তাবিজওয়ালা – ৩

তাবিজওয়ালা সিরিজ – পর্ব: ৩

৭. সব তাবিজ কি অবৈধ?

আমাদের সমাজের বিরল ও ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রকার তাবিজের ব্যাপারে সালাফের যুগ থেকে ওলামাদের মতবিরোধ আছে। (আবার বলছি, ‘বিরল ও ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রকার তাবিজের ব্যাপারে’, যেকোন তাবিজের ব্যাপারে নয়।) অন্য সব তাবিজই না জায়েজ।

এ ব্যাপারে প্রসিদ্ধ দুটি মত উল্লেখ করছি।

প্রথম মত:

  • কুরআন, দোয়া, যিকির বা আল্লাহর নাম লেখা তাবিজ বৈধ। অন্য তাবিজ অবৈধ।

সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রা. সম্পর্কে বর্নিত,

وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو يُعَلِّمُهُنَّ مَنْ عَقَلَ مِنْ بَنِيهِ، وَمَنْ لَمْ يَعْقِلْ كَتَبَهُ فَأَعْلَقَهُ عَلَيْهِ.
আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. তাঁর ছেলেদের মধ্যে যাদের বুদ্ধি হয়েছে তাদেরকে দোয়াটি শিখিয়ে দিতেন। আর যারা অবুঝ, দোয়াটি লিখে তাদের শরীরে ঝুলিয়ে দিতেন।

[সুনান আবী দাউদ হা: ৩৮৯৩, মুসান্নাফ ইবনি আবী শাইবাহ হা: ২৩৫৪৮]

তাবেয়ী সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, ইবনে সীরীন, আতা বিন আবী রাবাহ সহ আরো কিছু সালাফ থেকে বর্ণিত, তাঁরা কুরআন লিখিত তাবিজকে বৈধ মনে করতেন।

রাসুল সা. তাবিজের ব্যাপারে সতর্ক করে যা কিছু বলেছেন, এই মতের আলেমগণ কুরআনের আয়াত ইত্যাদি সম্বলিত তাবিজকে তার আওতাভুক্ত মনে করতেন না।

তবে তাঁরা কেবল কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, যিকির বা দোয়া সম্বলিত তাবিজকে বৈধ বলেছেন, যার সাথে অন্য কিছু থাকবে না। কারণ অন্য কিছু থাকলে জায়েজ ও নাজায়েজের মিশ্রণ হবে, তাই তা নাজায়েজ হবে।

আর যেহেতু তাবিজের ভাষা বোঝা না গেলে তাতে কুরআন ব্যতিত অন্য কিছু আছে কিনা বোঝা যাবে না, তাই ফকীহগণ শর্তযুক্ত করে দিয়েছেন, অর্থ বোঝা যায় না, এমন কিছু থাকলে তা বৈধ হবে না।

এ ব্যাপারে এই মতাবলম্বী দুইজন ফকীহ এর বক্তব্য উল্লেখ করছি। আশা করি এতেই যথেষ্ট হবে।

ইবনু আবেদীন শামী রাহ. আল-মুজতাবা নামক কিতাবের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন,

التَّمِيمَةُ الْمَكْرُوهَةُ مَا كَانَ بِغَيْرِ الْقُرْآنِ
“নিষিদ্ধ তাবিজ হল, যা কুরআন ব্যতিত অন্য কিছু সম্বলিত হবে”।

(এখানে المكروهة শব্দটি নিষিদ্ধ অর্থে, পারিভাষিক অর্থে নয়। নতুবা শিরকী তাবিজকেও ‘মাকরুহ’ বলতে হবে।)

তিনি আল-মুগরিব নামক কিতাবের বরাত দিয়ে আরো বলেছেন:

وَلَا بَأْسَ بِالْمُعَاذَاتِ إذَا كُتِبَ فِيهَا الْقُرْآنُ، أَوْ أَسْمَاءُ اللَّهِ تَعَالَى…

قَالُوا: إنَّمَا تُكْرَهُ الْعُوذَةُ إذَا كَانَتْ بِغَيْرِ لِسَانِ الْعَرَبِ، وَلَا يُدْرَى مَا هُوَ وَلَعَلَّهُ يَدْخُلُهُ سِحْرٌ أَوْ كُفْرٌ أَوْ غَيْرُ ذَلِكَ، وَأَمَّا مَا كَانَ مِنْ الْقُرْآنِ أَوْ شَيْءٍ مِنْ الدَّعَوَاتِ فَلَا بَأْسَ بِهِ
“তাবিজ ব্যবহার করলে কোন অসুবিধা নেই যদি তাতে কুরআন অথবা আল্লাহ তাআলার নামসমূহ লেখা হয়।…
(ফকীহগণ) বলেছেন, তাবিজ তখন নিষিদ্ধ হবে যখন তা আরবী ব্যতিত অন্য ভাষায় লিখিত হবে এবং জানা যাবে না, তা কী। তাতে জাদু, কুফর, ইত্যাদি থাকার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যাতে কুরআন অথবা কোন দোয়া লিখিত তাতে কোন সমস্যা নেই”। [রাদ্দুল মুহতার (হাশিয়াতু ইবনি আবিদীন) ৬/৩৬৩ মুদ্রণ: দারুল ফিকর, বৈরুত]

মোল্লা আলী কারী রাহ. লিখেছেন,

وَأَمَّا مَا كَانَ مِنَ الْآيَاتِ الْقُرْآنِيَّةِ، وَالْأَسْمَاءِ وَالصِّفَاتِ الرَّبَّانِيَّةِ، وَالدَّعَوَاتِ الْمَأْثُورَةِ النَّبَوِيَّةِ، فَلَا بَأْسَ، بَلْ يُسْتَحَبُّ سَوَاءٌ كَانَ تَعْوِيذًا أَوْ رُقْيَةً أَوْ نَشْرَةً، وَأَمَّا عَلَى لُغَةِ الْعِبْرَانِيَّةِ وَنَحْوِهَا، فَيَمْتَنِعُ لِاحْتِمَالِ الشِّرْكِ فِيهَا
কিন্তু যা আল্লাহর নাম, আল্লাহর সিফাত, নবী সা. হতে বর্ণিত দোয়া সম্বলিত হবে তাতে কোন সমস্যা নেই। বরং তা মুস্তাহাব। চাই তা তাবিজ হোক, রুকইয়াহ হোক বা ‘নাশরাহ’। কিন্তু ইবরানী ইত্যাদি ভাষায় তা বৈধ নয়। কারণ তাতে শিরক থাকার সম্ভাবনা থাকে”।

[মিরকাতুল মাফাতীহ ৮/৩২০-৩২১, হা: ৪৫৫৩ এর ব্যাখ্যায়।]

আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ-এ বলা হয়েছে: “তাবিজের মধ্যে যদি এমন কোন নাম (বা শব্দ) থাকে যার অর্থ বোঝা যায় না তাহলে সেই তাবিজ না জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরামের কারো দ্বিমত নেই”। [১৪/৩০]

আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ-এ বলা হয়েছে: “তাবিজের মধ্যে যদি এমন কোন নাম (বা শব্দ) থাকে যার অর্থ বোঝা যায় না তাহলে সেই তাবিজ না জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরামের কারো দ্বিমত নেই”। [১৪/৩০]

দ্বিতীয় মত:

  • কোন তাবিজই বৈধ না। তাতে কুরআনের আয়াত থাকুক বা অন্য কিছু।

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. সম্পর্কে বর্ণিত,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ: أَنَّهُ كَرِهَ تَعْلِيقَ شَيْءٍ مِنَ الْقُرْآنِ.

তিনি কুরআনের কোন অংশ (তাবিজ বানিয়ে) ঝুলানোকে ‘অবৈধ’ মনে করতেন। [মুসান্নাফ ইবনি আবী শাইবাহ হা: ২৩৪৬৪]

তাবেঈ ইবরাহীম নাখয়ী রাহিমাহুল্লাহ (যিনি আবু হানিফা রাহ এর শাইখের শাইখ,) তিনি যেসব সালাফদের সোহবত পেয়েছেন তাঁদের সম্পর্কে বলেছেন,

كَانُوا يَكْرَهُونَ التَّمَائِمَ كُلَّهَا، مِنَ الْقُرْآنِ وَغَيْرِ الْقُرْآنِ
‘তাঁরা সব ‘তামিমাহকে’ (তাবিজকে) অবৈধ মনে করতেন। কুরআনের হোক বা কুরআন ব্যতিত অন্য কিছুর’। [মুসান্নাফ ইবনি আবী শাইবাহ হা: ২৩৪৬৪]

উল্লেখ্য, তিনি আল-আসওয়াদ ইবনু ইয়াযিদ, মাসরুক্ব ও আলক্বামাহ এর মত প্রথম স্তরের তাবেয়ীদের ছাত্র ছিলেন। এবং আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. এর রেখে যাওয়া ইলমে তাঁর পান্ডিত্য ছিল।

এই মতের আলেমগণ বিভিন্ন দলিল দিয়েছেন। তার একটি হল, (তাঁদের মতে) রাসুল সা. তাবিজের ব্যাপারে সতর্ক করে যা কিছু বলেছেন (তাবিজ শিরক হওয়া ইত্যাদি), সব তাবিজই এর আওতাভুক্ত।

وَاحْتَجَّ هَؤُلاَءِ لِمَا ذَهَبُوا إِلَيْهِ بِمَا يَأْتِي:

أ – عُمُومُ النَّهْيِ فِي الأحَادِيثِ وَلاَ مُخَصِّصَ لِلْعُمُومِ…) [الموسوعة الفقهية الكويتية ج١٤ ص٣١]
(এখানে يكره শব্দটির মূল অর্থ অপছন্দ করা। কিন্তু সালাফগণ ‘না জায়েয’ বোঝাতে ব্যাপকভাবে এই শব্দটা ব্যবহার করতেন। নিচে ইমাম ত্বহাবির বক্তব্য এবং তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে উল্লেখকৃত ওমর রা. সম্পর্কে বর্ণনাটি লক্ষ্য করুন।

فبذلك نأخذ فنكره للجنب والحائض قراءة الآية تامة…

حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُحَمَّدٍ الصَّيْرَفِيُّ، قَالَ: ثنا عَبْدُ اللهِ بْنُ رَجَاءٍ، قَالَ: ثنا زَائِدَةُ، عَنِ الْأَعْمَشِ، عَنْ شَقِيقٍ، عَنْ عُبَيْدَةَ، قَالَ: «كَانَ عُمَرُ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ يَكْرَهُ أَنْ يَقْرَأَ الْقُرْآنَ وَهُوَ جُنُبٌ

[শারহু মাআনিল আসার ১/৯০, হা: ৫৮৩]

যদি কেউ ব্যাপারটা না জানেন তাহলে তিনি এটা পড়ে মনে করবেন, ‘গোসল ফরজ থাকা অবস্থায় কুরআন পড়া ওমর রা. এর কাছে অপছন্দনীয় ছিল এবং এটাকে হানাফী ফকীহগণও অপছন্দ করেছেন। কিন্তু তা না জায়েজ নয়’।

তাবিজ বিষয়ক একটা প্রবন্ধে দেখলাম, সেখানে ইবরাহিম নাখয়ী রাহ. এর বক্তব্যের অনুবাদ করা হয়েছে ‘অপছন্দ করতেন’, অথচ সেই প্রবন্ধেই অল্প কিছু পূর্বে ইমাম ত্বহাবির বক্তব্যে এমন শব্দের অনুবাদ করা হয়েছে, ‘জায়েজ ছিল না’। সুবহানাল্লাহ।)

আমরা দুটি মতই উল্লেখ করলাম। দুটি মতের পক্ষে ও বিপক্ষে অনেকেই লেখালেখি করছেন। যার কারণে অনেক বিতর্ক চলছে। আমরা বিতর্কে যাব না। আমরা শুধু ফুকাহাদের মতামত উল্লেখ করার পর আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট করে দেব ইনশাআল্লাহ।

৮. মুফতী রশীদ আহমাদ লুধিয়ানবি রাহ. কি অর্থ না জানা নকশার তাবিজকে বৈধ বলেছেন?

“তাবিজ বৈধ হওয়ার শর্ত তিনটি:

  • অর্থ বোঝা যায় এমন ভাষায় লিখিত হতে হবে।
  • (কুরআনে বা হাদিসে) বর্ণিত (আয়াত বা দোয়া) হতে হবে।
  • তা নিজে উপকার করতে পারে এমন বিশ্বাস রাখবে না”। (শেষের শর্তটি শুধু তাবিজের জন্য নয়, বরং যেকোন চিকিৎসার জন্যই প্রযোজ্য।)

তিনি তাঁর কথার স্বপক্ষে ইবনু আবেদীন শামী ও মোল্লা আলী কারী এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন (ওপরে দ্রষ্টব্য)। তবে তিনি তিনটি শর্ত উল্লেখ করার পরে নিজের একটি মত উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “আবজাদ এর হিসাব দ্বারা তাবিজ লেখা জায়েয, কারণ তা এমন ভাষা যার অর্থ বোঝা যায়”। [আহসানুল ফাতাওয়া ৮/২৫৬]

(যেমন ৭৮৬ দ্বারা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বোঝা যায়। অতএব আবজাদ এর হিসাবে কুরআনের আয়াত, দোয়া ইত্যাদি লেখা হলে এবং অর্থ জানা গেলে এর মধ্যে তাবিজ বৈধ হওয়ার শর্তগুলি পাওয়া যায়।)

আবজাদ দ্বারা কুরআন লেখা জায়েয কিনা, তা লেখার বিধান আর কুরআন লেখার বিধান এক হবে কিনা, পূর্ববর্তী যেসব ফকীহ কুরআনের তাবিজের পক্ষে ছিলেন তারা এই তাবিজকেও বৈধ বলেছেন কিনা- এগুলো অন্য প্রসংগ। সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। আপাতত ধরে নিচ্ছি, আবজাদের হিসাবে সংখ্যা দ্বারা কুরআন লিখলে তা কুরআন লিখা হিসাবেই গণ্য হবে।

কিন্তু আমরা তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, তাঁর মতে যদি সংখ্যা দ্বারা কুরআনের আয়াত বা বর্ণিত দোয়া লেখা হয়, এবং তাঁর অর্থ বোঝা যায় তাহলেই কেবল সংখ্যার তাবিজ বৈধ। অন্যথায় বৈধ হবে না।

 

 

 

Join the Conversation
By - আবু খুবাইব

লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি