মুসলমাদের জীবনে আরবী মাস মুহাররম মাসের ১০ তারিখ (আশুরার দিন) একটি গুরুত্ববহ ও ফজিলতপূর্ন দিন। এইদিন সম্পর্কে সঠিক ধারনা ও জ্ঞান না থাকার ফলে আমরা আবেগের বশবর্তী হয়ে নানা রকম ইসলাম বর্হিভূত কর্মকান্ডে লিপ্ত হই যা আমাদের ঈমান ভাঙ্গার পর্যায়ে নিয়ে যায়। আমাদের উচিত কুরআন হাদিস সম্পর্কে তথা ইসলামী বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা অথবা যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তাদের নিকট থেকে জেনে নেওয়া। আলোচনার শুরুতেই আমরা আলোচনা করবো এই দিনের অর্থ ও গুরুত্ব নিয়ে।

আশুরার অর্থ:

আরবী মাস মুহাররম মাসের ১০ তারিখকে ইসলামী শরিয়াতের ভাষায় আশুরা বলা হয়। আরবীতে “ইশরুন” অর্থ ১০ (দশ)। সেখান থেকেই আশুরা।

গুরুত্ব:

  • বিশুদ্ধ হাদিসের বনর্না মতে, এইদিনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নবী মুসা (আ) কে তার সঙ্গী-সাথীদের রক্ষা করেছিলেন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত, যুগে যুগে জালিম আর স্বৈরাচারী শাসকদের চুড়ান্ত পরিনতির দৃষ্টান্ত কুখ্যাত ফেরআউন ও তার সেনাবাহিনীর হাত থেকে। শুধু রক্ষাই করেননি বরং পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস্ব করেছিলেন সেই জালিম বাদশাহীর মসনদ। মহান আল্লাহ এই সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেন,

আর যখন তোমাদের জন্য আমি সমুদ্রকে বিভক্ত করেছিলাম, অতঃপর তোমাদেরকে নাজাত দিয়েছিলাম এবং ফিরআউন দলকে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম, আর তোমরা দেখছিলে”।
(সুরা বাকারা, আয়াত-৫০)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এর সূত্রে ইমাম বুখারী ও মুসলীম বনর্না করেন,

রাসূলূল্লাহ (স) মদীনায় এসে দেখলেন যে, ইহুদীরা মুর্হারম এর ১০ তারিখ রোজা রাখে। রাসুলুল্লাহ (স) তাদের জিজ্ঞাসা করেন যে কেন তারা এই দিনে রোজা রাখে? তারা উত্তরে বললো যে, এই দিনে মুসা (আ) কে আল্লাহ রক্ষা করেছিলেন ফেরআউনের হাত থেকে এবং ডুবিয়ে মেরেছিলেন ফেরআউন ও তার সৈন্যদের। তার শুকরিয়া স্বরুপ তারা রোজা রাখে। আল্লাহর রাসূল (স) বলেন, আমরাই মুসা (আ) এর প্রকৃত অনুসরনের হকদার। তিনি নিজে রোজা রাখতেন এবং তার সাহাবীদের ও নির্দেশ দিলেন”।
(সহীহ বুখারী, নবীগনের কাহিনী অধ্যায়, হাদিস নং-৩৩৯৭)

রমযান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বেও রাসূলুল্লাহ (স) এই দিনে রোজা রাখতেন। কিন্তু রমযান মাসের রোজা ফরজ হয়ে যাওয়ার পর আশুরার রোজা ঐচ্ছিক হয়ে যায়।
(সহীহ বুখারী, সিয়াম অধ্যায়, হাদিস নং-২০০২)

রমযান মাসের পর মুহাররম মাসের রোজা (আশুরার রোজা) সর্বোত্তম।
(সহীহ মুসলীম, সিয়াম অধ্যায়, হাদিস নং-১১৬৩)

হাদিসে মুহাররম মাসকে আল্লাহর মাস বলা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে মুর্হারম মাসের সম্মান বুঝানো হয়েছে।

আশুরার দিনে রোজা রাখার জন্য আল্লাহর রাসূল (স) তার সাহাবীদের দ্বারা ঘোষনার করতেন যে,

যারা সকালে কিছু খেয়েছে তারা যেন সারাদিন কিছু না খায় আর যারা সকালে কিছুই খায়নি তারা যেন রোজা রাখে। এমনকি মহিলারা তাদের বাচ্চাদের রোজা রাখাতেন। যখন বাচ্চারা খাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করতো তাদের তুলার খেলনা দিয়ে ইফতার পর্যন্ত ব্যস্ত রাখতেন ”।
(সহীহ বুখারী, সিয়াম অধ্যায়, হাদিস নং-১৯৬০)

আশুরার রোজার ফজিলত:

আশুরা উদযাপন মূলত রোজা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এইদিনে ভালখাবার খেলে সারা বছর ভাল খাবার খাওয়া যাবে মর্মে যে কথাটি চালু আছে তা মুলত স্বল্প শিক্ষিত গ্রামের মোল্লা মৌলভীদের মুখের উক্তি। হযরত আবু কাতাদা (রা) থেকে বর্নিত, রাসূল (স) কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ

আমি আশা করি এই রোজার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পূর্বের ১ বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন”। (সুবহানাল্লাহি)
(সহীহ মুসলীম, সিয়াম অধ্যায়, হাদিস নং-১১৬২)

