সালের সময়কার প্রকাশন জগতের বিপ্লবের পর ইসলামি নিয়ে চলতি ভাষায় লিখালিখি করেন এমন অনেক লেখকের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে।

তবে সেই সঙ্গে বেশকিছু মানুষের মাঝে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে ইসলাম প্রচারের জন্য, বাজারে বইয়ের কাটতির জন্য সাহিত্যচর্চা করতে হবে। তাদের লেখাগুলোকে সাহিত্যমানে উন্নীত করতে হবে। না হলে লিখাগুলো পাঠকদের কাছে পৌঁছাবেনা। সমাদৃত হবেনা।
তো এই সাহিত্যমানে উন্নীত করার প্রবণতা বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি করেছে-
  • ১) সাহিত্য সাহিত্য করতে গিয়ে নাস্তিক, মুরতাদ, দ্বীনের শত্রু কিংবা নরমাল সেকুল্যার লেখকদের উপন্যাস, কবিতা দেদারসে পড়া শুরু করেছে অনেকে। অনেকে সাহিত্য শেখার জন্য, জীবনবোধ শেখার জন্য সিনেমা,সিরিয়াল দেখা শুরু করেছে। মুভের সেমিনারে গিয়েছে। কথা ছিল এগুলো থেকে সাহিত্য জীবনবোধ শিখে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া। উলটো অনেক তরুণ যুবক ভাইয়েরা নিজেদের অজান্তেই ইসলাম বিকৃত করে উপস্থাপন করছে। সেকুল্যার সাহিত্য দ্বারা ব্রেইন ওয়াশড হয়ে গিয়েছে। তাদের জীবন দর্শন গ্রহণ করে নিচ্ছে মনের অজান্তেই। এরকম পরিবেশ বা কন্টেন্টের সামনে নিজেকে এক্সপোজ করলে কিছু প্রভাব পড়বেই পড়বে। এবং এগুলো খুব অল্প সংখ্যক মানুষ এই প্রভাবের ব্যাপারটা সচেতনভাবে বোঝেন। সেটার মোকাবেলা করতে পারেন।
  • ২) সেকুলারদের সাহিত্যপড়তে গিয়ে সেকুল্যার লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের আইডল ওরশীপের মতো পূজা করার ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। মাদ্রাসা পড়ুয়া কিন্তু গাঞ্জুট্টি শাহবাগী কবি সাহিত্যিকদের মতো কবিতা লিখা, মিথ্যে রোমান্টিসিজমে ভোগা, বড় বড় চুল দাড়ি (ইসলামিক দিক থেকে এটাতে আপত্তি থাকার কথা না, কিন্তু সমস্যা হলো এটা করা হয় সেকুলার কবি, সাহিত্যিকদের ট্রেন্ড ফলো করে) রেখে বিভিন্ন পোজ দিয়ে ছবি তোলা ইত্যাদি শুরু হয়েছে ।
  • ৩) ওপরের যে দুইটা সমস্যার কথা বললাম, এমন সমস্যা আছে এমন একটা জেনারেশন ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর চাইতেও আশঙ্কার কথা হলো এই জেনারেশনকে আইডল মনে করে এমন পিচ্চি পোলাপানের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষ করে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের। কোন অজানা কারণে জানিনা, অনেক মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের ভাই তাঁদের লাইফ স্টাইল নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন। ভাবেন ভার্সিটি পড়ুয়াদের জীবনটাই আসল স্মার্ট লাইফ । এর সংগে তাঁরা দেখছেন তাঁদের মাদ্রাসা থেকেই বের হওয়া সিনিয়র ভাইয়েরা ভার্সিটি পড়ুয়া জেনারেল তরুণ যুবকদের মতো সেকুল্যার কবিতা পড়ছে, সাহিত্য সাহিত্য করছে, অন্যরকম একটা লাইফ স্টাইল বেছে নিয়েছে। উঠতি এই তরূণ যুবকের দল, সিনিয়রভাইদের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে জাতে ওঠার জন্য ঐ লাইফস্টাইলটা বেছে নিচ্ছে।
  • ৪) আমার কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা যেটা মনে হয়েছে এই টাইপের তরুণ যুবক কিংবা মধ্যবয়সীরা এই সাহিত্য সাহিত্য করতে গিয়ে না পেরেছে সাহিত্য করতে আর না পেরেছে দ্বীন প্রচারের উপযোগী করে লিখা লিখতে পেরেছে।(অনেকে আবার বেশ চমৎকার লিখেন) কাকের, কোকিল এবং ময়ূর হবার সেই গল্প পুনুরাবৃত্ত হয়েছে। এটাও হয়নি সেটাও হয়নি। বরং এমনকিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে যারা অলঙ্কার আর সাহিত্যের নামে কুরআনের বিকৃত, অনুবাদ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। এরা না বোঝে অনুবাদ, না বোঝে সাহিত্য আর না বোঝে ইসলাম নিয়ে লিখালিখি করার আসল উদ্দেশ্য কী।
  • ৫) বেশি সাহিত্যচর্চা করার একটা কুফল আমার কাছে মনে হইছে আত্মমুগ্ধতা চলে আসা। আমার ক্ষেত্রে এটা হইছে অনেকবার। ধরেন সন্ধ্যার পর এককাপ চা খেয়ে লিখতে বসলাম। দুই তিন প্যারা সেই লিখা লিখলাম। তখন ঘুরাইয়া ফিরাইয়া শুধু সেই লিখাই পড়া শুরু করলাম। আর ভাবতে থাকলাম- সাব্বাস, বাপের বেটা তুই এনামুল, সেই একটা লিখা লিখেছিস। ভাবতে ভাবতে অনেক সময় নিজেকে হাল জামানার সুনীল বা হুমায়ূন ভেবে ঘন্টার পর ঘন্টা পার করলাম। এভাবেই রিয়া আসে। এভাবেই মুই কী হনুরে এমন ভাবে আসে । একবার ভুলেও ভাবার সময় হয়না ‘আমার কোনো শক্তি নেই। সকল শক্তির মালিক আল্লাহ। আল্লাহ না চাইলে আমি কিছুই লিখতে পারতাম না।
    চলবে ইনশা আল্লাহ……
    টীকাঃ
    [১] সাহিত্য বলা আসলে ভুল হচ্ছে। এখন যেটা হচ্ছে বাংলাদেশের ইসলামী অঙ্গনে সেটা আসলে সাহিত্য না। সাহিত্যের আরো স্পেসিফিক অর্থ আছে- উপন্যাস,কবিতা,ছোটোগল্প ইত্যাদি। আমাদের এখানে ইসলামি সাহিত্য হয়না। আগে যেটা হয়েছে ,যেমনঃসাইমুম ,কাসেম বিন আবু বকর ইত্যাদি- এগুলো সবই হয়েছে সেকুল্যার সাহিত্যের ইসলামিকরণের চেষ্টা। মাসুদ রানা বা জেমস বন্ডের ইসলামিক ভার্সন। বা প্রেমের গল্পের ইসলামি ভার্সন। এটা ইসলামি বলা যায়না। ইসলামি হল এমন কিছু যা ইসলামি মূল্যবোধ,আকীদা, ওয়ার্ল্ডভিউ শিখবে। কাজেই কোনো অর্থেই ইসলামি সাহিত্য হচ্ছেনা। যেটা হচ্ছে সেটা হল ইসলামি রচনা, যেটা মূলত ইসলামি বই এর উপস্থাপনা, ভাষা, সাধারণ মানুষকে এপ্রোচ করার ক্ষেত্রে কিছু নতুনত্ব এসেছে। কাজেই এটাকে ইসলামি সাহিত্য বলা আসলে সঠিক না। যদিও এটা ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে গেছে। এই লিখায় আমরা ইসলামি সাহিত্য বলতে আসলে বই এর উপস্থাপনা,ভাষা ইত্যাদিকে বোঝাচ্ছি।

 

এনামুল হোসাইন
By - এনামুল হোসাইন

একদিন আমাদের কবরেও ফুটবে ঘাসফুল। বাসা বাঁধবে একদল সৈনিক পিঁপড়ে

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *