“রুকইয়াহ্” শব্দের অর্থ “ঝাড়-ফুঁক”। ইসলামী শারইয়াহ-সম্মত ঝাড়-ফুঁকের পদ্ধতিকে “রুকইয়াহ্ শারইয়াহ্” বলে। এটি একটি বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি, যাতে কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর যিকির, দোয়া পাঠ ইত্যাদির মাধ্যমে যেকোনো রোগ, বিশেষ করে বদনজর (আঈন), হিংসার কুপ্রভাব (হাসাদ), ওয়াসওয়াসা, জ্বিন-যাদু সংক্রান্ত সমস্যা, দীর্ঘদিন চিকিৎসা করেও ফল পাওয়া যাচ্ছে না বা মেডিকেল টেস্টে ধরা পড়ছে না -এজাতীয় সমস্যার চিকিৎসা করা হয়।
নিজের সমস্যার জন্য নিজে নিজেও রুকইয়াহ করা যায় (এটাকে সেল্ফ-রুকইয়াহ বলে)। যিনি রুকইয়াহ্ শারইয়াহ্ প্রাকটিস করেন তাকে “রাকী” বলা হয়।
প্রচলিত ঝাড়-ফুঁকের পদ্ধতি ও রুকইয়াহ শারইয়াহ-এর মধ্যে পার্থক্যঃ
(ক) প্রচলিত কিছু পদ্ধতিতে জ্বিনের সাহায্য নেওয়া হয়। এ পদ্ধতিতে জ্বিনকে খুশি করে তাকে দিয়ে কাজ করাতে হয়। আর জ্বিনকে খুশি করতে অনেক ক্ষেত্রেই কুফর, শিরক বা হারাম (ইসলামে নিষিদ্ধ) কাজে লিপ্ত হতে হয়। তাছাড়া জ্বিনের সাহায্যে দেওয়া চিকিৎসা গ্রহণ করার কারণে অনেক সুস্থ মানুষ জ্বিনে আক্রান্ত হওয়ার বহু নজির রয়েছে।
অনেকে বলেন, তিনি ভালো জ্বিনের সাহায্য নিচ্ছেন। অথচ বাস্তবতা হলো শয়তান মানুষকে ধোকা দেওয়ার জন্য নিজেকে দ্বীনদার, পরহেজগার বলে পরিচয় দেয়। আর মানুষের পক্ষে এগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয়। যারা এজাতীয় কথাবার্তা বিশ্বাস করেন তারাই কেবল দাবি করেন যে তিনি ভালো জ্বিনের সাহায্য নেন।
পক্ষান্তরে, রুকইয়াহ শারইয়াহ-তে পূর্ণরূপে একমাত্র, শুধুমাত্র, কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালার উপরেই তাওয়াক্কুল ও ভরসা রেখে কুরআনের আয়াত, দোয়া ও জিকির ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়, কোনো জ্বিনের সাহায্য নেওয়া হয় না।
(খ) প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে অনেক ব্যাখ্যা না জানা পদ্ধতি, অর্থ না জানা বাক্য বা সংকেত ইত্যাদির ব্যবহার। যেগুলি যাদু হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। শয়তান জ্বিনেরা মানুষকে বিভিন্ন ভাবে যাদুবিদ্যা শেখায়, এতে মানুষের জন্য ক্ষতি ব্যতীত কোনো কল্যাণ/ উপকার নেই (সূরা বাকারাহ’র ১০২ নং আয়াত দ্রষ্টব্য)।
অনেক সময় যাদু প্রয়োগের ফলে রোগী নতুন করে বিভিন্ন প্রকার মারাত্মক ও জটিল সমস্যায় আক্রান্ত হন। এমন অনেক নজির আমাদের সামনে রয়েছে, যেখানে রোগী এক উদ্দেশ্যে যাদুকর/তান্ত্রিকের কাছে গিয়েছে, অথচ এর কারণে সে অন্যান্য আরো নানা জটিল ও কঠিন সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। সর্বোপরি যাদুবিদ্যা কুফর হওয়ার কারণে এর আশ্রয় গ্রহণ করায় পরকালীন শাস্তি তো আছেই।
পক্ষান্তরে, রুকইয়াহ-তে কেবল স্পষ্ট কুরআনের আয়াত, দোয়া, জিকির ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। ফলে কোন ধরণের অস্পষ্টতা, সংশয় বা যাদুবিদ্যা প্রয়োগের কোনো সম্ভাবনা নেই।
(গ) আক্রমণকারী বা ক্ষতিকারক জ্বিন যদি তদবির কারকের জ্বিন অপেক্ষা শক্তিশালী হয়, সে ক্ষেত্রে তার পক্ষে কিছুই করার থাকে না। পক্ষান্তরে, রুকইয়াহ শারইয়াহ-এর মাধ্যমে আল্লাহর ইচ্ছায় যে কোন জ্বিন-শয়তানের মোকাবেলা করা সম্ভব। আলহামদুলিল্লাহ।
(ঘ) অনেক সময় যাদু কাটতে বা নষ্ট করতে উক্ত যাদুর বিপরীতে জেনে-বুঝে নতুন করে যাদু করা হয় (নাউযুবিল্লাহ)। এতে করে রোগী ক্রমান্বয়ে আরো জটিল ও মারাত্মক সমস্যায় আক্রান্ত হতে থাকেন। পক্ষান্তরে, রুকইয়াহ-তে স্পষ্ট কুরআনের আয়াত, দোয়া, জিকির ইত্যাদি ব্যতীত কোন প্রকার অস্পষ্ট পদ্ধতি বা যাদুবিদ্যার ব্যবহার নেই।
একজন রাকীর কর্মপরিধিঃ
(ক) তিনি রোগ/সমস্যাটি থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে ইসলামী শরীয়তের গন্ডির ভিতরে থেকে, আল্লাহর নিকট সাহায্য চেয়ে, রুকইয়াহ শারইয়ার পদ্ধতি অনুযায়ী যথাসাধ্য চেষ্টা করতে পারেন।
(খ) তিনি বিশেষ কোনো আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী নন, কোনো জ্বিনের সহায়তাও গ্রহণ করেন না। কোনো ধরণের তাবিজ-কবচ, সুতা, কাপড় ইত্যাদি প্রদান করেন না।
(গ) রোগ/সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ একমাত্র আল্লাহরই হাতে, তিনি (আল্লাহ) যখন যা যেভাবে চাবেন তখন তা সেভাবেই হবে। রোগ/সমস্যাটি ঠিক কতো দিনে নির্মূল হবে বা আদৌ হবে কিনা এব্যাপারে রাকীর নিজস্ব কোনো জ্ঞান বা ক্ষমতা কিছুই নেই।
পরিপূর্ণ ফলাফল পাওয়ার জন্য করনীয়/বর্জনীয়ঃ
(ক) তাবিজ-কবজসহ সকল প্রকার বাতিল (কুফরী, শিরকী, বিদআতী ও সন্দেহযুক্ত) চিকিৎসাপদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা। তান্ত্রিক, কবিরাজ, ওঝা, জ্বিন-হুজুর বা এজাতীয় কারো কাছে না যাওয়া, তাদের কোনো বক্তব্য বিশ্বাস বা সত্যায়ন না করা। তাদের দেয়া তাবিজ, কবজ, কোনো কিছু মিশ্রিত পানি, তেল, সুতা, কাপড় ইত্যাদি কোনো কিছু ব্যবহার বা সংরক্ষণ না করা। ইতিপূর্বে গ্রহণকৃত বাতিল চিকিৎসার সকল উপকরণ নষ্ট করে ফেলা (যথাযথ নিয়মে) এবং উত্তমরূপে তওবা করা। রাশিফল, হস্তরেখা বিশ্লেষণ, বিভিন্ন প্রকার কুসংস্কার ইত্যাদি বিশ্বাস না করা।
(খ) অন্তত ফরয-ওয়াজিব পর্যায়ের কোনো ইবাদতে ত্রুটি বা ঘাটতি না থাকা (সলাত আদায় করা, পর্দা করা ফরয)। নাজায়েজ ও হারাম কাজ থেকে দূরে অবস্থান করা (বিবাহবহির্ভূত প্রেম-প্রীতি হারাম) । উপার্জন সম্পূর্ণ হালাল ও সন্দেহমুক্ত হওয়া। আল্লাহর উপরে পূর্ণরূপে তাওয়াক্কুল করা। ইখলাছে ঘাটতি না থাকা।
(গ) বাসগৃহে কোনো ছবি, মুর্তি, পুতুল, কার্টুন, বাদ্যযন্ত্র, টেলিভিশন ইত্যাদি কোনো কিছু না রাখা। প্রয়োজনীয় ছবি যেমনঃ পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা টাকায় থাকা ছবি ইত্যাদি ভালভাবে ঢেকে রাখা। বেপর্দা ও ইসলামী শরীয়াহ বিরোধী যে কোনো অনুষ্ঠান, নাটক-সিনেমা, পর্ণোগ্রাফী, গান-বাদ্য, ভিডিও গেমস, কার্টুন ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা (বাচ্চদেরকে স্মার্টফোন/ডিভাইস থেকে দুরে রাখতে চেষ্টা করা)। ইত্যাদি।
অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহঃ
(ক) কুরআন তিলাওয়াত করা, জিকির/দোয়া পাঠ করা, এগুলি পাঠ করে রোগী বা সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তির গায়ে বা আক্রান্ত স্থানে ফুঁ দেওয়া। রোগী নিজে কুরআন তেলাওয়াত করা, তেলাওয়াতের রেকর্ডকৃত অডিও শোনা।
(খ) পানি, তেল, কালোজিরা, মধু ইত্যাদিতে কুরআন ও দোয়া পাঠ করে ফুঁ দিয়ে (পড়ে) তা ব্যবহার করা (পান করা, গোসল করা, শরীরে মাখা ইত্যাদি)।
(গ) প্রয়োজনে হিজামা (কাপিং থেরাপি) করা, সোনাপাতা, আতর, কস্টাস ইত্যাদি ব্যবহার করা।
রুকইয়াহ সেশন – আমাদের/রাকীদের কর্মপদ্ধতিঃ
(ক) প্রথমতঃ ইতিপূর্বে গ্রহণকৃত সকল বাতিল চিকিৎসা পদ্ধতির সকল উপকরণ (যদি থাকে) যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী নষ্ট করে দেয়া।
(খ) এরপর মূল “রুকইয়াহ সেশন” শুরু করা। অবস্থা ভেদে এর জন্য কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে।
(গ) সর্বশেষ পানি, তেল, কালোজিরা, মধু ইত্যাদি পড়ে দিয়ে তা ব্যবহারের নিয়ম-কানুন এবং বিস্তারিত প্রেসক্রিপশন প্রদানসহ পরবর্তী করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা প্রদান করা।
“রুকইয়াহ সেশন”-এর জন্য প্রস্তুতিঃ
রুকইয়াহ সেশনে সাধারণত নিম্নোক্ত জিনিসপত্রগুলী প্রয়োজন হয়ঃ-
(১) পানি, (২) তেল (জয়তুন তেল বা এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েল), (৩) কালোজিরা, (৪) মধু, (৫) একটা ছোটো বালতি, (৬) একটা গামছা বা টাওয়াল (বালতি ও টাওয়াল বমি হলে ব্যবহারের জন্য),
রোগী/সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তি মহিলা হলেঃ-
(৭) একটি বড়ো ওড়না বা চাদর, (৮) সাথে অন্তত একজন মাহরাম পুরুষ থাকা। ইত্যাদি।
প্রতিক্রিয়া ও করণীয়ঃ
প্রতিক্রিয়াসমূহঃ
(ক) “রুকইয়াহ সেশন“ চলাকালীনঃ-
সাধারণতঃ ঘুম ঘুম ভাব, মাথা ঝিমঝিম করা, অস্বস্তি লাগা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, মাথা/ঘাড়/পেট/বুক/পিঠ বা অন্য কোথাও ব্যথা করা, অবশ হয়ে আসা, জ্বলা-পোড়া করা ইত্যাদি প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে। এছাড়াও জিন-যাদুগ্রস্থ ব্যক্তির ভিতরে থাকা জ্বিন কথা বলে উঠতে পারে, চিল্লা-পাল্লা করতে পারে। এমনকি বাহ্যিক/দৃশ্যমান কোনো প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে।
(খ) “রুকইয়াহ সেশন”-এর পরেঃ-
(১) সমস্যাগুলো কমে যেতে পারে, (সাময়িকভাবে) বেড়ে যেতে পারে। নতুন কোনো প্রতিক্রিয়া বা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
(২) সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে পরবর্তী দিক-নির্দেশনা ও পরামর্শসমূহ পালনের ক্ষেত্রে বিরক্তি, অলসতা, আগ্রহহীনতা, গুরুত্বহীনতা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
উল্যেখ্যঃ একই ধরণের প্রতিক্রিয়া অডিও রুকইয়াহ শুনে, ‘সেল্ফ-রুকইয়াহ’ বা ‘ঘরোয়া রুকইয়াহ’ করার সময়ও হতে পারে।
করণীয়সমূহঃ
(ক) প্রতিক্রিয়া যেমনই হোক পূর্ণরুপে সুস্থ/সমস্যামুক্ত হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর উপরে পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা) রেখে সবর (ধৈর্য্য ধারণ) করা এবং বেশি বেশি দোয়া-ইস্তিগফার করার পাশাপাশি যে সমস্ত পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সেগুলি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে ফলো করে যাওয়া। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে প্রচলিত চিকিৎসাও গ্রহণ করা (রাকীর সাথে পরামর্শ করে)।
(খ) সুস্থ হতে বা সমস্যাটি দূর হতে সময় লাগলে অধৈর্য্য হয়ে পুনরায় বাতিল চিকিৎসা পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ না করা। কেননা, এতে আল্লাহর সাথে (সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের) দুরত্ব সৃষ্টি হওয়ার ফলে রুকইয়ার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বাধাগ্রস্থ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগ/সমস্যাটি পূর্বের চেয়ে আরো কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
সুস্থ/সমস্যামুক্ত হতে কতোদিন সময় লাগতে পারে..?
রুকইয়াহ অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির মতোই একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। অন্যান্য রোগ-ব্যাধির মতো জ্বিন-যাদু সংক্রান্ত সমস্যার মধ্যেও হালকা ও গুরুতর আছে, অন্যান্য সমস্যার ন্যায় রুকইয়াহ সংশ্লিষ্ট সমস্যার তীব্রতায়ও তারতম্য আছে।
আমরা কেবলমাত্র রোগ/সমস্যাটি থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে ইসলামী শরীয়তের গন্ডির ভিতরে থেকে, আল্লাহর নিকট সাহায্য চেয়ে, রুকইয়াহ শারইয়ার পদ্ধতি অনুযায়ী যথাসাধ্য চেষ্টা করতে পারি। আল্লাহ কাকে কতোদিনে সুস্থ করবেন সেটা কেবলই তার হাতে।
তবে আমরা যেটা বলতে পারি সেটা হলো, উপরে উল্লেখিত নানা ধরণের সমস্যা থেকে বিশ্বব্যাপী নিয়মিত বহু মানুষ রুকইয়াহ করে আল্লাহর ইচ্ছায় সুস্থ/সমস্যামুক্ত হচ্ছেন, একইভাবে আমাদের এখানেও।
অনেক ক্ষেত্রে রোগ/সমস্যা নির্মূল/দূর হতে কয়েকটি রুকইয়াহ সেশন বা অনেক সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। এসময়ে করণীয় হচ্ছে, আল্লাহর উপরে ভরসা রেখে ধৈর্য্য ধারণ করা এবং বেশি বেশি দোয়া-ই্স্তিগফার করা। পাশাপাশি রুকইয়াহর কাজগুলি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে করে যাওয়া।
বিঃ দ্রঃ রুকইয়াহ করতে, পানি, তেল ইত্যাদি পড়তে বিশেষ বা গোপন কোনো আমল বা সাধনা, বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা পীরের এজাজত (অনুমতি) ইত্যাদি কোনো কিছুই প্রয়োজন হয় না। নারী-পুরুষ উভয়ই এটা করতে পারবেন।।
