তাবিজওয়ালা সিরিজ – পর্ব: ৪
৯. কিছু বাস্তবতা।
তাবিজ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য বলার আগে কিছু বাস্তবতা তুলে ধরছি।
এ যুগের তাবিজওয়ালাদের মধ্যে যারা হালাল হারামের ধার ধারেন না তাদের কথা বাদ দিলাম, কিন্তু যারা জায়েজ বলেন এবং জায়েজ হওয়ার পক্ষে দলীল দেয়ার চেষ্টা করেন, তাঁরা কিছু সাহাবা-তাবেয়ীর নাম উল্লেখ করে প্রচার করেন, ‘তাঁরা “তাবিজ”কে জায়েজ বলেছেন’। তাঁরা বলেন না, ‘যদি কোন তাবিজে কুরআনের আয়াত, দোয়া ইত্যাদি ব্যতিত অন্য কিছু না থাকে এবং অর্থ জানা যায় না এমন কিছু না থাকে কেবল সেই তাবিজ বৈধ’। অর্থাৎ বৈধ হওয়ার শর্তগুলো বাদ দিয়ে প্রচার করেন।
একই ভাবে যারা আহসানুল ফাতাওয়ার হাওয়ালা দিয়ে সংখ্যা তাবিজকে বৈধ বলে প্রচার করেন তারা বলেন না, ‘যদি সংখ্যা দ্বারা কেবল কুরআন বা দোয়া লিখিত থাকে এবং তার অর্থ বোঝা যায় তবেই তাবিজ বৈধ। নয়তো অবৈধ’।
তারা বিশেষ কিছু তাবিজ বৈধ হওয়ার পক্ষে সালাফ ও ফুকাহাদের বক্তব্যকে হাতিয়ার বানিয়ে এমন তাবিজের প্রসার ঘটান যা সব ফকীহদের মতে না জায়েজ।
আমাদের সমাজে কোন হুজুর ‘অ-কুরআনি তাবিজ’ দেন বলে আমার জানা নেই। বরং হুজুররা যত তাবিজ দেন, সবই ‘কুরআনি তাবিজ’ নামে পরিচিত। আমরা এমন অনেক কথিত ‘কুরআনী তাবিজ’ খুলি। দুঃখজনকভাবে সেগুলোতে কুরআন থাকে না। যদি থাকে তাহলে তার সাথে না জায়েজ কিছুও যুক্ত থাকে। (অনেক বিরল কোন ঘটনা ছাড়া।)
আমি উদাহরণ হিসাবে ‘বিশুদ্ধ ধারার’ একজন তাবিজওয়ার কথা উল্লেখ করছি। তিনি তাঁর দাবী অনুযায়ী রুকইয়াহ শরইয়্যাহ করেন। না-জায়েজ তাবিজের বিরোধিতা করেন এবং কেবল কুরআনী তাবিজকে (!) বৈধ বলেন। যিনি কিছু তাবিজওয়ালা হুজুরের সহায়তায় তাবিজবিরোধী রাকীদের বিপক্ষে একটা ‘তাবিজ বিপ্লব’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। আমি এই পোস্টের সাথে তার একটি লেখার স্ক্রিনশট যুক্ত করে দিয়েছি।
লক্ষ্য করুন, তিনি প্রসংগক্রমে তাঁর লেখার সাথে একটা কথিত ‘কোরআনি তাবিজ’-এর চিত্র যুক্ত করে দিয়েছেন। এবার আহসানুল ফাতাওয়ায় উল্লেখকৃত শর্তগুলো তাঁর ‘কোরআনি তাবিজের’ সাথে মিলিয়ে নিন (যেহেতু আহসানুল ফাতাওয়াই তার দলীল)। ধরে নিন, তিনি সংখ্যা দ্বারা কুরআন লিখেছেন এবং তার অর্থ তিনি জানেন। এবার যারা তাঁকে অনলাইনে বা অফলাইনে চিনেন, তাঁকে তিলাওয়াত করতে বলুন এই আয়াতগুলো: ১৮, ২১, ২৪, ১১…। 😊 আশা করি এর পর আপনাদের বুঝতে বাকি থাকবে না।
এটা হল সবচেয়ে বিশুদ্ধ ধারার একজন তাবিজওয়ালার অবস্থা। অন্যদের কথা না হয় বাদ দিলাম।
একটি নমুনা উল্লেখ করলাম। আশা করি এতেই তাবিজওয়ালাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাবেন।
১০. তাবিজের ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য:
যেহেতু আমরা ওপরে উল্লেখকৃত বাস্তবতার মুখোমুখি তাই স্পষ্ট ভাষায়ই বলছি, তথাকথিত কুরআনী তাবিজ সহ সমাজে প্রচলিত তাবিজ-কবজকে আমরা হারাম ও শিরক মনে করি।
তবে যদি কোন ব্যক্তি নিজে কুরআনের আয়াত, দোয়া, যিকির দ্বারা তাবিজ লিখেন, অথবা মাদুলিতে ঢোকানোর আগে দেখে ও বুঝে নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন, তাঁর তাবিজে কুরআন, দোয়া, যিকির ব্যতিত অন্য কিছু নেই, অর্থ না জানা কিছুও নেই তাহলে আমরা এটাকে মতবিরোধপূর্ণ মাসআলাহ মনে করি এবং যারা বৈধ বলেছেন তাঁদের মতটিকে সম্মান করি।
আমরা নিজেদের দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. এর মতটিকেই কল্যানকর ও নিরাপদ মনে করি। বিশেষ করে এই যুগে, যখন স্পষ্ট শিরক কুফর যুক্ত তাবিজকেও ‘কুরআনি তাবিজ’ বলে প্রচার করা হয়।
يُمْنَعُ إِذَا كَانَ هُنَاكَ نَوْعُ قَدْحٍ فِي التَّوَكُّلِ،
(তাবিজ) নিষিদ্ধ, যদি তাওয়াক্কুলে কোন প্রকার ত্রুটি সৃষ্টি হয়’।
[মিরকাতুল মাফাতিহ: ৮/৩২২, হা: ৪৫৫৪ এর ব্যাখ্যায়]
১১. একটি প্রশ্ন ও উত্তর:
প্রশ্ন:
অমুক হুজুর/ইমাম সাহেব/খতিব সাহেব/পীর সাহেব/আলেম/মুফতী/শাইখুল হাদিস/দারুল ইফতার প্রধান মুফতী/আকাবির (ই্ত্যাদি), বশিকরণ বা বিচ্ছেদের কাজ/মূর্তি আঁকা তাবিজ/ফেরাউন-নমরুদের নাম লেখা তাবিজ/জিন শয়তানের নাম লেখা তাবিজ/আল্লাহর নামের পরিবর্তে বা সাথে কোন ওলি বুজুর্গের নাম লেখা তাবিজ/কুরআন-যিকির-দোয়া ব্যতিত অন্য কিছুর তাবিজ (ই্ত্যাদি) নিজে ব্যবহার করেন/অন্যকে দেন/বৈধ বলেন!
আপনারা কি তাঁর চেয়ে বড় আলেম?/ বেশি জানেন?
উত্তর:
দয়া করে (প্রথম পর্বের) ৩ নং পয়েন্টটা ভালোভাবে পড়ুন এবং এই বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর দলীল, সালাফের বক্তব্য এবং তাঁদের অনুসারী পরবর্তী ফকীহ মুজতাহিদদের দলীলভিত্তিক বক্তব্য উল্লেখ করুন। আমরা তাঁদেরকেই শরীয়ত সম্পর্কে অধিক অবগত মনে করি।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখার কোন উদ্ধৃতি যদি ভুল হয়ে থাকে তাহলে দয়া করে সেটা আমাদেরকে অবগত করুন। আমরা যেকোন ভুল সংশোধন করতে প্রস্তুত ইনশাআল্লাহ।)
(সমাপ্ত।)
