তাবিজওয়ালা – ২

তাবিজওয়ালা সিরিজ – পর্ব: ২

এই পর্বে আছে:

  • তাবিজ বিষয়ক কয়েকটি হাদিস।
  • হাদিসে উল্লেখকৃত তামীমাহ অর্থ কি ‘তাবিজ’?

৫. তাবিজ প্রসংগে আল্লাহর রাসুল সা. এর কয়েকটি হাদিস:

ওকবাহ বিন আমের রা. হতে বর্ণিত,
عن عقبة بن عامر أنَّ رسولَ اللهِ ﷺ أقبل إليه رهطٌ فبايعَ تسعةً وأمسك عن واحدٍ فقالوا يا رسولَ اللهِ: بايعتَ تسعةً وتركتَ هذا قال إنَّ عليه تميمةً فأدخل يدَه فقطعها فبايعَه وقال من علَّقَ تميمةً فقد أشركَ
রাসুলুল্লাহ সা. এর নিকট একদল লোক বাইয়াত হতে আসল। তখন তিনি নয়জনকে বাইআত করলেন এবং একজনকে বাইআত করা হতে বিরত থাকলেন। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, নয়জনকে বাইয়াত করলেন আর একে বাদ দিলেন! তিনি বললেন, ‘এর সাথে তাবিজ আছে’। তারপর তিনি হাত ঢুকিয়ে তাবিজটি ছিড়ে ফেললেন এবং তাকে বাইয়াত করলেন। এবং বললেন, ‘যে তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করল’।
–
ইমাম হাকিম হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবী এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেননি। ইমাম হাইসামী বলেছেন, ইমাম আহমাদের বর্ণনার রাবীগণ নির্ভরযোগ্য।

[মুসনাদ আহমাদ হা: ১৭৪২২, আলমু’জামুল কাবীর লিত-তাবারানী, মুসতাদরাক হাকিম হা: ৭৫১৩, মাজমাউয যাওয়াইদ হা; ৮৩৯৯]

(হ্যাঁ, হাদিসে উল্লেখকৃত ‘তামীমাহ’ (تميمة) অর্থ তাবিজ! একটু পরেই আসছে ইনশাআল্লাহ।)

ওকবাহ বিন আমের রা. হতে বর্ণিত,
عن عقبة بن عامر قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم قال من تعلَّقَ تميمةً فلا أتمَّ اللهُ له
রাসুল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি “তাবিজ” ঝুলাবে আল্লাহ যেন তার কাজে পূর্ণতা না দেন’।
–
হাদিসটিকে ইমাম ইবনু হিব্বান ও হাকিম সহীহ বলেছেন। ইমাম যাহাবী হাকিমের সাথে এ ব্যাপারে দ্বিমত করেন নি। ইমাম হাইসামী বলেছেন ‘(হাদিসটির) বর্ণনাকারীরা নির্ভরযোগ্য’।

[মুসনাদ আহমাদ হা: ১৭৪০৪, মুসনাদ আবী ইয়া’লা হা: ১৭৫৯, সহীহ ইবনু হিব্বান হা: ৬০৮৬, শারহু মাআনিল আসার লিত-ত্বহাবী হা: ৭১৭২, মুসতাদরাক হাকিম হা: ৭৫০১, মাজমাউয যাওয়াইদ হা: ৮৩৯৮]

আবু মা’বাদ আব্দুল্লাহ বিন উকাইম আল-জুহানী রা. (যিনি রাসুল সা. এর যুগ পেয়েছেন কিন্তু রাসুল সা. এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হয় নি) হতে বর্ণিত, নবী সা. বলেছেন,
مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ
‘যে ব্যক্তি ‘কোন কিছু’ ঝুলাবে তাকে সেই বস্তুর দায়িত্বে ছেড়ে দেয়া হবে’। (অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাকে হেফাজতের দায়িত্ব নিবেন না।)
–
হাদিসটি মুরসাল এবং এর সনদে দুর্বলতা আছে। কিন্তু আবু হুরাইরাহ রা. হতেও হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে [সুনান আন-নাসায়ী হা: ৪০৭৯]। হাদিসটির শাহেদ থাকার কারণে অনেকে এটাকে হাসান বলেছেন। শামসুদ্দিন ইবনু মুফলিহ হাম্বলী রাহ. আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। [আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ ৩/৮২]। শুআইব আরনাউত্ব মুসনাদ আহমাদের তাখরিজে এবং শাইখ আলবানী সহীহ আত-তারগীবে আব্দুল্লাহ বিন মা’বাদ রা. এর হাদিসটিকে ‘হাসান লিগাইরিহি’ বলেছেন।

[মুসনাদ আহমাদ হা: ১৮৭৮১, সুনান আত-তিরমিযী হা: ২০৭২, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব হা: ৫২৪৩]

আমরা কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করলাম। তাবিজ নিষিদ্ধ হবার ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল সা. থেকে আরো অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
হাদিসগুলো থেকে যা জানতে পারলাম,

  • তাবিজ ব্যবহার করা শিরক।
  • আল্লাহর রাসুল সা. তাবিজ ব্যবহারকারীর জন্য বদ দোয়া করেছেন।
  • তাবিজ ব্যবহার করলে আল্লাহর হেফাজত থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

(এখানে কোন প্রকারের তাবিজ উদ্দেশ্য সে বিষয়ে মতবিরোধের কথা সামনে আসছে।)

তামীমাহ অর্থ কি তাবিজ?

হাদিসে ‘তামীমাহ’ (تميمة) শব্দটি বলা হয়েছে যার বহুবচন ‘তামাইম’ (تمائم)। আমরা শব্দটির অনুবাদ করেছি ‘তাবিজ’। অনুবাদটি ঠিক কিনা বোঝার জন্য চলুন দেখা যাক বিশেষজ্ঞগণ শব্দটির কী অর্থ করেছেন।

হিজরি চতুর্থ শতাব্দির আরবী ভাষা বিশেষজ্ঞ ইমাম আবু নাসর জাওহারী (মৃত্যু: ৩৯৩ হি.) বলেছেন,
التميمة: عوذة تعلق على الانسان
‘আত-তামীমাহ অর্থ: তাবিজ যা মানুষের শরীরে ঝোলানো হয়’।

[আস-সিহাহ পৃ; ১৮৭৮]

ইবনু মানযুর আল-ইফরীকী:
والتميم: العوذ، واحدتها تميمة
আত-তামীম অর্থ তাবিজ। যার একবচন তামীমাহ’। (একথা বলার পর তিনি এ ব্যাপারে কয়েকজন ইমামের অন্যান্য মত উল্লেখ করেছেন।)

[লিসানুল আরব ১২/৬৯]

আব্দুর রউফ আল-মুনাবী:
والتمائم جمع تميمة وأصلها خرزات تعلقها العرب على رأس الولد لدفع العين توسعوا فيها فسموا بها كل عوذة.
আত-তামাইম শব্দটি তামীমাহ শব্দের বহুবচন। এর মূল অর্থ এমন পুঁতি যা আরবরা বদ নজর প্রতিহত করতে সন্তানের মাথায় ঝুলিয়ে দিত। (কিন্তু) তারা শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করেছে এবং তা দ্বারা সব তাবিজকেই বুঝিয়েছে’।

[ফাইদুল ক্বাদীর ২/৩৪১ হা: ২০০২]

তবে জাহেলিয়াতের যুগে যেহেতু পুঁতি, সুতা, গলার মালা ইত্যাদি বস্তু তাবিজ হিসাবে ব্যবহার করা হত তাই কেউ তামীমাহ এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন ‘পুঁতি’ [যেমন, আল-খাত্তাবী; মাআলিমুস সুনান ৪/২২০-২২১, ইবনুল আসীর; আন-নিহায়াহ ১/১৯৭], কেউ লিখেছেন, ‘গলার মালা ইত্যাদি’ [যেমন, ইবনু হাজার: ফাতহুল বারী ৬/১৯০, (হা; ৩০০৫ এর ব্যাখ্যায়)], কেউ লিখেছেন ‘হাত বা গলায় বাঁধার সুতা’ [যেমন, ফখরুদ্দিন যাইলায়ী: তাবয়ীনুল হাক্বাইক্ব শারহু কানযুদ দাক্বাইক্ব ৬/১৭-১৮]

তাহলে কি কুরআনের তাবিজকেও তামীমাহ বলা হবে?

হ্যাঁ। কুরআনের আয়াতের তাবিজ নিষিদ্ধ কিনা সেটা অন্য প্রসংগ, তবে সেটার নামও ‘তামীমাহ’। লক্ষ্য করুন, তাবেয়ী ইবরাহীম নাখয়ী রাহি. কুরআনের তাবিজ বোঝাতেও ‘তামাইম’ (তামীমাহ শব্দের বহুবচন) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। (পরবর্তী পোস্টে ইবরাহীম নাখয়ীর বক্তব্য দ্রষ্টব্য।)

(চলবে ইনশাআল্লাহ। পরবর্তী পর্বে: সব তাবিজ কি অবৈধ?)

 

Join the Conversation