আশুরার রোজা রাখার নিয়ম:

রাসূলুল্লাহ (স) সারাজিবন শুধুমাত্র ১০ই মুহাররম রোজা রেখেছেন। যেহেতু এই দিনে ইহুদীরা ও রোজা রাখতো তাই রাসূলুল্লাহকে (স) জানানো হলো যে, আমাদের সাথে ইহুদীদের সাদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তারাও ১০ ই মুহাররম রোজা রাখে আর আমরাও রোজা রাখি। রাসূলুল্লাহ (স) সব সময় ইহুদী খৃষ্ট্রানদের বিরোধীতা করতেন এবং আমাদের ও বিরোধীতা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তখন রাসূল (স) বললেন,
“আল্লাহ চাইলে আগামী বছর আমরা ৯ই মুর্হারম রোজা রাখবো”
(সহীহ মুসলীম, সিয়াম অধ্যায়, হাদিস নং-১১৩৪)

সুতরাং আমরা যারা মুর্হারমের এই ফজিলতপূর্ন রোজা পালন করতে চাই আমাদের উচিত ৯ ও ১০ ই মুর্হারম পরপর দুইদিন সিয়াম পালন করা।

আশুরা ও কারবালা:

আমাদের সমাজের অনেকে মনে করেন যে, আশুরা মূলত কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এটি একটি ভুল ধারনা। তাছাড়া “বিষাদ সিন্ধু” র মীর মুশাররফ কর্তৃক বর্নিত কাহিনী অধিকাংশই মিথ্যা ও চাটনি মাখানো যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। হিজরী ৬১ সালের ১০ই মুহাররম রাসূল (স) এর দৌহিত্র হুসাইন বিন আলী (রা) ইরাকের কারবালা প্রান্তরে তৎকালিন শাসকের নিযুক্ত কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও চরমপন্থা অবলম্বন ও ইরাকের কুফাবাসীর বিশ্বাস ঘাতকতার ফলে নির্মমভাবে শহীদ হন যা একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। চির লা’নত সেই ঘাতকদের যারা হত্যা করেছে রাসূল (স) এর এই আদরের নাতীকে।

কিন্তু যারা এই হত্যার সাথে জড়িত সেই ইসলাম বর্হিভুত দল শিয়া (রাফেজী) সম্পদ্রায় তারাই শোক পালনের নামে বিভিন্ন অনৈসলামিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে। তারা শোক পালনের নামে মূর্তি তৈরি করে, ঢোল বাজিয়ে, মিথ্যা কবর তৈরি করে, নারী পুরুষ একত্রে মিছিল করছে। নিজের শরীর রক্তাক্ত করে বিভ্রান্ত তৈরি করছে। শোক পালনের নামে তারা হুসাইন (রা) এর নামের সাথে মাতম করছে। কিন্তু তাদের পালিত এই সব কাজই ইসলাম হারাম বলে ঘোষনা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ

“যারা শোক পালন করতে গিয়ে কাপড় ছিড়ে, বুকে আঘাত করে, জাহিলিয়াতের মত চিৎকার করে তারা মুসলীম নয়”।
(সহীহ বুখারী, জানাযা অধ্যায়, হাদিস নং-১২৯৭)

মুলত শিয়া (রাফেজী) সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের অপরাধ গোপন করার জন্য এবং মুসলীম জামায়াতের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করার জন্য যুগে যুগে ষড়যন্ত্র করেছে এবং এখনও তা অব্যহত রেখেছে। প্রিয় পাঠক, একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবো যে শিয়া (রাফেজী) সম্প্রদায় শুধূমাত্র হুসাইন (রা) এর শাহাদাতেই শোক পালন করে। কিন্তু ইসলামে তো আরও শোক পালন করার দিন রয়েছে (যদিও তারা যেভাবে শোক পালন করে তা সম্পুূর্ন হারাম পন্থা) সেই দিনগুলোতে তারা শোক পালন করে না। যেমন, ওমর, উসমান ও আলী (রা) এর শাহাদাতের দিন, আবু বকর (রা) এর মৃত্যু দিন, রাসূল (স) এর মৃত্যুদিন তো আর বেশী শোক এই মুসলীম উম্মাহর জন্য। কোই সেইদিন তো তারা শোক পালন করে না। আল্লাহ আমাদের শিয়া (রাফেজী) সম্প্রদায়ের ষড়যন্ত্র অনুধাবন করা ও এর থেকে বেচে থাকার তাওফিক দান করুন আমিন।

মুহাররম মাসে আমাদের করনীয়:

  • কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা সঠিকভাবে জানা।
  • ৯ও ১০ তারিখ রোজা রাখা।
  • শিয়াদের (রাফেজী) ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন হওয়া।
  • পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা (বিশেষভাবে)

মুহাররম মাসে আমাদের বর্জনীয়:

  • শিয়াদের (রাফেজী) সকল অনুষ্ঠান ত্যাগ করা ও ঘৃনা করা।
  • মিথ্যা ও জাল ঘটনা দ্বারা বর্নিত সকল বনর্না ত্যাগ করা।
  • ইহুদী ও খৃষ্ট্রানদের বিরোধীতা করা ও তাদের বর্জন করা।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের কবুল করুন। আমিন

Join the Conversation
By - জহির আমিন

লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি